ঝুঁকিতে শিশুরা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

ঝুঁকিতে শিশুরা

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৩৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৮, ২০১৮

print
ঝুঁকিতে শিশুরা

চিকিৎসা বিজ্ঞানে আতঙ্কের নাম অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সকে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধরা হচ্ছে। যখন ব্যাক্টেরিয়ার ওপর অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা থাকে না তখনই জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। WHO-এর হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর ৭ লাখ মানুষ মারা যায় এর কারণে।

কয়েকটি কারণে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স হতে পারে। সাধারণত প্রয়োজনের অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক সেবনে অথবা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন করে দেওয়া ডোজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই তা ছেড়ে দিলে শরীরের ব্যাকটেরিয়া মিউটেটেড বা পরিবর্তিত হয়ে শক্তিশালী ব্যাক্টেরিয়ায় রূপান্তরিত হয় যার ওপর অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো প্রভাব পড়ে না। বাংলাদেশেও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। শিশুরা এতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। কিছুদিন আগে এক শিশুর শরীরে ক্লেবসিলা ব্যাকটেরিয়া থেকে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স পাওয়া গেছে। ক্লেবসিলা, যাকে সাধারণত খুবই অকার্যকর ব্যাকটেরিয়া হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে এটি রেজিস্টেন্স তৈরি করেছে, যার বিরুদ্ধে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক অথবা ড্রাগ কাজ করছে না।

জানা গেছে, পরিবারের ছোট্ট শিশুটি অসুস্থ হলে সবাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে। কেউ ছুটে যায় ডাক্তারের কাছে। আবার কেউ বা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়াতে শুরু করে। অসুখ যাই হোক না কেন দেখে শুনে ওষুধ খাওয়ানোটা খুব জরুরি। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের ব্যবহার হওয়া চাই যথাযথ।

যেমন টাইফয়েডের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে জ্বর হয়; প্যারাসিটামল দিয়ে জ্বর কমানো হলো উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা। কিন্তু শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকা টাইফয়েডের জীবাণু ধ্বংস করতে না পারলে জ্বর নির্মূল হয় না। জ্বর নির্মূল করতে হলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে হয় এবং এটি হলো নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা। এভাবে নির্দিষ্ট প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন অসুখে অ্যান্টিবায়োটিকের নির্বাচননির্ভর করে অসুখের প্রকৃতির ওপর। আবার ভাইরাসজনিত অসুখে এর কোনো প্রয়োজনই নেই। যেমন শিশুদের সাধারণ ঠাণ্ডা-কাশি হয়। কাজেই অসুখ নির্ণয় না করে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজনে সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করা অথবা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যেতে পারে। কিন্তু উপসর্গ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সব ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ ঠিক নয়।

অ্যান্টিবায়োটিক যেমন জীবন রক্ষার জন্য অতি প্রয়োজনীয়। তেমনি এর অপব্যবহারের কারণে শিশুস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়। শরীরের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো (যা রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে) অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে নিঃশেষ হয় বলে শিশুরা সহজেই রোগাক্রান্ত হয়ে পরে। অর্থাৎ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এ ছাড়া Drug resistance তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অর্থাৎ পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকে জীবাণুর কার্যকারিতা থাকে না। বাবা-মা অনেক সময় পরিপূর্ণ ডোজে অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পন্ন করেন না, যেমন যে অ্যান্টিবায়োটিকটি পাঁচ বা সাত দিন খাওয়ানোর কথা ছিল তা কোনোমতে দুই বা তিন দিন খাইয়ে বন্ধ করে দেন অথবা তিন বেলার পরিবর্তে দুই বেলা অথবা এক চামচের জায়গায় আধা চামচ ওষুধ খাওয়ান। এতে ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু বিস্তার লাভ করে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সুরাইয়া বেগম গতকাল খোলা কাগজকে বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক যেখানে প্রয়োজন সেখানেই দিতে হবে অপ্রয়োজনে দেওয়া যাবে না। যদি শিশুরা রোগে আক্রান্ত হয় এবং চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকরা শিশুদের অ্যান্টিবায়োটিক দেন তাহলে অ্যান্টিবায়োটিকে কোর্সটি যথাযথভাবে শেষ করতে হবে। ওষুধ বিক্রেতাদের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ট্রেজারার ও বক্ষব্যাধি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান খোলা কাগজকে বলেন, সব অ্যান্টিবায়োটিকে পাশ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। জ্বর বা কাশি হলেই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা ঠিক নয়।

অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক হতে হবে। কেননা, শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। তিনি আরও বলেন, শিশুদের যদি ড্রাগ রেজিস্টাড ডেভেলপ করে তাহলে এ ক্ষতিটি তাদের সারা জীবন বইতে হবে। তিনি বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক কম মাত্রায় বা বেশিমাত্রায় যেভাবেই দেওয়া হোক শিশুদের ক্ষেত্রে রেজিস্টেন্স ডেভেলপ করতে পারে। যা শিশুদের জন্য খুবই ক্ষতিকর।