মুক্তিপাগল ফাদি আবু সালেহ

ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৯ | ৬ বৈশাখ ১৪২৬

প্রতিবাদের বিশ্ব ‘সেলিব্রেটি’

মুক্তিপাগল ফাদি আবু সালেহ

বিবিধ ডেস্ক ১:০০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০১৯

print
মুক্তিপাগল ফাদি আবু সালেহ

দশ বছর আগে ইসরায়েলি সেনাদের রকেট হামলায় পা হারিয়ে পঙ্গু হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু সেই পঙ্গুত্ব মনের বিদ্রোহকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। হুইলচেয়ারে বসেই প্রতিবাদ করে গেছেন, সামর্থ্যরে সবটুকু শক্তি দিয়ে ঢিল ছুড়ে মেরেছেন দখলদার সেনাদের দিকে। এক সময় সেনাদের বুলেট তাকে চিরতরে নিস্তব্ধ করে দেয়। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠেন ফিলিস্তিনের যুবক ফাদি আবু সালেহ।

পশ্চিম তীরের শহর জেনিনে জন্ম ফাদি আবু সালেহের। জন্মের পর থেকেই দেখেছেন, দেশটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে দখলদাররা। প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন সালেহ। ইসরায়েলি সৈন্যদের হাতে একবার গ্রেফতারও হয়েছিলেন। কয়েক বছর জেল খাটার পর বিশেষ বিবেচনায় মুক্তি পান। মুক্তিকামী হাজারো তরুণের মতো তার একটাই স্বপ্ন স্বাধীন দেশে মুক্ত নিঃশ্বাস। আবু সালেহর সেই স্বপ্নে ধাক্কা লাগল ২০০৮ সালে। গাজায় ইসরায়েলি সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। মিছিলে রকেট লাঞ্চার নিয়ে হামলা চালাল ইসরায়েলিরা। সেখানেই জ্ঞান হারিয়েছিলেন সালেহ। হাসপাতালে নেওয়ার পর জীবন বাঁচাতে হাঁটুর সামান্য ওপর থেকে কেটে ফেলা হয় দুই পা।

কৈশোরেই বিয়ে করেছিলেন। জীবনে যখন এমন দুর্যোগ নেমে এলো, তখন তিনি এক সন্তানের পিতা। সেখানেই থেমে যাওয়ার কথা ছিল তার। হয়তো আর পাঁচজন অসুস্থ মানুষের মতো করেই জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু ফাদি আবু সালেহ দমবার পাত্র নন। জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়টা শুরু হলো হুইলচেয়ারে বসেই।

হুইল চেয়ারে বসেই সমানতালে ছুটেছেন স্বাভাবিক মানুষের মিছিলে। গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিচ্ছেন দখলদাদের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ মিছিলে বাড়তি আকর্ষণ ছিল তার সেই উপস্থিতি। তরুণরা তাকে দেখে উদ্দীপ্ত হতো। এক সময় এই পঙ্গু লোকটিই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠলেন। ফিলিস্তিনি তরুণদের কাছে আবু সালাহ ছিলেন আইডল।

এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও উঠে এসেছিলেন সালেহ। হুইলচেয়ারে বসে ইসরায়েলি সৈন্যদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ে মারছেন একজন পঙ্গুলোক এই ছবি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। যেখানেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আয়োজন হয়েছে, স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে সেখানে ছুটে গেছেন আবু সালেহ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি তার পথচলায়।

১৪ মে ২০১৮। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি দিয়ে সেখানে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলন করছিল ফিলিস্তিনিরা। প্রায় পঞ্চাশ হাজার ফিলিস্তিনি জড়ো হয়েছিলেন প্রতিবাদের বিক্ষোভ মিছিলে। যথারীতি একদম সামনের দিকেই ছিলেন আবু সালেহ। দুপুর নাগাদ শাস্তিপূর্ণ এই প্রতিবাদ লক্ষ্য করে হঠাৎই গুলি চালায় ইজরায়েলি সৈন্যরা। প্রাণ বাঁচাতে দিগি দিক ছুটতে শুরু করে সবাই।

কেউ কেউ প্রতিরোধও করার চেষ্টা করেছিলেন, যার মধ্যে সালাহও ছিলেন একজন। হাতের গুলতি নিয়ে বুলেটের জবাবে ঢিল ছুড়ে প্রতিহত করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন। এ সময় আগ্রাসী ইসরায়েলি এক সৈনিকের গুলি এসে লাগে এই বিপ্লবীর বুকে। দশ বছর ধরে যে হুইলচেয়ারটা ছিল নিত্যসঙ্গী, সেটা ভেঙে পড়েছিল সালেহর নিথর দেহের পাশেই। সালেহর ছোড়া গুলতির ইট-পাটকেলগুলো চারদিকে ছড়ানো-ছিটানো।

সালেহের গুলতি হয়তো অস্ত্রসজ্জিত সৈনিকদের কিছুই করতে পারেনি কিন্তু কালের সাক্ষী হয়ে গেছে তার প্রতিবাদ আর পাহাড়সমান দেশপ্রেম। সালেহ মারা গেছেন কিন্তু তিনি বেঁচে থাকবেন লাখো মুক্তিকামী ফিলিস্তিনির বুকের গভীরে।