ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কথকতা

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কথকতা

ডেস্ক রিপোর্ট ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৬, ২০১৮

print
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কথকতা

আদিবাসী কারা? নানা বিতর্ক থাকলেও মোদ্দা কথাটা এমন এ জনগোষ্ঠী কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাস শুরু করে সবার আগে, প্রকৃতির সঙ্গে থাকে নিবিড় সম্পর্ক, বিভিন্ন কারণে বর্তমানে তাদের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন। আমাদের দেশের পাহাড়, প্রকৃতির সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জীবন যেভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, তা এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে প্রাচুর্যেরই লক্ষণ। তবে কালের কষাঘাতে তাদের সাংস্কৃতিক-ভৌগোলিক অধিকার যদি খর্ব হতে থাকে, তাহলে প্রশ্নবিদ্ধ হবে আমাদের বৈচিত্র্যময় পথচলা। বাংলাদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নিয়ে আমাদের আজকের বিবিধ।

সংখ্যা
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সঠিক সংখ্যা নিয়ে আছে নানা পরিসংখ্যান। সরকারি পরিসংখ্যানে বাংলাদেশে এই সংখ্যা ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ১৪১ জন (২০১১ সালের আদমশুমারির হিসাব অনুযায়ী)। আবার তাদের নিজেদের দাবি অনুযায়ী সংখ্যাটা ৩০ লাখেরও ওপরে। বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কত তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতদ্বৈততা আছে। কারও কারও মতে, বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪৭টি আবার কারও কারও মতে সেটা ৫৪। আবার কেউ কেউ বলেন, বাংলাদেশে আদিবাসীর সংখ্যা শতাধিক।

বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে মোটাদাগে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। সমতলের আদিবাসী এবং পাহাড়ের আদিবাসী। পাহাড়ের আদিবাসী বলতে সাধারণত পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান জেলায় বসবাসরত ১১টি জাতিগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়। আর সমতলের আদিবাসী বলতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসীদের বোঝানো হয়।

প্রধান প্রধান সম্প্রদায়

চাকমা
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চাকমা সম্প্রদায় সর্ববৃহৎ। বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল বা তিন পার্বত্য জেলা তথা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় চাকমা সম্প্রদায় বসবাস করে। চাকমা সমাজ এখন পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। আগের প্রথা অনুযায়ী গর্ভবতী মহিলাকে নিজের স্বামীর ঘরে বা স্বামীর গোষ্ঠীর ঘরে সন্তান প্রসব করতে হত। এখন ওই নিয়ম নেই। চাকমা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও এখনো প্রকৃতি, ভূত, দেবতায় বিশ্বাস করে থাকে। চাকমা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ তাদের সম্প্রদায়ের প্রধানকে রাজা বলে।

মারমা
মারমারা পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছে। কথা বলার ক্ষেত্রে মারমাদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও লেখার ক্ষেত্রে তারা বার্মিজ বর্ণমালা ব্যবহার করে। মারমা সমাজ ব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক। একই সামাজিক প্রথায় পরিচালিত হলেও এদের ১০টি গোত্র রয়েছে। মারমারা ৯৯% মানুষ জুম চাষ ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। মারমা পুরুষদের চেয়ে মেয়েরা অধিক পরিশ্রমী। চাষাবাদ, পরিবার ও সংসারের কাজেও মেয়েদের দায়িত্ব বেশি।

সাঁওতাল
একসময় দিনাজপুরের বনাঞ্চলের মাঝে দুই চারটি মাটির দেয়াল ঘেরা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ঘর দেখলেই চেনা যেত যে এখানে সাঁওতালদের বসবাস। এ জনগোষ্ঠীর কিশোররা শিশু বয়স থেকে তীর-ধনুক হাতে নিয়ে বেরিয়ে পরত পাখি, গুঁইসাপ, খরগোশ, বন্য শূকর শিকারে। এরা মূলত পেশায় কৃষক হলেও নেশা শিকার।

১৯৪১ সালের আদমশুমারিতে সাঁওতালদের সংখ্যা ছিল আট লাখ। ৮০ সালে খ্রিস্টান মিশনারীদের ধর্মান্তরিত আগ্রাসী মনোভাবের জন্য সেই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে এক লাখের কিছু বেশি। সর্বশেষ ১৯৯১ সালের আদমশুমারিতে বাংলাদেশে সাঁওতালদের সংখ্যা দুই লাখের কিছু বেশি। সাঁওতালরা অস্ট্র্রিক ভাষাভাষী আদি-অস্ট্রেলীয় নৃগোষ্ঠীভুক্ত। সাঁওতালরা মিশ্র ধর্মে বিশ্বাসী।

