বন্যার্তদের দুর্ভোগ বাড়ছে

ঢাকা, শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বন্যার্তদের দুর্ভোগ বাড়ছে

খোলা কাগজ ডেস্ক ৯:৩৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০১৯

print
বন্যার্তদের দুর্ভোগ বাড়ছে

সারা দেশে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি ও অবনতির মধ্যে আছে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই ভোগান্তি বাড়ছে। পানি কমে যাওয়ায় সেসব এলাকায় ত্রাণের জন্য হাহাকার। অন্যদিকে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে-

আনসার বাহিনীর ত্রাণ
কালিগঞ্জ (লালমনিরহাট) : লালমনিরহাটের বন্যা দুর্গতরা যখন শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানিসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খাবার সংকটে তখন বন্যার্ত এসব মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে জেলা আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। গতকাল রোববার দুপুরে লালমনিরহাট ২৭ আনসার ব্যাটালিয়নের পরিচালক ও আনসার ও ভিডিপি’র জেলা কমান্ড্যান্ট আসাদুজ্জামান গণী প্রধান অতিথি থেকে এসব ত্রাণ বিতরণ করেন। তিস্তা নদীর তীরবর্তী সদর উপজেলার কালমাটি ও কালীগঞ্জ উপজেলার ভুল্লারহাট এলাকার তিন শত বন্যার্তদের প্রত্যেককে ১ কেজি চিড়া, আধা কেজি মুড়ি, আধা কেজি গুড়, ২ প্যাকেট বিস্কুট, খাবার স্যালাইন ২ প্যাকেট, ২ টি দিয়াশলাই ও পানি বিষুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ১ পাতা করে ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হয়।এসময় আনসার ও ভিডিপির জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
ভাসছে বসতভিটা

চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) : যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট ও বসতভিটা পানিতে ভাসছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাঠদান উপযোগী হয়ে উঠেনি, রাস্তায় যাতায়াতসহ কাটেনি বন্যার্তদের আর্তনাদ।
চলতি বন্যায় যমুনার চরাঞ্চলসহ ডুবে গেছে প্রায় প্রত্যেক গ্রাম। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাস্তা ঘাট এখনো পানির নীচে। বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য, ওষুধ ও বাসস্থান সংকটে পানি বন্ধি হাজার হাজার মানুষ।
ত্রাণের জন্য হাহাকার

চিলমারী (কুড়িগ্রাম) : বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হলেও পানিতে ভাসছে গোটা চিলমারী। উপজেলার ৬ ইউনিয়নে প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। সরকারিভাবে ত্রাণ অপ্রতুল হওয়ায় সবার ভাগ্যে এখনও ত্রাণ জোটেনি। ফলে বন্যা দুর্গত মানুষরা এখন চরম সংকটে রয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্র গুলোতে ত্রাণের (শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি) জন্য হাহাকার দেখা দিয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যানরা জানান, ব্রহ্মপুত্র নদে পানি বৃদ্ধির ফলে উপজেলার ৩০ হাজার ৯৩৯ পরিবারের প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলা শহরের হাসপাতালের সামনে থেকে প্রেসক্লাব চিলমারী পর্যন্ত মাত্র ২শ মিটার রাস্তা ছাড়া গোটা উপজেলা পানির নিচে। এই ২শ মিটার জায়গা দখল করে নিয়েছে পাশ্ববর্তী মানুষের গরু-ছাগল ও গুটি কয়েক কাচাঁমালের (সবজি) দোকান। বাড়ীতে পানি ওঠায় বানভাসী মানুষরা পরিবার পরিজন ও গরু, ছাগল নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে।

 

ত্রাণ নিয়ে পুলিশ
দুর্গাপুর (নেত্রকোণা) : নেত্রকোনার দুর্গাপুরে ক্ষতিগ্রস্থ বন্যাদুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. সাইদুর রহমান। গতকাল রোববার সাড়ে ১২টার দিকে বাকলজোড়া ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে জেলা পুলিশ সুপারের সৌজন্যে দুর্গাপুর থানা পুলিশ ঐ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ প্রায় দুই শতাধিক পরিবারের মাঝে শুকনা খাবারসহ ত্রাণসামগ্রি বিতরণ করা হয়।
এ সময় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম, দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মীর মাহবুবুর রহমান, সাংবাদিক কলি হাসান তালুকদার প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।

দুর্ভোগে লাখো মানুষ
ইসলামপুর (জামালপুর) : বন্যায় ইসলামপুর উপজেলা ৩লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বন্যা কবলিত এলাকা মানুষের মাঝে ত্রাণের জন্য হাহাকার চলছে। শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও গো খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যা পানিতে নৌকা দেখলেই হাত বাড়িয়ে ডাকছে পানিবন্ধী ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার।

গত ৭দিন ধরে পানিতে ভাসছি, কেউ খোঁজ নেয়নি- ইসলামপুর উপজেলা পশ্চিমাঞ্চলের বন্যা কবলিত এলাকা চিনাডুলী ইউনিয়নের উত্তর সিংভাঙ্গা গ্রামের মাহমুদ বেগম, কালী বেগম, হেনা বেগম, তোতা শেখ, আছিয়া বেগম ও রাবেয়া খাতুনসহ আরো অনেকেই এভাবে অভিযোগ করে কথাগুলো বলেন।

