মেঘ কি উত্তর দেব তোমাকে!

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫

মেঘ কি উত্তর দেব তোমাকে!

শিমুল জাবালি ৫:২৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৫, ২০১৮

print
মেঘ কি উত্তর দেব তোমাকে!

সাংবাদিকদের সাধারণত বৈরী শক্তির সঙ্গে কাজ করতে হয়। তাই সাংবাদিক হত্যার ইতিহাস নতুন কিছু নয়। সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ডের পর সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বাদ যায়নি বাংলাদেশ প্রসঙ্গও। ১৯৯৬ থেকে চলতি বছর পর্যন্ত অন্তত ২৬ সাংবাদিক খুন হয়েছেন বাংলাদেশে। দেখা গেছে, ‘অদৃশ্য শক্তির’ প্রভাবে অধিকাংশ সময় ছাড়া পেয়ে যায় অপরাধীরা। তেমন একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড। লিখেছেন শিমুল জাবালি

পাঁচ বছরের ফুটফুটে ছেলে মেঘ; সাগর-রুনির একমাত্র আদরের সন্তান। সকালে বাবা-মার ঘরে গিয়ে সে দেখল, ক্ষত-বিক্ষত লাশ পড়ে আছে। ভয়ঙ্কর এ দৃশ্য দেখে শিউরে ওঠে ছোট্ট মেঘ। কেঁদে কেঁদে মায়ের মোবাইল থেকে নানুকে জানায়, ‘আমার আব্বু-আম্মু মারা গেছে।’
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। সেই ভয়ঙ্কর কলঙ্কময় সকালে বাংলাদেশ সাক্ষী হয়ে থাকল একটি জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিকে হত্যা করা হয়েছে তাদের ফ্ল্যাটেই। কারা করল, কেন করল-এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা-অধরা রয়ে গেছে এখনো। অথচ হত্যার পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রহস্য উদঘাটনের আশ্বাস দিয়েছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
হত্যাকাণ্ডের পর রুনির ভাই নওশের আলম শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
প্রথমে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন ওই থানার একজন উপ-পরিদর্শক। চার দিন পর চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। টানা ২ মাসেরও বেশি সময় তদন্ত করে ডিবি রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ হয়। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে ১৮ এপ্রিল হত্যা মামলাটির তদন্তভার র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। র‌্যাব তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর সাগর-রুনির মরদেহ কবর থেকে তোলার আবেদন জানায়। ২০১২ সালের ২৬ এপ্রিল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুজ্জামানের উপস্থিতিতে সাগর-রুনির মরদেহ তোলা হয়। তাতে পরীক্ষা করে দেখা যায়, নিহত সাগর-রুনিকে হত্যার আগে কোনো নেশাজাতীয় খাবার পানীয় দেওয়া হয়নি এবং কোনো বিষও পাওয়া যায়নি। হত্যাকাণ্ডের ৮ মাস পর ২০১২ সালের ১০ অক্টোবর বনানী থানার একটি হত্যা ও ডাকাতি মামলায় প্রেপ্তার থাকা ৫ আসামি মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু বকুল মিয়া, কামরুল হাসান অরুন, রফিকুল ইসলাম ও আবু সাঈদকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।