খাসিয়া
বাংলাদেশের সিলেট এবং ভারতের আসামে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর বাস। এরা খাসি ভাষায় কথা বলে এবং নিজেদের ‘কি হ্যেনিউ ত্রেপ’ নামে আখ্যায়িত করে। এদের সমাজ ব্যবস্থা মাতৃতান্ত্রিক, বিয়ের পর পুরুষ মেয়ের বাড়িতে গিয়ে বসবাস করে এবং পুরুষরা কোনো সম্পত্তির অধিকার পায় না। খাসিয়ারা পান ও সুপারি খেতে পছন্দ করে এবং তাদের উৎপাদিত পান বেশ জনপ্রিয়। তারা পান-সুপারি এবং কমলার চাষ করে। খাসিয়া ভাষায় গ্রামকে বলে পুঞ্জি। খাসিয়াদের মধ্যে গোত্র বিবাহ নিষিদ্ধ এবং বিয়ে না করা পাপ। তারা বিশেষ কারণ সাপেক্ষে একাধিক স্বামী ও উপপতি রাখতে পারে যদিও এ হার কম। বিয়ের সময় প্রধান খাবার হলো ভাত ও শুঁটকি এবং তিন টুকরা শুঁটকি দেবতাকে সন্তুষ্ট করতে নৈবেদ্য হিসেবে দেয়া হয়।

গারো
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড় ও বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় বসবাসকারী আদিবাসী সম্প্রদায়। ভারতে মেঘালয় ছাড়াও আসামের কামরূপ, গোয়ালপাড়া ও কারবি আংলং জেলায় এবং বাংলাদেশের ময়মনসিংহ ছাড়াও টাঙ্গাইল, সিলেট, শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ঢাকা ও গাজীপুর জেলায় গারোরা বাস করে। গারোরা ভাষা অনুযায়ী বোডো মঙ্গোলীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। জাতিগত পরিচয়ের ক্ষেত্রে অনেক গারোই নিজেদের মান্দি বলে পরিচয় দেন। গারোদের ভাষায় ‘মান্দি’ শব্দের অর্থ হলো ‘মানুষ’।

কোচ
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের অন্যতম একটি হচ্ছে ‘কোচ’। কোচ সম্প্রদায় কৃষ্টির দিক থেকে গারোদের মতো মাতৃতান্ত্রিক হলেও ধর্মীয়সহ বেশকিছু বিষয়ে অন্যদের তুলনায় স্বতন্ত্র। বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, মধুপুর, শ্রীবরদী ও বকশীগঞ্জসহ আরও অনেক এলাকায় কোচদের দেখা যায়। সীমান্তবর্তী ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমানা ঘেঁষে গারো পাহাড়ের উপত্যকায় বসবাসরত আদিবাসী কোচদের বড় অংশটি। বর্তমানে তারা কঠিন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনাচার রক্ষায়। একসময় দক্ষতার সঙ্গে তারা নিজেদের কাপড় নিজেরাই বুনত। তাদের বাঁশ শিল্প কাজও ছিল আকর্ষণীয়। কোচদের শিক্ষার হার খুব কম। বংশ পরম্পরায় এরা আগে থেকে সংস্কৃতিমনা। অবসর সময়ে নাচ, গানের আয়োজন করে চিত্তবিনোদন করত।

ধর্ম
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আচারসংস্কার, রীতিনীতিগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায় তারা ‘সর্বপ্রাণবাদে’ বিশ্বাসী। যেমন গাছ, ফুল, পাথর, অরণ্য, নদী, পাহাড়, পাথর, আকাশ, সূর্য, জল, আগুন, গ্রহ, নক্ষত্র অতিপ্রাকৃত ঘটনা, অলৌকিক শক্তি, যাদুটোনা নানাবিধ বস্তুর মধ্যে অলৌকিক শক্তির উৎস মনে করে পূজা করে। এই বিশ্বাসই হলো ‘সর্বপ্রাণবাদ’। এর মূলে রয়েছে অনিবার্যভাবে নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা।

কর্ম
‘জুম চাষ’ হলো বাংলাদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নিজস্ব বাজার ব্যবস্থা। যেখানে সারা বছর পর্যায়ক্রমে ধান, তিল, তুলা, শাকসবজি, ফুলসহ অনেক রকমের ফসলের চাষ হয়। বলা হয়ে থাকে, কেবল লবণ আর জ্বালানি তেল ছাড়া বাকি সবকিছু জুমে উৎপাদন করা হয়। জঙ্গল কেটে পুড়িয়ে জুম চাষ করা হয়। অনেক দিন আবাদের ফলে জমির উর্বরতা কমে গেলে, অন্য জায়গায় আবার কৃষিজমি গড়ে তোলা হয়। পাহাড়ের ঢালে চাষ করা হয়। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন জেলা নিয়ে গড়ে ওঠা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ পাহাড়িই জুম চাষি। পাহাড়ের এই চাষ পদ্ধতি বেশ কষ্টসাধ্য।