প্রশাসন ও ব্যাক্তি উদ্যোগে বন্যা কবলিত এলকা প্রতিদিনই যে পরিমান ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে তা প্রয়োজনীয় তুলনায় অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন বানভাসী এলাকার জন প্রতিনিধি ও বন্যা কবলিত মানুষ।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
লালমনিরহাট : লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলার ২০টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হওয়ায় গবাদিপশু, মৎস্য ও গ্রামীন রাস্তাঘাট, কালভার্টের ব্যাপক ক্ষতি হযেছে। বন্যার পানির তোড়ে ভেসে গেছে পাকা রাস্তা, ছোট ছোট সেতুর শোল্ডার দেবে গিয়ে বন্ধ রয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার হাতীবান্ধা জিসি হতে বড়খাতা জিসি সড়কের গড্ডিমারী এলাকায় ৩০ মিটার পাকা রাস্তা তালেবের মোড় এলাকার ৫০মিটার কাচা রাস্তা বন্যার পানির তোড়ে ভেংগে গেছে। এতে উপজেলার সাথে গড্ডিমারী ইউনিয়নের মানুষের যোগাযোগ বন্ধ রযেছে।

পাটগ্রাম উপজেলার জোংড়া ইউনিয়নে একটি সেতু , আদিতমারী উপজেলায় সারপুকুর ইউনিয়নে একটি সেতু ও সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর ও রাজপুর ইউনিয়নের দুটি সেতুর শোল্ডার দেবে যায়। এছাড়া জেলার প্রায় ১১শ পুকুর,জলাশয়ের প্রায় ৪ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে এবং ৮ হাজার গবাদিপশুর ক্ষতি হয়েছে। এ ব্যাপারে লালমনিরহাট স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশলী অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী এ কেএম আমিরুজ্জামান দেশ জানান, এবারের বন্যায় গ্রামীন রাস্তা-ঘাটের বেশ ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়-ক্ষতির পরিমান নির্ণয়ে কাজ চলছে বলে তিনি আরো জানান।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ

নাগরপুর (টাঙ্গাইল) : টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির কারণে গতকাল রোববার পর্যন্ত ৯২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১০টি, মাদরাসা ০৪টি, কলেজ ২টি এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৭৬টি। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত প্রায় ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বন্যায় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে। পাইকশা পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ইতিমধ্যে পানির তোড়ে ভেঙে যমুনা নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। আরও কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙন হুমকিতে রয়েছে। এদিকে সরকারিভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের কোন নির্দেশনা না থাকায় অভিভাবকরা উভয় সংকটে পড়েছেন।
নতুন এলাকা প্লাবিত

শরীয়তপুর : উত্তরাঞ্চলের বন্যার পানি নেমে আসায় শরীয়তপুর জেলার নদ-নদীর পানি অব্যাহত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে নুতন নুতন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে পদ্মা নদীর পানি সুরেশ্বর পয়েন্টে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ফলে জাজিরা ও নড়িয়া উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে নড়িয়-জাজিরা, বিলাসপুর-রাজনগর, বিলাসপুর-কাজিয়ারচর রাস্তার কিয়দাংশ ডুবে গেছে। এতে করে জাজিরা নড়িয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা হুমুকির মুখে। ইতোমধ্যে বন্যার পানিতে নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর, মোক্তারেরচর ও রাজনগর ইউনিয়নের নিম্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জাজিরা উপজেলার পূর্বনাওডোবা ইউনিয়নের পাইনপাড়া এলাকায় চরাঞ্চলের বাড়ির আঙ্গিনায় পানিতে তলিয়ে গেছে।

মানবেতর জীবন-যাপন

সদরপুর (ফরিদপুর) : ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যার পানি ২সে: মি: বৃষ্টি পেয়ে বিপদসীমার ৬৮ সে: মি: উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যায় নতুন নতুন এলাকা প্রালাবিত হয়েছে ও নদী ভাঙ্গনে তীব্রতা দেখা দিয়েছে। পদ্মা আড়িয়াল খাঁর চর অঞ্চলের নারিকেল বাড়িয়া, চর নাছিরপুর, চর মানাইর, ঢেউখালী ও আকোটেরচর এলাকাসহ আংশিক ৫টি ইউনিয়নে বন্যায় ভয়াবহ রুপ দেখা দিয়েছে। আড়িয়াল খাঁ নদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায়। গত ২৪ ঘন্টায় উপজেলার উক্ত ইউনিয়নের প্রায় ৫ হাজার লোক পানি বন্দি হয়ে ও শতাধিক ঘরবাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে পরিবার মানবত জীবন যাপন করছে। উপজেলার কৃষি অফিসের সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৩ হাজার হেক্টর ফসলি জমি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ।

উলিপুরে পাঠদান বন্ধ

উলিপুর (কুড়িগ্রাম) : কুড়িগ্রামের উলিপুরে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে ২শ ১৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান বন্ধ রয়েছে। এ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একদিকে যেমন পানিতে নিমজ্জিত অপরদিকে রাস্তা-ঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তবে তুলনামূলক উচুস্থানে নির্মিত কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্যার্ত মানুষজন গবাদিপশুসহ আশ্রয় নিয়েছেন। উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদরাসা ও কলেজসহ ২শ ১৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান রোববার পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল কাদের জানান, বন্যার বিপর্যয় কেটে গেলে পানিতে তলিয়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর তালিকা তৈরি করে সেগুলো সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুতই তা সংস্কার করা সম্ভব হবে এবং শিক্ষার্থীরা পূর্বের ন্যায় আবার শিক্ষা গ্রহন করতে পারবে।