৯ বছরে সংখ্যালঘুদের ওপর ৩৫০০ হামলা

ঢাকা, রবিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২১ | ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

৯ বছরে সংখ্যালঘুদের ওপর ৩৫০০ হামলা

প্রীতম সাহা সুদীপ
🕐 ৯:৫৩ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০২১

৯ বছরে সংখ্যালঘুদের ওপর ৩৫০০ হামলা

শারদীয় দুর্গোৎসবের তৃতীয় দিন কুমিল্লায় পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে পূজামণ্ডপ ও হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনার রেশ ধরেই হাজীগঞ্জ, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গত কয়েক দিন ধরে একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে।

সর্বশেষ গত রোববার ধর্ম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কথিত আপত্তিকর পোস্টকে কেন্দ্র করে রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দুপল্লীতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

চলমান এই পরিস্থিতির মধ্যে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ৯ বছরে সারা দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৩ হাজার ৬৫৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষরাই। এদিকে সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতিকে ভয়ঙ্কর উদ্বেগের চোখে দেখছেন সুশীল সমাজ ও বিশিষ্টজনরা।

তারা বলছেন, ধর্মভিত্তিক ও রাজনৈতিক ইস্যু, দখলদারিত্বসহ বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন সময় দেশে ছোট ছোট সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে আসছে। তবে যারা এসব ঘটনা ঘটায় তাদের কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির না থাকায় দিন দিন পরিস্থিতি ভয়াবহ হচ্ছে। একটি মহল বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট করতে, সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করতে এবং সম্প্রীতি নষ্টের অপচেষ্টা হিসেবে পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে।

নয় বছরে সাড়ে ৩ হাজার সাম্প্রদায়িক হামলা

বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) প্রতি বছর মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০১৩ সাল থেকে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার ঘটনাগুলোরও আলাদা পরিসংখ্যান তারা প্রকাশ করে আসছে।
সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে করা এসব প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৯ বছরে সারা দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৩ হাজার ৬৫৮টি হামলার ঘটনা ঘটে। বছরগুলোতে শুধু মন্দির ও উপাসনালয়ে হামলা এবং প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে ১৬৭৮টি। হামলার শিকার প্রায় ৯৯ শতাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।

আসকের তথ্যমতে, শুধু চলতি বছরের (২০২১ সাল) জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে হিন্দুদের বাড়িঘরে ১০২টি হামলার ঘটনা ঘটে। ৭৮টি মন্দির ও উপাসনালয়ে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। এসব ঘটনায় আহত হন সাতজন। এর আগে ২০২০ সালে করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও থেমে ছিল না সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা। বছরটিতে হিন্দুদের ১২টি বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়, ৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ৬৭টি মন্দির-উপাসনালয়ে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। এসব ঘটনায় আহত হন ৭১ জন।

২০১৯ সালে হিন্দুদের ৫৩টি বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ৭২টি মন্দির-উপাসনালয়ে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। আহত হন ১০১ জন। তার আগের বছর ২০১৮ সালে ৯৭টি উপাসনালয়ে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ২৯টি হিন্দু বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়। এসব ঘটনায় একজন মারা যান, আহত হন আরও ৪৬ জন। ২০১৭ সালে ৪৫টি বাড়িঘর ও ২১২টি উপাসনালয়ে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। আহত হন ৬৭ জন মানুষ।

২০১৬ সালে সংখ্যালঘুদের ১৯২টি ঘরবাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ১৯৭টি মন্দির-উপাসনালয়ে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। বছরটিতে ৭ জন হিন্দু খুন হন, এসব হত্যাকাণ্ডের অনেকগুলো ‘জঙ্গি হামলা’ বলে পরে জানায় পুলিশ।

২০১৫ সালে ১০৪টি বাড়িঘরে, ২১৩টি উপাসনালয়ে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। আহত হন ৬০ জন। তার আগের দুই বছর ২০১৪ সাল ও ২০১৩ সাল বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ভয়ঙ্কর চিত্র দেখা গেছে। ২০১৪ সালে সারা দেশে সংখ্যালঘুদের ৭৬১টি বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর করা হয়। ১৯৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ২৪৭টি মন্দির-উপাসনালয়ে হামলা-প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় একজন নিহত, ২৫৫ জন আহত এবং ধর্ষণের শিকার হন একজন। আর ২০১৩ সালে ২৭৮টি বাড়িঘর, ২০৮টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ৪৯৫টি উপাসনালয়ে হামলা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় একজন মারা যান, আহত হন ১৮৮ জন।