বিয়ে
বাংলাদেশের সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিয়ের রীতি প্রায় একই। বিয়ের দুদিন আগে উভয় পক্ষকে গা চালানী বা গ্রামপূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। এ ছাড়া বিয়ের দিন কনের বাড়িতে যাওয়ার আগে বরকে সাক্ষী পূজা হিসেবে আমগাছকে বিয়ে করতে হয়। আমগাছের চারপাশে চালুন বাতি (মাটির প্রদীপ) নিয়ে বরকে সাতপাক ঘোরানো হয়। বিয়েবাড়ির উঠোনে সাজানো হয় চলমা তলা। চারটি কলাগাছ সমান চারটি গর্তে পুঁতে দেওয়া হয়। তার আগে গর্তে দেওয়া হয় পয়সা। বিয়ের দিন কনের বাড়িতে বরপক্ষ পৌঁছানোর পর তুলসী জল ছিটিয়ে তাদের বাড়ির ভেতরে আনা হয়। এতে শয়তান বাড়ির ভেতরে ঢুকতে পারে না বলে এরা বিশ্বাস করে। এরপর কনের মা বরকে পা ধুয়ে বরণ করে নেন। পনের সঙ্গে বরকে আনতে হয় দুই কলসিতে টাডি (এক প্রকার মদ), ঘাস, কলা, বিড়ি, পান-সুপারি, চিনি, বাতাসা, তেল, জল, সিন্দুর, চাল, ভাত, ধূপ, বাতি, ডিম, দুধ, আমকুঁড়ি, আমপাতা, তুলসী পাতা, ধান, আলো চাল প্রভৃতি।

কনে সাজিয়ে বর-কনেকে চলমা তলায় কাঠের পিঁড়িতে বসানো হয়। সে সময় উভয়ের মামা ও কাকা বসা অবস্থায় তাদের পিঁড়ি ধরে চলমা তলার চারপাশে সাতপাক ঘোরে। এ সময় বর প্রতি পাকে তুলসী পাতা দিয়ে কনেকে জল ছিটিয়ে দেয়। অতঃপর বর তার বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুল দিয়ে সিঁদুর পরায়। এভাবেই তারা একে অপরের জীবনসঙ্গী হয়ে যায়। বিয়ের পর্ব শেষে কনেকে তুলে দেওয়া হয় বরপক্ষের মোড়লের হাতে।

বিলুপ্তপ্রায় সম্প্রদায়

খেয়াং
১৭ বছর আগে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারত সীমান্তের মধ্যবর্তী এলাকা থেকে ১৫টি খেয়াং পরিবার বান্দরবানের থানচি উপজেলার শাহাজান বম পাড়ায় আসে। দুই বছর থাকার পর ১৩টি খেয়াং পরিবার চলে যায় থানচির দুর্গম রেমাক্রী মৌজায়। এখন থানচি সদরের শাহাজান বম পাড়ায় রয়েছে এ সম্প্রদায়ের মাত্র দুটি পরিবার। এ দুটি পরিবারের সদস্য সংখ্যা হচ্ছে মাত্র ৭ জন। অন্যদিকে থানচির দুর্গম রেমাক্রী মৌজায় বসবাস করা ১৩টি খেয় পরিবার জানে না তারা কোন দেশ থেকে এসেছে। শুধু এটুকু জানে দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তাদের পূর্ব পুরুষরা মিয়ানমার, ভারত ও বাংলাদেশ সীমান্তের মধ্যবর্তী একটি গ্রামে বসবাস করত। কোথায় থেকে, কোন দেশ থেকে কেন তারা সীমান্ত এলাকা এসেছিল জানে না। তবে ধারণা করা হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় খেয়াং পরিবারগুলো ভারত, মিয়ানমার থেকে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নেয়। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধ শেষ হলেও এসব খেয়াং পরিবার নিজেদের দেশে ফিরতে পারেনি।

লুসাই
পার্বত্য চট্টগ্রামে লুসাই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা খুবই নগণ্য। ভারতের মিজোরামে লুসাই পাহাড়কে ঘিরেই মূলত লুসাই জনগোষ্ঠীর বসবাস। লুসাই পাহাড় থেকেই পার্বত্যাঞ্চলের লুসাই জনগোষ্ঠীর আগমন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্ত হওয়ার পর ব্যাপক সংখ্যায় লুসাইরা পার্বত্য চট্টগ্রাম ত্যাগ করে মিজোরামে চলে যায়। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বান্দরবানে লুসাই জনগোষ্ঠীর লোকসংখ্যা ২৯৩ জন। বড় বড় পাহাড়ের পাদদেশে কুটির ঘর বানিয়ে বসবাস করে লুসাইরা। ধর্মীয়ভাবে এরা সবাই খিস্ট্রান ধর্মাবলম্বী।