কিন্তু সাগর-রুনির পরিবার বলছে, মামলার তদন্ত থমকে গেছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করে না। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ হত্যাকাণ্ডের কী অগ্রগতি হয়েছে তা তারা বলতে পারেন না।
র‌্যাবের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, সাগর-রুনির বাসার পলাতক দারোয়ান এনামুল হক ওরফে হুমায়ূনকে ধরতে পারলে হত্যাকাণ্ডের রহস্যজট খুলে যাবে। এ জন্য এনামুলকে ধরতে ১০ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু, ২০১৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এনামুলকে গ্রেপ্তার করা হলেও খোলেনি এর রহস্যজট। এ হত্যাকাণ্ডের পর দুই দফায় ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ছুরি, ছুরির বাঁট, চুল, সাগরের মোজা, একটি কম্বল, সাগরের পরনের প্যান্ট, সাগরের হাত-পা বাঁধা কাপড় ও রুনির পরনের টি-শার্ট পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে।
প্রথম দফায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এসব আলামত থেকে দুজন ব্যক্তির সম্পূর্ণ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়। পরে এ দুই ব্যক্তির প্রোফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার জন্য এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার নিহত সাংবাদিক দম্পতির পারিবারিক বন্ধু তানভীর, দুই নিরাপত্তাকর্মী পলাশ রুদ্র পাল ও এনামুল ওরফে হুমায়ুন কবীর এবং পাঁচ ডাকাত রফিকুল, বকুল, সাইদ, মিন্টু ও কামরুল হাসান ওরফে অরুণের চুল ও লালা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। সূত্র জানায়, র‌্যাবের পক্ষ থেকে ওই সময় বলা হয়েছিল, এ আলামত পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পেলে তদন্ত নতুন মোড় নেবে। সেই পরীক্ষার একটি প্রতিবেদনও হাতে পেয়েছিল মামলার তদন্ত সংস্থা। কিন্তু সেই ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে কারও ডিএনএ মেলেনি। এতে এ মামলার ক্লু উদঘাটন এবং খুনিরা ধরা পড়েনি।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, এ নিয়ে চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পিছিয়েছে ৫৪ বার। বছরের পর বছর ধরে চলছে তদন্ত। কেন এত দেরি? তার যুৎসই কোনো উত্তর নেই তদন্ত কমিটির হাতে।
কিন্তু মেঘ! তুমি তো বড় হচ্ছ। দেরিতে হলেও সব বুঝতে শুরু করেছ বা আর ভালোভাবে বুঝতে শুরু করবে। যখন তুমি এ দেশের মানুষকে প্রশ্ন করবে, তখন তারা কি উত্তর দেবে? মেঘ! তোমার মা আকাশে গেছে বেড়াতে। যেতে নক্ষত্র হয়ে গেছে। কি উত্তর দেব তোমাকে?

বিচার না হওয়া তালিকায় দশম
সাংবাদিক হত্যায় বিচার না হওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) সম্প্রতি ‘গেটিং অ্যাওয়ে উইথ মার্ডার’ শিরোনামে সিপিজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিচারহীনতার সূচক তৈরি করা হয়েছে। সিপিজে বলেছে, তালিকায় থাকা সাংবাদিকরা তাদের কাজের জন্য খুন হয়েছেন।
সংগঠনটির গবেষণায় দেখা গেছে, সাংবাদিক হত্যার দুই-তৃতীয়াংশই ঘটেছে তাদের পেশাগত কাজের কারণে। এ তালিকায় বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে পাকিস্তান। দেশটির অবস্থান সপ্তম। অন্যদিকে ভারতের অবস্থান ১২। গত বছরও বাংলাদেশের অবস্থান দশম ছিল। তবে এ তালিকার শীর্ষে রয়েছে সোমালিয়া।
সিপিজের হিসেবে, বাংলাদেশে গত এক দশকে সাতজন সাংবাদিক খুনের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সিপিজে আলোচনায় নিয়ে এসেছে মুক্তমনা ব্লগারদের প্রসঙ্গও। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক দশকে তাদের মৌলবাদী ও অপরাধী গোষ্ঠীগুলো খুঁজে বের করে হত্যা করেছে। নিহত ব্যক্তিরা ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। সিপিজে প্রতিবছর ২ নভেম্বর ‘সাংবাদিকদের ওপর সংঘটিত অপরাধের বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি বন্ধে’ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

মানিক সাহা : বোমা মেরে হত্যা
২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি দুপুরে খুলনা প্রেস ক্লাবের অদূরে দুর্বৃত্তদের বোমা হামলায় নৃশংসভাবে নিহত হন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অকুতোভয় সাংবাদিক, মানবাধিকার ও পরিবেশকর্মী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক সাহা।
মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত দৈনিক সংবাদ ও নিউএজ পত্রিকার খুলনাস্থ জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, ইটিভি প্রতিনিধি ও বিবিসি বাংলার খণ্ডকালীন সংবাদদাতা ছিলেন তিনি।
হত্যার ১৩ বছর পর ২০১৬ সালে খুলনার বিভাগীয় দ্রুত বিচার আদালতের এক রায়ে ৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। অভিযুক্ত মোট ১১ জনের মধ্যে দুজন খালাস পেয়েছে।