এবার দুর্গোৎসবে ৭০টি পূজামণ্ডপে হামলা:

এদিকে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্তের মতে, সংখ্যালঘুদের ওপর বিগত বছরগুলোতে হামলার প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হবে। তিনি বলেন, আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী যে সংখ্যা আপনারা পেয়েছেন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রকৃত সংখ্যা এর থেকেও অনেক বেশি হবে। গত ১৩ বছরে শুধু হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাই ঘটেছে কয়েক হাজার।

রানা দাশগুপ্ত বলেন, কুমিল্লার ঘটনার রেশ ধরে এবার দুর্গাপূজায় দেশের বিভিন্ন স্থানে তিন দিনে ৭০টি পূজামণ্ডপে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসবের বাইরে ৩০টি বাড়ি এবং ৫০টি দোকানেও ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে যতই আশ^াস দেওয়া হোক, ঘটনার সময় কেউই পাশে থাকে না। পুলিশ, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি কিংবা রাজনৈতিক দল কাউকেই পাশে পাওয়া যায় না। কুমিল্লার ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী হামলাকারীদের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়ে বক্তব্য রাখলেন। কিন্তু পরের দিনই চৌমুহনী, চট্টগ্রামসহ নানা জায়গায় হামলা হলো। এখন হিন্দুদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

বিচারহীনতার সংস্কৃতিতেই বাড়ছে সাম্প্রদায়িক হামলা:

বিশিষ্টজনরা বলছেন, দেশে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা নতুন নয়। আগেও রামু থেকে নাসিরনগর বার বার একই ঘটনা ঘটেছে। বছরের পর বছর পার হয়েছে কিন্তু কোনো ঘটনারই বিচার হয়নি। নিশ্চিত হয়নি অপরাধীদের শাস্তি। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির কারণেই বাড়ছে সাম্প্রদায়িক হামলা।

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) সাধারণ সম্পাদক চারুচন্দ্র দাস ব্রহ্মচারী বলেন, পূজামণ্ডপ, মন্দির ও হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা ও সহিংসতার ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের হামলা কখনো বন্ধ হবে না। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব।

লেখক ও সংগঠক শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদীরা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। তারা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছে, যে কারণে কুমিল্লার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত হামলা হয়েছে। যারা এ হামলা করছে তাদের তো শাস্তি হচ্ছে না। মামলা হয়, তবে সেই মামলায় সাক্ষ্য দেবে কে? যিনি সাক্ষ্য দেবেন তিনি আবার হামলার শিকার হবেন। তাই তাদের বিচারও হয় না। সাক্ষ্য সুরক্ষা আইন ও সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ছাড়া এ ধরনের অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে না।’

রংপুরের অপরাধীরা শনাক্ত, আটক ৪৫ : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দুদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ-লুটপাটের ঘটনায় সম্পৃক্তদের তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, ‘ওই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ৪৫ জনকে ইতিমধ্যে আটক করা হয়েছে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।’

গতকাল সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘কুমিল্লা ও রংপুরের ঘটনা এই সূত্রে গাঁথা। রংপুরের ঘটনায় কোনো জীবনহানি হয়নি, তবে সম্পদহানি হয়েছে, বাড়িঘর পুড়িয়েছে। আমরা মনে করি এই লোকদের আমরা চিহ্নিত করেছি তাৎক্ষণিকভাবেই। এলাকাবাসীর সহায়তায় ৪৫ জনকে ধরেছি এবং আরো কয়েকজনকে ধরার জন্য চেষ্টা চলছে।

ঘটনার সূত্রপাত এক কিশোরের ফেসবুক পোস্ট নিয়ে। ছেলেটিকে এখনো পাওয়া যায়নি। আমার কাছে যে তথ্য এসেছে, সেখানে ২৫টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে। দুস্কৃতকারীরা বাড়িঘর লুট করেছে। ৯০ শতাংশের বেশি বাড়িঘরে লুটপাট এবং ভাঙচুর করেছে।’

 

 
Electronic Paper