কী হবে গরিবের আমিষের

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

কী হবে গরিবের আমিষের

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৪১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০১৮

print
কী হবে গরিবের আমিষের

দিন দিন মাছ-মাংসের দাম যখন বেড়েই চলছে তখন আমিষের চাহিদা মেটানোর জন্য সাধারণ মানুষের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে ডিম। সম্প্রতি ডিমের দাম কিছুটা বেড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষকে প্রতিদিনকার আমিষ পূরণে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অন্যদিকে ডিমের দাম বাড়লেও খরচ পোষাতে পারছেন না পোলট্রি ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত ১০ বছরে যে হারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বেড়েছে সে তুলনায় ডিমের মূল্য বাড়েনি।

উপরন্তু টানা কয়েক বছর লোকসানে ডিম বিক্রি করতে হয়েছে খামারিদের। সব মানুষের পুষ্টি চাহিদা নিশ্চিত করতে সরকারেরও নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে। এ ক্ষেত্রে কৃষিসহ অন্য খাতে যেমন ভর্তুকি দেওয়া হয় তেমনি পোলট্রি খাতেও ভর্তুকির কথা ভাবা উচিত সরকারের। তা না হলে সাধারণ মানুষের কাছে প্রাণিজ আমিষ পৌঁছানো সম্ভব হবে না।

গতকাল শুক্রবার বিশ্ব ডিম দিবসে সুস্থ-সবল জাতি গঠনে সব বয়সে ডিম খাওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের নীতিমালা প্রণয় এবং খামারিদের বিশেষ সহযোগিতা দানের দাবি উঠে এসেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাজারে এখন গরুর মাংসের কেজি ৫০০-৫৫০ টাকা। খাসির মাংস কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ টাকা। এ ক্ষেত্রে পোলট্রি মুরগির মাংস ১২০ টাকা থেকে ১৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আর ডিম চার মাস আগে মিলত ডজন ৭০ থেকে ৭২ টাকায়। আর তা এখন মিলছে ১১০ থেকে ১২০ টাকায়। ডিম থেকে প্রাণিজ আমিষের যে চাহিদা পূরণ হতো তার জন্য এখন গুনতে হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দাম। তারপরও ভোক্তারা ডিম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নাজমা শাহীন বলেন, আমাদের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ গরু কিম্বা খাসির মাংষ কিনতে পারেন না। ফলে তাদের প্রাণিজ আমিষের জন্য নির্ভর করতে হয় ডিমের ওপর। একসময় গ্রামগঞ্জে বাসাবাড়িতে পালন করা হাঁস-মুরগি থেকে এ প্রাণিজ আমিষের জোগান আসত। দেশে পোলট্রি শিল্প গড়ে ওঠার ফলে আমিষের বিশাল চাহিদা মেটাচ্ছে এ খাতটি। মানুষ এখন আমিষের জন্য ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

বাজারে ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিকে পোলট্রি ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচকভাবেই দেখছেন ওয়ার্ল্ড পোলট্রি সাইন্স অ্যাসোসিয়েশনের বাংলাদেশ শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হাসান। তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি কারণে ডিমের দাম বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে বার্ড ফ্লুতে অনেক মুরগি মারা গেছে। এতে মুরগির প্রোডাকশন কমে যায়। ফলে ডিমও কম উৎপাদন হয়। এক বছর ধরে খামারিরা লোকসান দিয়ে ডিম বিক্রি করেছেন। প্রতিটি ডিম উৎপাদনে খরচ হয় ছয় টাকা। কিন্তু বিক্রি করতে হয়েছে চার থেকে সাড়ে চার টাকায়। এই লোকসানের ফলে অনেক খামারি মুরগি বিক্রি করে দিয়েছেন। সে কারণে প্রোডাকশন কমে গেছে। একইসঙ্গে বাজারে ডিমের চাহিদাও বেড়ে গেছে। ফলে দাম বেড়ে গেছে।

ডিমের দাম বাড়ার পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীরাও দায়ী বলে মনে করনে মাহবুব। বলেন, খামারি থেকে ভোক্তার মাঝখানে একটি শ্রেণি দুই থেকে আড়াই টাকা প্রতি ডিমে লাভ করে নিচ্ছে। সরাসরি খামারি থেকে খুচরা বাজারে ডিম পৌঁছাতে পারলে ডিমের দাম কমে আসবে।

