আতঙ্কের জনপদ না.গঞ্জ

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

আতঙ্কের জনপদ না.গঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৫৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০১৮

print
আতঙ্কের জনপদ না.গঞ্জ

খুন-গুমের নগরীতে পরিণত হয়েছে প্রাচ্যের ড্যান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জ। পরিণত হয়েছে আতঙ্কের জনপদে। যে কোনো সময় গুম হওয়া, লাশ হয়ে বাড়ি ফেরার আতঙ্ক সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ায় এ শহরের বাসিন্দাদের। ২০১৪ সালের রোমহর্ষক সেই সাত খুনের ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জ নতুন করে আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়। সে আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না নারায়ণগঞ্জবাসীকে।

সম্প্রতি আরও কয়েকটি গুম-খুনের ঘটনা নারায়ণগঞ্জবাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে। গত রোববারও নারায়ণগঞ্জে ৫টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আড়াইহাজারের পাঁচরুখী এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক থেকে উদ্ধার করা হয়েছে চার এবং রূপগঞ্জ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে একজনের গুলিবিদ্ধ লাশ। প্রথমে অজ্ঞাত বলা হলেও পরে এসব লাশের পরিচয় মিলেছে। আড়াইহাজার থেকে পাওয়া চার মৃতের তিনজনের স্বজনরা অভিযোগ করেছে এক সপ্তাহ আগে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে ভুলতা থেকে তাদের তুলে নেওয়া হয়েছিল। যাদের পরিচয় মিলেছে তারা হলেন- পাবনা জেলার আতাইকুলা ইউনিয়নের ধর্মগ্রাম এলাকার খায়রুল সরদারের ছেলে মো. সবুজ সরদার (১৭), জামাল উদ্দিনের ছেলে ফারুক হোসেন (৪০) এবং লোকমান শেখের ছেলে জহিরুল ইসলাম (১৯)। এর আগে রোববার বিকালে লুৎফর রহমান মোল্লা (৩৭) নামে এক গাড়িচালকের লাশ শনাক্ত করেন তার স্ত্রী। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ রোববার সাংবাদিকদের বলেছে, ‘গ্যাংওয়ারে’ তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
এর আগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর রূপগঞ্জে অজ্ঞাতনামা তিন যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। পূর্বাচল উপশহরের কাঞ্চন-কুড়িল বিশ্বরোডের (৩০০ ফুট সড়ক) আলমপুর এলাকায় ১১ নম্বর সেতুর নিচে পাওয়া গিয়েছিল ওই তিন লাশ। প্রথমে পরিচয় জানা না গেলেও পরে তাদের পরিচয় মেলে। নিহতরা হলেন- মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ির বিক্রমপুর গ্রামের নূর হোসেন বাবু (২৯), ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের শিমুল আজাদ (২৬), রাজধানীর মুগদা এলাকার সোহাগ ভূঁইয়া (৩৪)। তারা তিনজনই অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গার্মেন্ট পণ্যের ব্যবসা করতেন। তাদের পরিবারের লোকজন দাবি করেছেন, সাদা পোশাকধারী কিছু লোক পুলিশ পরিচয়ে তাদের আটক করে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। প্রত্যেকের বুকে ও মাথার একাধিক স্থানে গুলির চিহ্ন ছিল।
সেপ্টেম্বর মাসের ২১ তারিখ রূপগঞ্জে একটি বিল থেকে অজ্ঞাতনামা (৩২) আরেক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ধারণা করা হয়, দুর্বৃত্তরা ২-৩ দিন আগে তাকে হত্যা করে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে বিলের পানিতে ফেলে রেখে যায়।
এভাবে একের পর এক খুনের ঘটনা নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে করে তুলেছে অস্থির। এ বছরের শুরুতেই জানুয়ারি মাসে সিদ্ধিরগঞ্জে তৃতীয় শেণির ছাত্রী রোকসানা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা, ফেব্রুয়ারিতে ফতুল্লায় মোনালিসা হত্যা, মার্চে কোতালের বাগের বউবাজার এলাকায় রীমা হত্যা, এপ্রিলে আড়াইহাজারে মায়ের হাতে সন্তান হত্যার ঘটনা আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর ৩ মে রূপগঞ্জেই পাওয়া যায় এক অজ্ঞাতনামা যুবকের লাশ। জুন মাসে সিদ্ধিরগঞ্জে মা ও মেয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আলোচিত হয় দেশজুড়ে। জুলাই মাসে ২১ দিন নিখোঁজ থাকার পর শহরের আমলাপাড়ার বন্দুর বাসার সেপটিক ট্যাংকে পাওয়া যায় স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর চন্দ্র ঘোষের খণ্ডিত লাশ।
এ ছাড়া ২৭ জুন মাউরি এলাকায় শিউলি নামের এক গৃহবধূকে শ্বাসরোধ করে হত্যা, ২৪ জুন সোনারগাঁওয়ের বাইশটেকে নুরুল ইসলাম সিকদার নামের এক নৈশপ্রহরীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা, তার আগে ১ জুন একই উপজেলার শম্ভুপুরা ইউনিয়নে এমতাজ হোসেন নামের আরেক নৈশপ্রহরীকে কুপিয়ে হত্যা, ২২ জুন আড়াইহাজারে তুমিজউদ্দিন মামের এক বৃদ্ধের গলিত লাশ উদ্ধার, ২১ জুন সিদ্ধিরগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে কচুরিপানার ভেতর থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক মেয়ে শিশুর পচন ধরা লাশ উদ্ধারের ঘটনা আতঙ্কের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।
নারায়ণগঞ্জ জেলায় রূপগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই সবচেয়ে বেশি নাজুক বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক হয়রানি এখানে নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বর মাসে এ উপজেলায় ১৩টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব কারণে সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক বেড়ে গেছে।