পাংখোয়া
পাংখোংয়া জনগোষ্ঠী এখন বিলুপ্তপ্রায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের মিজোরাম থেকে বাংলাদেশে আসে পাংখোয়ারা। পার্বত্য চট্টগ্রামের শুধু বান্দরবানে পাংখোয়া নৃ-গোষ্ঠীরা বসবাস ছিল। ২০০১ সালে আদমশুমারি অনুসারে বান্দরবানে পাংখোয়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ১২৮ জন। তবে বর্তমানে পার্বত্য বান্দরবানে পাংখোয়া সম্প্রদায় নেই বললেই চলে। পাংখোয়া জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী।

খুমি
এ জনগোষ্ঠীর বসবাস মূলত আরাকান রাজ্যে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় খুমিদের একটি অংশ পালিয়ে বান্দরবানে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। খুমিরা বৌদ্ধ ধর্মালম্বী হলেও কিছু কিছু খুমি বর্তমানে খিস্ট্রান ধর্মে দীক্ষা নিয়েছেন। ২০০১ সালে আদমশুমারি অনুসারে বান্দরবানে খুমি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ১,৪৭১ জন, বর্তমানে তা ৮ শতাধিক।

উৎসব

বিজু
বাংলা বছরের শেষ দুই দিন ও নতুন বছরের প্রথম দিন এ উৎসব হয়। অনুষ্ঠানের প্রথম দিন ‘ফুল বিজু’ নামে পরিচিত। এ দিন ভোরে পানিতে ফুল ভাসানো হয়। তরুণ-তরুণীরা পাড়ার বৃদ্ধদের গোসল করিয়ে দেয়। তবে বিজু উৎসবের মূল দিন নববর্ষের প্রথম দিন। চাকমা ভাষায় এ দিনটির নাম গজ্জ্যেপজ্জ্যে, অর্থাৎ গড়াগড়ি খাওয়ার দিন। এ দিন ভালো খাবার রান্না করা হয়। মনে করা হয়, বছরের প্রথম দিন ভালো রান্না করলে বছরজুড়ে অভাব থাকবে না।

বৈসুক
চাকমাদের বিজুর মতো এ উৎসবও তিন দিনের। নববর্ষের প্রথম দিন বয়স্করা ছোটদের আশীর্বাদ করেন। আর কিশোরীরা কলসি কাঁখে নিয়ে বয়স্কদের খুঁজে খুঁজে গোসল করায়। তরুণ-তরুণীরা রং খেলায় মেতে ওঠে। একজন আরেকজনকে রং ছিটিয়ে রঙিন করে দিয়ে গোসল করে আবারো আনন্দে মেতে ওঠে।

সাংগ্রাই
পার্বত্য চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বৃহত্তম আদিবাসী গোষ্ঠী মারমা। পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন করলেও বাংলা পঞ্জিকা অনুসরণ করে না। তারা বর্মীপঞ্জি, অর্থাৎ মিয়ানমারের ক্যালেন্ডার মেনে চলে। সাংগ্রাই উৎসবের মূল আকর্ষণ ‘রিলং পোয়েহ’। এটি পানি ছোড়াছুড়ির খেলা। মারমা তরুণ-তরুণীরা একে অপরকে পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দেয়। তাদের বিশ্বাস, এর মাধ্যমে অতীতের সব দুঃখ-গ্লানি ও পাপ ধুয়ে-মুছে যায়।

কারাম
সমতলের আদিবাসীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘কারাম উৎসব’ বা ‘ডাল পূজা’। ওঁরাও, সাঁওতাল, মালো, মুন্ডা, মাহাতো, ভুইমালি, মাহলীসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে এ উৎসবে অংশ নিয়ে থাকে। এ আদিবাসীরা ‘কারাম’ নামক একটি গাছের ডালকে পূজা করেন বলে এ উৎসবের আরেক নাম ‘ডাল পূজা’।

সহরায়
সাঁওতালদের কাছে গৃহপালিত গরু, মহিষের গুরুত্ব অনেক। সহরায় উৎসবে এসব প্রাণীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। উৎসবকে ঘিরে বিবাহিত মেয়েরা তাদের বাবার বাড়ি যাওয়ার সুযোগ পান। কারণ উৎসবে তাদের আমন্ত্রণ জানানো একটি রেওয়াজ। এ পর্বের নির্দিষ্ট কোনো দিনক্ষণ নেই। গ্রামের মোড়লদের নিয়ে সভা করে উৎসবের দিন ঠিক করা হয়।