ডিম দিবস উপলক্ষে গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক সভায় ডিম খাওয়ার গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে বলা হয়েছে এসডিজি (সাস্টটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল) অর্জনে মাথাপিছু ১০৪টি ডিম দরকার। তাই ডিমের উৎপাদন বাড়াতে হবে। স্বল্প আয়ের মানুষের মাঝে বেশি করে ডিম খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে দেশের অপুষ্টির চিত্র আমূল পাল্টে যাবে বলেও জানান সভার বক্তারা।
কিন্তু প্রশ্ন জেগেছে, ডিমের বাজার অস্থির রেখে সাধারণ মানুষের পুষ্টির চাহিদা নিশ্চিত এবং পোলট্রি শিল্পের ঝুঁকি কীভাবে কমানো যাবে? এ নিয়ে সরকার কিংবা সংশ্লিষ্টদের কোনো চিন্তাভাবনা আছে কি না?
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের মোট চাহিদার ৯৫ শতাংশ ডিমই উৎপাদন করছেন দেশের খামারিরা। কিন্তু এরপরও লোকসান গুনতে হয় দেশের পোলট্রি ব্যবসায়ীদের। গতকাল বিপিআইসিসির সভাপতি মসিউর রহমানও বলেছেন, দেশের গণমাধ্যমে চাল, চিনি, দুধ, আটা এমনকি লবণের বিজ্ঞাপনও প্রচারিত হয়। কিন্তু আমাদের দেশে ডিমের কোনো বিজ্ঞাপন দেখা যায় না। কারণ, ডিম বিক্রি থেকে যে লাভ পাওয়া যায় তা দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচারের খরচ বহন করা সম্ভব নয়। এ জন্য তিনি তথ্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চেয়েছেন।
বিপিআইসিসি সূত্র জানিয়েছে, আমিষ ও পুষ্টি চাহিদা মেটাতে বর্তমানে দেশে বছরে ১ হাজার  ৪৯৩ কোটি ৩১ লাখ পিস ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। চাহিদা রয়েছে ১ হাজার ৬৯৪ কোটি ১৬ লাখ পিস। সে হিসাবে বছরে বাংলাদেশের প্রয়োজনের তুলনায় ২০০ কোটি ৮৫ লাখ পিস ডিমের ঘাটতি রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ডিম নানা খাদ্যপণ্যে ব্যবহৃত হয়। ডিমের বিশাল বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আলাদা পোলট্রি শিল্প। দেশের ১৬ কোটিরও বেশি মানুষের খাদ্য তালিকায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রতিদিন ২ কোটি পিসের মতো ডিম প্রয়োজন পড়ছে। হিসাব বলছে, প্রতিদিন ডিম বিক্রি হচ্ছে ৩০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। বছরে ডিম বাণিজ্যকে ঘিরে লেনদেন হচ্ছে ১১ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা। আর একজন মানুষ বছরে ডিম খাচ্ছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০টি। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) মতে, একজন মানুষের স্বাভাবিক পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজন ন্যূনতম ১০৪টি ডিম। উন্নত বিশ্বে বছরে প্রতিজন মানুষ ডিম খায় ২২০টির মতো।
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশন বলছে, দেশে বর্তমানে পোলট্রি শিল্পে বিনিয়োগ সাড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আশির দশকে এ বিনিয়োগ ছিল মাত্র এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সরকারের সহযোগিতা পেলে ২০২০ সাল নাগাদ এ খাতে বিনিয়োগ হবে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার মতো। তখন দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি মুরগির মাংস ও ডিম রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গার্মেন্ট শিল্পের পরপরই অবস্থান পোলট্রি খাতের। সারা দেশে বর্তমানে প্রায় ৬৫-৭০ হাজার ছোট-বড় খামারে নারী-পুরুষ মিলে বর্তমানে ৬০ লাখ শ্রমিক কাজ করছে। এ খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১৫-১৮ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, ১৯৪৭ সালে ছয়টি পোলট্রি ফার্ম স্থাপনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এ শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন এ খাতটি অবহেলিত থাকে। ১৯৮০ সালের দিকে বাণিজ্যিকভাবে পোলট্রি শিল্পের বিকাশ ঘটতে থাকে। গত তিন দশকেরও বেশি সময়ে এ খাতটি দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প খাতে রূপ নিয়েছে। দেশের মোট প্রাণিজ আমিষের ৪০-৪৫ শতাংশই জোগান দিচ্ছে এ পোলট্রি শিল্প।