শামছুর রহমান কেবল : গুলি করে হত্যা
যশোরের নির্ভীক সাংবাদিক দৈনিক জনকণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি শামছুর রহমান। কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি দৈনিক ঠিকানা, দৈনিক বাংলা, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, দৈনিক গণশক্তি পত্রিকায় কাজ করেছেন। এ ছাড়া তার বিভিন্ন উপ-সম্পাদকীয় ও রাজনৈতিকবিষয়ক লেখা দেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৯৭ সাল থেকে তিনি জনকণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০০০ সালের ১৬ জুলাই রাতে জনকণ্ঠের যশোরের অফিসে ঢুকে তাকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। একটি চিঠি লেখার সময় ঘাতকরা তার কক্ষে প্রবেশ করে গুলি করে।

গৌতম দাস : শ্বাসরোধে হত্যা
২০০৫ সালের ১৭ নভেম্বর দৈনিক সমকাল পত্রিকার ফরিদপুরের নিজস্ব প্রতিবেদক ও ফরিদপুর ব্যুরো প্রধান সাংবাদিক গৌতম দাসকে হত্যা করা হয়। গলায় রশি বেঁধে শ্বাসকষ্টে হত্যা করা হয় তাকে। মামলা সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুর শহরের মুজিব সড়কের সংস্কার এবং পুনর্নির্মাণের অনিয়ম ও দুর্নীতির সংবাদ পরিবেশন করায় সাংবাদিক গৌতম দাসের ওপর ক্ষুব্ধ হয় ঠিকাদার গোষ্ঠী ও তাদের সহযোগী চক্র। এর জের ধরে তাকে খুন করা হয়। হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৮ বছর পর ২০১৩ সালের ২৭ জুন এ মামলায় ৯ জনের যাবজ্জীবন রায় দেন আদালত।

শেখ বেলালউদ্দিন : বোমা হামলায় নিহত
২০০৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে খুলনা প্রেস ক্লাবের অভ্যন্তরে সাংবাদিক শেখ বেলাল উদ্দিনের ওপর বোমা হামলা হয়। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১১ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যু হয়। শেখ বেলালউদ্দিন ছিলেন খুলনা প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি, মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন খুলনার সভাপতি, দৈনিক সংগ্রামের খুলনা ব্যুরো প্রধান, দক্ষ সংগঠক ও সেই সঙ্গে একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাংবাদিক নেতা। এ ঘটনার পর স্থানীয় চরমপন্থীরা এ হত্যায় দায় স্বীকার করেছিল। পরে পুলিশ চরমপন্থী ও সাবেক শিবির নেতাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছিল। এ হত্যা মামলায় কয়েকজন চরমপন্থীর যাবজ্জীবন সাজা হয় এবং শিবির নেতারা বেকসুর খালাস পান।

আবদুল হাকিম : গুলি করে হত্যা
দৈনিক সমকালের সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুর উপজেলা প্রতিনিধি আবদুল হাকিম শিমুলকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র হালিমুল হক মীরের ব্যক্তিগত শটগানের গুলিতে আহত হন শিমুল। আহতাবস্থায় বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ঢাকায় আনার পথে সাংবাদিক শিমুলের মৃত্যু হয়। তবে হত্যাকাণ্ডের মামালাটি এখনো বিচারাধীন।

সুবর্না নদী : কুপিয়ে হত্যা
চলতি বছরের ২৮ আগস্ট বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘আনন্দ টিভি’র পাবনা প্রতিনিধি সুবর্না নদীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পাবনা পৌর সদরের রাধানগর মহল্লায় সাংবাদিক নদীর বাসায় ঢুকে অতর্কিত এলোপাতাড়ি কুপিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ঘটনার পর তাকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সুবর্না নদী আনন্দ টিভির পাশাপাশি দৈনিক জাগ্রতবাংলা পত্রিকায় পাবনা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, পারিবারিক জের ধরেই এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। হত্যাকাণ্ডের মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

আরও যারা
এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সাংবাদিকদের হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, সাইফুল আলম মুকুল, মির ইলিয়াস হোসাইন, নাহার আলি, হারুনুর রশিদ, শুকুর হোসাইন, সৈয়দ ফারুক আহমেদ, হুমায়ুন কবির, কামাল হোসেন, দীপঙ্কর চক্রবর্তী, শহীদ আনোয়ার, গোলাম মাহফুজ, বেলাল হোসেন দফাদার, ফরহাদ খাঁ, জামাল উদ্দিন, তালহাদ আহমেদ কবিদ, দেলোয়ার হোসেন, মশিউর রহমান উৎস প্রমুখ।