রাজনীতির রাজকুমার

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯ | ৫ চৈত্র ১৪২৫

রাজনীতির রাজকুমার

রাশেদ রহমান ১২:১৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০৭, ২০১৯

print
রাজনীতির রাজকুমার

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বাংলাদেশের রাজনীতির এক বিরল ব্যতিক্রম চরিত্র, যিনি দলীয় আনুগত্য ও আদর্শে অটল থেকেই প্রতিপক্ষেরও প্রিয়ভাজন হতে পেরেছিলেন। তার আরেকটি পরিচয়, তিনি বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় চার নেতার একজন সৈয়দ নজরুল ইসলামের সন্তান। কিন্তু সেই পরিচয়ে কোনো অহমিকা দেখা যায়নি কখনই। উল্টো রাজনৈতিক অঙ্গনে হয়ে উঠেছিলেন সততার প্রতিমূর্তি। গত ৩ জানুয়ারি এ মহামানবের চিরবিদায় ঘটেছে। খোলা কাগজ-এর পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা-

সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের জীবন ছিল ইতিহাসের একটি আলাদা অধ্যায়। রাজনীতিবিদদের নিয়ে মানুষের গড়পড়তা যে ধারণা তিনি ছিলেন তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় চার নেতার একজন সৈয়দ নজরুল ইসলামের সন্তান। তার চেয়ে বড় কথা হলো, পৈতৃক পরিচয় ছাপিয়ে তিনি নিজেই একজন আদর্শ, অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। লোভ আর অনৈতিকতার রাজনীতির ময়দানে তিনি ছিলেন একজন নির্লোভ, নীতিবান রাজনীতিক। এ জন্যই তিনি তরুণদের রাজনৈতিক আদর্শ হতে পেরেছেন। মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তার বাংলাদেশে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম কেবল একটি নাম না; একটি ইতিহাস।

যে কোনো আদর্শ মানুষের মতো বই ছিল তার ভীষণ প্রিয়। রাজনৈতিক নানা কাজে ব্যস্ত থাকার পরও বই পড়ার জন্য তিনি সময় বের করে নিতেন। দূরদৃষ্টিপূর্ণ আর হৃদয়বান এই নেতাকর্মীদের ভীষণ ভালোবাসতেন। ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সরকারের জনপ্রশাসনমন্ত্রী। ছিলেন কিশোরগঞ্জ-১ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। এর আগে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন।

সৈয়দ আশরাফ একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর একজন সদস্য ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় সহ-প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যখন আব্দুল জলিল গ্রেপ্তার হন, তখন সৈয়দ আশরাফ আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পঁচাত্তরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্য তিন জাতীয় নেতার সঙ্গে আশরাফুলের পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলামকে হত্যা করা হয়েছিল। পিতার মৃত্যু পর তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান এবং লন্ডনের হ্যামলেট টাওয়ারে বসবাস শুরু করেন।

লন্ডনে বসবাসকালে তিনি বাংলা কমিউনিটির বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িত ছিলেন। সে সময় তিনি লন্ডনস্থ বাংলাদেশ যুবলীগের সদস্য ছিলেন। আশরাফুল ফেডারেশন অব বাংলাদেশি ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের (এফবিওয়াইইউ) শিক্ষা সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিল।

নব্বইয়ের দশকে আশরাফুল দেশে ফিরে আসেন এবং ছিয়ানব্বইয়ের ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এক সালে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।

আটের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং মন্ত্রিসভা গঠিত হলে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। চৌদ্দর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং আবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তারপর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করেন। এক মাস এক সপ্তাহ দপ্তরবিহীন মন্ত্রী থাকার পর প্রধানমন্ত্রী নিজের অধীনে রাখা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন।

ব্যক্তিগত জীবনে সৈয়দ আশরাফুল ছিলেন একজন উদার মানসিকতার মানুষ। ব্রিটিশ ভারতীয় শীলা ঠাকুরের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। স্ত্রী লন্ডনে শিক্ষকতা করতেন। ২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাদের একটি মেয়ে রীমা ঠাকুর লন্ডনের এইচএসবিসি ব্যাংকে চাকরি করেন।
সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছিলেন আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের সঙ্গী, ক্রাইসিস ম্যানেজার। দলের একজন নির্ভরযোগ্য ও আস্থাভাজন মানুষ।

ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি দলের হাল ধরেছিলেন। দলকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে বিতাড়নের যে খেলা তখন চলেছিল, তার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার।

ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে সৈয়দ আশরাফ থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অসুস্থতার কারণে গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর সংসদ থেকে ছুটি নেন। এই অসুস্থতা নিয়েই ৩ জানুয়ারি ২০১৯ থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে যান বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ। তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর।

দেশে না থাকলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-১ (কিশোরগঞ্জ সদর ও হোসেনপুর উপজেলা) আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়ী হন এই রাজনীতির রাজপুত্র।

জনগণ তাকে চিন্তে ভুলতে করেনি, তিনিও আজীবন ছিলেন জনগণের পাশে, জনগণের প্রাণে। ঢাকার বনানী কবরস্থানে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন।