মহান নেতা মহান মানুষ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯ | ৬ ভাদ্র ১৪২৬

মহান নেতা মহান মানুষ

বিবিধ ডেস্ক ১২:৩৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৯

print
মহান নেতা মহান মানুষ

যেসব মানুষের জন্ম জগতের জন্য আশীর্বাদ হয়ে ধরা দেয়, তেমনই একজন আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন। যে সময় রাষ্ট্রপতির বাসভবন হোয়াইট হাউসের সামনেই দাস-দাসী বেচাকেনা হতো, সে সময় তিনি আইনের মাধ্যমে এর বিলুপ্তি ঘটিয়ে মানুষের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করলেন।

আব্রাহাম লিংকনের বাবা টমাস লিংকন ছিলেন ছুঁতোর মিস্ত্রি। সংগত কারণেই তার বাল্যকাল খুবই দারিদ্র্যের মধ্যে কাটে। মা-বাবার সঙ্গে জঙ্গলে ঘর বেঁধে কাটিয়েছেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে চিকিৎসার অভাবে মাকে হারান। তার এক বছরের মাথায় বাবা এক বিধবা নারীকে বিয়ে করে নিয়ে আসেন। যদিও তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ১ বছরের বেশি নয়, তথাপি তিনি তৎকালীন শিক্ষিত সমাজে একজন পণ্ডিত হিসেবে বিবেচিত হতেন।

সৎ সাহসী ও কর্মঠ লিংকনের সত্যবাদিতা, সততা, সহযোগিতামূলক মনোভাব, মধুর আচরণ সর্বজনবিদিত। ১৯ বছর বয়সে ব্যবসায়িক কাজে তাকে নিউ অর্লিয়েন্স বন্দরে যেতে হয়। ওই ব্যবসায় তিনি প্রচুর লাভ করায় তার মালিক খুশি হয়ে তাকে মালিকের গুদামের ম্যানেজার পদে নিযুক্ত করে দেন। সেখানে তিনি অবসর সময়ে বিভিন্ন বই পড়তেন। এভাবে তার জ্ঞানের ঝুলিতে জমা হতে থাকে জ্ঞানের ভাণ্ডার। সেখানে থাকাকালে তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। জীবনে প্রথমবারের মতো ইলিনয় প্রদেশের প্রাদেশিক নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে যোগদান করে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবে প্রথমবার পরাজয় বরণ করলেন। দ্বিতীয়বার কিন্তু জয়ী হলেন। এর ফাঁকে আইন পড়া শেষ করে ওকালতিতেও যোগদান করেছিলেন কিন্তু সেখানে তিনি বেশি দিন মনোনিবেশ করতে পারলেন না রাজনীতিতে আসক্তির কারণে।

রাজনীতির মাঠে নেমে পড়ার পেছনে স্ত্রী মেরির অনুপ্রেরণা ছিল বিশেষভাবে। ১৮৪৭ সালে তিনি আমেরিকার ওয়াশিংটন পার্লামেন্টের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি লক্ষ করলেন, রাষ্ট্রপতির বাসভবন হোয়াইট হাউসের কাছেই দাস-দাসী বেচাকেনা হচ্ছে, অথচ আজীবন এ প্রথার বিরোধিতা করেছেন তিনি। সংসদে এই প্রথা বাতিলের জন্য বক্তব্য উপস্থাপন করলে অন্যদের তোপের মুখে পড়তে হয়।

১৯৫৪ সাল লিংকনের জীবনের বিশেষ বছর। তার নেতৃত্বে রিপাবলিকান পার্টি গঠিত হয়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ডেমোক্রেসি পার্টির ডগলাস। লিংকনের রাজনৈতিক পার্টির বৈশিষ্ট্য ও কর্মনীতি মানুষকে মুগ্ধ করে। ফলে নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি জয়লাভ করে এবং আব্রাহাম লিংকন হন আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরই তিনি দাস প্রথা বিলুপ্তের জন্য তিনি মানুষের প্রতি আহ্বান জানান। ১৯৬৩ সালের ১ জানুয়ারি তিনি আইনত দাসপ্রথা বিলুপ্ত করেন।

কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকানরা তা মেনে নিতে পারল না। তারা দেখল তাদরে প্রভুত্ব কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তাই তারা বিভক্ত হয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠন দাবি করলেন। ১৮৬৩ সালে এই অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কেন্দ্র করে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসেলভানিয়ার গেটিসবার্গে এই গৃহযুদ্ধে প্রায় ৮ হাজার মানুষ নিহত হয়।

তাদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধে যুদ্ধের প্রায় চার মাস পর ১৯ নভেম্বর এক স্মরণসভায় লিংকন বলেন, ‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা পরিচালিত সরকার ও জনগণের জন্য গঠিত সরকার যেন কখনো পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত না হয়।’ দীর্ঘ ৫ বছর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে যুদ্ধে লিংকন জয়লাভ করেন। তার এই অসাধারণ কর্মের জন্য সর্বসাধারণের কাছে খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তাকে অভিনন্দন জানাতে হাজারো জনতা থিয়েটারে ভিড় জমান।

রাতে আব্রাহাম স্ত্রী মেরি ও সন্তানদের নিয়ে থিয়েটারে আসেন এবং নিজের আসন গ্রহণ করেন। ওই থিয়েটারেই জন উইকস বোথ নামের এক রাজনৈতিক কর্মীর দ্বারা আব্রাহাম গুলিবিদ্ধ হন। ৯ ঘণ্টা অজ্ঞান হয়ে থাকার পর সেই অবস্থায়ই ১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল এই জনগণের নেতা, জনগণের দ্বারা নেতা, জনগণের জন্য নেতা পরলোক গমন করেন। ইলিনয়ের স্প্রিংফিল্ডে তার সমাধিতে এখনো হাজার হাজার গণতন্ত্রকামী মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।