যমুনায় নৌকাতেই জেলেদের দিনরাত

ঢাকা, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০ | ২৭ চৈত্র ১৪২৬

যমুনায় নৌকাতেই জেলেদের দিনরাত

এইচ এম আলমগীর কবির ২:১৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০২০

print
যমুনায় নৌকাতেই জেলেদের দিনরাত

আধুনিক সভ্যতায় মানুষ যেখানে উন্নত জীবন-যাপন করছে ঠিক সেখানে ভাসমান জেলেরা অভাবের সংসার চালাতে প্রচন্ড শীতেও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে যমুনা নদীতে। শুধু তাই নয়, জীবন সংসার চালাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কেউ কেউ বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছে। যমুনায় জেগে উঠেছে অসংখ্য ডুবোচর। মিলছেনা পর্যাপ্ত পরিমান মাছ। এরপরও হাড় কাঁপানো শীতে যমুনায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ৫০ বছরের মোংলা হাওয়ালদার। শুধু মোংলা একাই নয়, তার মতো আরো অনেকেই রাতের অন্ধকার কেটে আলো ফোটার আগেই যমুনার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত চষে বেড়ায় পেটের তাগিদে। এভাবেই যমুনা নদীতে জেলেদের হাসি-কান্না জমে থাকে নৌকায়।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কেউ ছেঁড়া জাল মেরামত করছে, কেউ করছেন রান্নার কাজ, কেউবা আবার ঘুমাচ্ছেন। এই জেলেরা ১৫ থেকে ২০ দিনের জন্য নৌকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় মাছ ধরতে। বাড়ি থেকে বের হবার পর নৌকাতেই শুরু হয় রান্না, খাওয়া, ঘুম। এমন দৃশ্য চোখে পড়ে উপজেলার কাজিপুর, চৌহালী, এনায়েতপুর, শাহজাদপুর ও সদরসহ অনেক জায়গাতে। এদিকে মাছ ক্রয় করতে আসা ক্রেতারা বেশ কয়েক জন ছোটাছুটি করছে মাছ কিনতে। তারা বলছেন, শুনেছি এখানে সন্তায় যমুনার টাটকা বিভিন্ন ধরনের মাছ পাওয়া যায়। তাই মাছ কিনতে চলে এসেছি। অপর দিকে জেলে পরিবাররা শিক্ষা-দীক্ষা ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। পেটের তাগিতে প্রত্যেক নৌকাতে প্রায় ৭/৮ জন জেলে থাকে। নদীর জলে ভেসে ভেসে কাটিয়ে দিচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধে লড়ছে তারা।


সকাল বেলায় নৌকা নিয়ে বের হয় মাছ ধরতে। নদীর বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরা শেষে বিকেলে ফিরে আসে সদর ও কাজিপুর উপজেলার বাজারের মাছের আড়তে। নদীপাড়ের স্থানীয় বাজারে মাছ বিক্রি করে পাওনাদারদের দেনা পরিশোধ ও খাবার সামগ্রী ক্রয়ের পর তাদের হাতে জৎসামান্য কিছু থাকে। সেই অর্থেই তাদের বাড়িতে চলে সংসার ও ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া।

কাজিপুর উপজেলার মেছড়া ইউনিয়নের আকনাদিঘী গ্রামের বাহেচ শেখের ছেলে আব্দুল মালেক (৪৫) ও লোকমান শেখের ছেলে বাদশা আলম (৪০) জানান, নদী এখন শুকিয়ে মাঝে মাঝে ডুবোচর পড়েছে। আবার কোথাও পলি জমে নালায় পরিণত হয়েছে। অনেকে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দিয়ে বিভিন্ন পেশায় চলে গেছে। আমাদের বয়স হয়েছে। বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে কি করবো তাই কোন রকম আমরা মানবেতর জীবনযাপন করছি।

ছোনগাছা ইউপি’র পাঁচ ঠাকুরী স্পার বাঁধ এলাকায় কথা হয় কুড়িগ্রাম জেলার চর জাৎরাপুর গ্রামের ময়নূল শেখের ছেলে নুর হোসেন আজগর আলীর ছেলে মিজানুর বলেন, বাড়ী থেকে বের হয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পরে বাড়িতে চেলে যায়। আর মাছ না পেলে ১৫ থেকে ২০ দিন পর যেতে হয়। আমরা প্রতি নৌকায় ৭ থেকে ৮ জন জেলে থাকি। যে পরিমান মাছ জালে পাই বিক্রি করে টাকা সমান ভাগ করে নিই।

জেলে আব্দুল খালেক বলেন, নদীতে পর্যাপ্ত মাছ জালে পড়ছে না। এ নিয়ে চিন্তায় আছি। সপ্তাহে কিস্তি ও বাড়ীতে বউ পোলা আছে। যে পরিমান মাছ পাচ্ছি তাতে আমাদের কোন রকম খেয়ে না খেয়ে দিন পার হচ্ছে। তার পরেও জালে যদি বড় মাছ পড়ে। সেই মাছ এলাকার প্রভাবশালীরা দাম মাত্র দিয়ে নিয়ে যায়।

সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্যজীবি সমিতি’র সভাপতি মোঃ সুরুতজামান জানান, যমুনা নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় জেলার চরাঞ্চলের এক হাজারের বেশি নৌ-শ্রমিক এবং জেলে আজ বেকার হয়ে পড়েছে। ওই সব নৌ-শ্রমিক এবং জেলেরা বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দিয়ে অতিকষ্টে জীবনযাপন করছেন। যমুনা নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনলে হয়তো ওই সব শ্রমিক পুনরায় তাদের পেশায় জড়িয়ে পড়তে পারবে। এ জন্য নদী খনন করা জরুরি হয়ে পরেছে।