পেঁয়াজের বাজার ঠিক রাখতে মরিয়া সরকার

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১ | ৬ কার্তিক ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

পেঁয়াজের বাজার ঠিক রাখতে মরিয়া সরকার

সাজেদ রোমেল
🕐 ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০২১

পেঁয়াজের বাজার ঠিক রাখতে মরিয়া সরকার

আগামী এক মাস পেঁয়াজের বাজার পরিস্থিতি একটু নাজুক থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কারণ, এই সময় নতুন উৎপাদিত পেঁয়াজ বাজারে আসবে না। তবে এই এক মাস পেঁয়াজের বাজার পরিস্থিতি যাতে সহনীয় থাকে, সেই চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে পেঁয়াজের শুল্ক আগামী চার মাসের জন্য প্রত্যাহার করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআরকে) অনুরোধ জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় আশা করছে, এ ব্যাপারে দু-একদিনের মধ্যে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।

গতকাল সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ, সরবরাহ, আমদানি ও মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক-স্থিতিশীল রাখতে অনুষ্ঠিত এক সভা শেষে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই আশঙ্কার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপের কথা জানানো হয়। সভায় ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডালের মূল্য নিয়েও আলোচনা হয়। সভার শুরুতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান এই চার পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ও বাংলাদেশের পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় পেঁয়াজ পরিবহনকারী ট্রাক চলাচলে যাতে জটলা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে প্রতিদিন দুটি দল ঢাকায় সিটি করপোরেশন এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ বাজার তদারক করবে। আর সারা দেশে বাজার মনিটরিং অব্যাহত রাখা হবে। জেলা-উপজেলায় জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে এই মনিটরিংয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সহায়তা করবেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, টিসিবি গত সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিদিন সারা দেশে ৪০০ ট্রাকে ৪০০ থেকে ১ হাজার কেজি পেঁয়াজ বিক্রির কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ ছাড়া ভারত ও তুরস্ক থেকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ ইতিমধ্যেই সংগ্রহ করা হয়েছে। আরও পেঁয়াজ সংগ্রহের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

দেশে ৩ মাসের পেঁয়াজ মজুদ আছে বলে আশ্বস্ত করলেন মন্ত্রী: দেশে এই মুহূর্তে পাঁচ লাখ টন পেঁয়াজ মজুদ আছে, যা দিয়ে আগামী আড়াই থেকে তিন মাস চলতে পারে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টার কোনো ত্রুটি করবো না। আমরা চেষ্টা করবো যাতে পেঁয়াজের দাম সহনীয় রাখা যায়। গতকাল সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ, সরবরাহ, আমদানি, মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে আয়োজিত সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। এ সময় বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ, অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম শফিকুজ্জামান, প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান, ট্যারিফ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, আমাদের দেশে এই মুহূর্তে ৫ লাখ টন পেঁয়াজ মজুদ আছে, যা দিয়ে আগামী আড়াই থেকে তিন মাস চলতে পারে। ভারত ছাড়াও মিয়ানমার থেকে যদি পেঁয়াজ আনা যায় তাহলে কিন্তু এতো প্রেসার পরার কথা না। তবে বৃষ্টিজনিত কারণে কিছুটা দাম বেড়েছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করবো একমাসের কথা বলা হয়েছে সেটাও যেন সহনীয় মাত্রায় রাখা যায়। সব নিত্যপণ্যের মূল্য বেড়ে যাচ্ছে অথচ আজ চারটি পণ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আমাদের আইনে যে ১৭টি নিত্য পণ্য আছে তেল, চিনি, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, মসলা এই জাতীয়। সেগুলোর বিষয়ে আমাদের আইনে ক্ষমতা দেওয়া আছে মূল্য নির্ধারণে। বাকি পণ্যগুলোতে মূল্য বেধে দেওয়ার ক্ষমতা নেই। তবে উৎপাদনসহ অন্যান্য পরিস্থিতি অন্যন্য মন্ত্রণালয় দেখে।বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যেগুলো দেওয়া সেগুলো আমরা মনিটর করার চেষ্টা করবো। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা চারদিক থেকে চেষ্টা করছি যাতে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। যতোদিন পর্যন্ত আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হবো না ততো দিন পর্যন্ত কখনো কখনো আমাদের মূল্যে নিয়ে ক্রাইসিসে পড়তে হবে। আশার কথা হলো এ বছর আমাদের গত বছরের তুলনায় উৎপাদন ভালো আছে। অন্তত এক লাখ টন পেঁয়াজ বেশি উৎপাদন হয়েছে।

প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান বলেন, লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইতোমধ্যে পেঁয়াজের দাম ৫ থেকে ৭ টাকা কমে গেছে। এছাড়া সরকারি ব্যবস্থাপনায় টিসিবির মধ্যে ট্রাক সেলের জন্য আরও আমদানি করা হচ্ছে। এর ফলে আমাদের সরবরাহ উন্নিত হবে। এক মাসের যে কথাটা বলা হচ্ছে, সেখানে তদারকি বাড়ানো হবে, আশা করা যায় নেতিবাচক কোনো প্রভাব পড়বে না। সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে পেঁয়াজ যেন ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে।

পেঁয়াজের দাম এক মাস বেশি থাকবে বলে আশঙ্কা সচিবের: দেশের পেঁয়াজের যথেষ্ট মজুদ রয়েছে। তারপরও আগামী এক মাস পেঁয়াজের দাম বেশি ও নাজুক থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ। আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার, অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, পাম তেল ও চিনি আমদানিতে শুল্ক হ্রাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) অনুরোধ জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষের ওই অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান।

বাণিজ্য সচিব বলেন, পেঁয়াজ, চিনি, তেল ও ডাল এই চার পণ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে পেঁয়াজ নিয়ে আমাদের দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। তিন সপ্তাহ আগে ভোজ্য তেল ও চিনি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তখন চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ভিন্ন, কারণ পেঁয়াজ শতকরা ৮০ ভাগ দেশে উৎপাদন হয়। মাত্র ২০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। এর কিছু ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করা হয়। তবে, সম্প্রতি ভারতে অতিবৃষ্টির জন্যে ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দাম কিছু বেড়েছে। সেটার প্রভাব দেশের ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের দাম কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছেন। এজন্য আংশিক দায়ী ভারতের বাজারে দাম বৃদ্ধি এবং আংশিক আশঙ্কা থেকে যে ভারতে দাম আর বাড়তে পারে বা পেঁয়াজ রপ্তানি যদি বন্ধ করে দেয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি। যাতে নিত্যদ্রব্য পণ্য নিয়ে যেসব ট্রাক স্থলবন্দর দিয়ে আসে সেগুলো যে কোথাও আটকে না থাকে।

তপন কান্তি ঘোষ বলেন, বিআইব্লিউটিএ-কে বলা হয়েছে যেন ফেরি সার্ভিস নির্বিঘ্ন রাখা হয়। এনবিআরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে পেঁয়াজে ৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করার জন্য। তেল ও চিনির অগ্রিম ট্যাক্স প্রত্যাহার করার জন্য এনবিআরকে লিখেছিলাম মাসখানেক আগে। এর বাইরেও আমরা কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি, যেমন মিয়ানমার থেকে আরো বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ আনার জন্য। তিনি বলেন, অতি মুনাফা যেন কেউ নিতে না পারে সে বিষয়ে মন্ত্রী দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনার যে মনিটরিং সেটা যথেষ্ট শক্ত করা হয় সেটা জানিয়ে দিয়েছি।

তিনি বলেন, জেলা প্রশাসককে চিঠি লেখা হয়েছে, স্থানীয় বাজারগুলো মনিটরিং করতে। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য কেউ বেশি নিচ্ছে কিনা সেটা দেখার জন্য যদি নিয়ে থাকে ভোক্তা অধিকার আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলার হয়েছে। টিসিবি নিয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিন ৪শ ট্রাকে ৩০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন ১৪০ থেকে ১৫০ টন পেঁয়াজ বিক্রি করছি। এটা আরো বাড়ানো হয়ে তুরস্ক থেকে আর ১৫ হাজার টন পেঁয়াজ আনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে গেছে। কিছু খালাসও হয়েছে। গতকাল আমাদের একটি টেন্ডার হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পেঁয়াজ আনবো। আগামী ১৭ তারিখ আরও একটি টেন্ডার হবে। অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে পেঁয়াজও আমদানি করা হচ্ছে। আমরা আশা করছি আমাদের যে মজুদ পরিস্থিতি আছে তাতে বলা যায় পেঁয়াজের মূল্য পরিস্থিতি এর থেকে আর বেশি খারাপ হবে না। তবে, আগামী এক মাস পেঁয়াজের পরিস্থিতি নাজুক থাকবে। উৎপাদনের দিক থেকে বা ভারতের পরিস্থিতির দিক থেকে বিচার করলে। এদিকে ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন গত দুইদিনে পেঁয়াজের দাম ৫ থেকে ৭ টাকা কমেছে।

 
Electronic Paper