নকল ডিম বলে কিছু নেই

ঢাকা, বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৮ | ৯ কার্তিক ১৪২৫

নকল ডিম বলে কিছু নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৩৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০১৮

print
নকল ডিম বলে কিছু নেই

চীনারা সবকিছুর ‘নকল’ তৈরি করতে পারে-এমন একটি বিশ্বাস প্রচলিত আছে আমাদের দেশে। সেই বিশ্বাসের কারণে ছড়ানো নানা বিভ্রান্তির মধ্যে অন্যতম একটি হলো ‘নকল ডিম’। দোষটা চীনের ঘাড়ে চাপিয়ে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নকল ডিমের কথা প্রচার করে দেন। স্বাভাবিকভাবেই এমন সংবাদ চাউর হতে সময় লাগেনি। বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। বিশেষ করে নগর জীবনে পড়েছে এ বিভ্রান্তির মারাত্মক প্রভাব। তারপর থেকে থেমে থেমে সেই বিভ্রান্তি এখনো জিইয়ে আছে।

ফেসবুকে হরদম প্রচার হচ্ছে, বাংলাদেশের বাজারে ঢুকছে রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে তৈরি চীনের কৃত্রিম ডিম। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বিপজ্জনক এসব নকল ডিম চোরাপথে বাংলাদেশে আসছে। বলা হচ্ছে, কৃত্রিম রাসায়নিক দিয়ে তৈরি ডিম, যা দেখতে সাধারণ বা খাঁটি ডিমের মতোই। বাজারে ভোক্তারা আসল ও নকল ডিম চিনতে নাকাল হচ্ছেন- এমন সব অপপ্রচারে অনেকের মধ্যেই ডিমাতঙ্ক শুরু হয়েছে। খাবারের তালিকা থেকে কেউ কেউ ছেঁটে ফেলেছেন ডিমের মতো সস্তা প্রোটিনকে।
সঙ্গত কারণেই নকল ডিমের এসব প্রচার ভাবিয়ে তুলেছে সবাইকে। এ নিয়ে হয়েছে একাধিক গবেষণা; এমনকি ব্যক্তিগতভাবেও অনেক গবেষক এ নিয়ে কাজ করেছেন। একটি বিষয়ে তারা সবাই একমত, বাজারে নকল ডিম বলে কিছু নেই। তারা এও বলছেন, ডিমের মতো একই জিনিস মানুষের পক্ষে তৈরি হয়তো অসম্ভব কিছু নয় কিন্তু তা বাজারজাত করা সঙ্গত কারণে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।    

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. হিরেশ রঞ্জন ভৌমিক এ বিষয়ে বলেছেন, ‘প্রতিনিয়ত নকল ডিম নিয়ে আমাদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। নকল ডিম বলে আদৌ কিছু নেই। কারণ একটা নকল ডিম তৈরি করতে যে পরিমাণ খরচ, তার চেয়ে স্বাভাবিক ডিম উৎপাদনে খরচ কম। এটা মূলত ডিমের বিরুদ্ধে এক শ্রেণির মানুষের গুজব। যারা গুজব ছাড়াই তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বাংলাদেশের একমাত্র প্রাণিসম্পদবিষয়ক জাতীয় প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)’ এর পোলট্রি উৎপাদন গবেষণা বিভাগ নকল ডিমের গুজব অনুসন্ধানে উদ্যোগ গ্রহণ করে গত বছর। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিজ্ঞানীরা এর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। গবেষণার জন্য দেশের বিভাগীয় শহর, জেলা-উপজেলা, সীমান্তবর্তী বাজার এবং ঢাকার কয়েকটি পোলট্রি বাজার থেকে তিন হাজারের বেশি ডিম সংগ্রহ করা হয়। সেগুলো ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে নকল ডিমের বিষয়টিকে ‘অস্তিত্বহীন’ ঘোষণা করে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে বিএলআরআই’র এক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের দীর্ঘ অনুসন্ধানে কোথাও নকল ডিমের অস্তিত্ব মেলেনি। অনুসন্ধানে মুরগির কিছু ‘অদ্ভুত’ বা ‘অ্যাবনরমাল’ ডিম পাওয়া গেছে। তবে এটি স্বাভাবিক। কারণ একটি মুরগি তার জীবনকালে শতকরা দুই ভাগ অ্যাবনরমাল ডিম পাড়ে। সেগুলো দেখে নকল ডিম মনে করার কোনো কারণ নেই।

ব্যক্তিগতভাবে এ নিয়ে গবেষণা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের পোলট্রিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সুবাস চন্দ্র দাস। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে নকল ডিমের কোনো অস্তিত্ব নেই। এটি দেশের পোলট্রি শিল্পকে ধ্বংশ করার একটি সুগভীর ষড়যন্ত্র। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অনেকেই বলে ভারত থেকে নকল ডিম বাংলাদেশে আসছে; কিন্তু ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়েছি যে, স্বয়ং ভারতেই কোনো নকল ডিম নেই।’

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আপাতদৃষ্টিতে ডিমের তিনটি অংশ-ডিমের খোসা, ভেতরের সাদা অংশ এবং হলুদ অংশ বা কুসুম। নানা কারণেই ডিমের ভেতরের সাদা অংশ বা কুসুমের দৃশ্যমান পরিবর্তন হতে পারে। যেমন ডিম যদি ১৫ দিন বা তার বেশি সময় রেখে দেওয়া হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সাদা অংশের দৃঢ়তা কমে হালকা পানির মতো তরল হতে পারে। অনেক সময় ডিপ ফ্রিজে ডিম রাখা হলে অথবা ফ্রিজের নরমাল অংশের তাপমাত্রা কোনো কারণে কমে শূন্য ডিগ্রির নিচে গেলে, ডিমের খোসা ফেটে ভেতরের সাদা অংশ আংশিক বাইরে চলে আসতে পারে। যা দেখে অনেক সময় ভোক্তা সেটিকে নকল ডিম বা কৃত্রিম ডিম মনে করতে পারেন। বিষয়টি আসলে মোটেও তা নয়।

গত বছরের ২৮ জুলাই নকল সন্দেহে চট্টগ্রামের পটিয়ার একটি দোকান থেকে প্রায় দুই হাজার ডিম জব্দ করেছিল পুলিশ। পরে আদালতের নির্দেশে পটিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় এসব ডিম আসল না নকল, সে পরীক্ষা করে। জব্দ করা ডিম পরীক্ষা শেষে পটিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আলমগীরের সই করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভোক্তা যে ডিমগুলো বাসায় ভেঙেছিলেন, এগুলো সম্ভবত কেন্ডিলিং ডিম ছিল। কেন্ডিলিং ডিম হলো সেসব ডিম যা বাচ্চা ফুটানোর উদ্দেশে হ্যাচিং মেশিনে দেওয়া হয়। সাত-আট দিন পর পরীক্ষা করে যদি দেখা যায়, ডিমগুলো থেকে বাচ্চা ফোটানো সম্ভব নয় তখন বাছাই করে কিছু ডিম বাজারে বিক্রি করা হয়। কিন্তু ডিমগুলো অনেক দিন হ্যাচিং মেশিনে থাকায় ভেতরের বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন ঘটে এবং অতিরিক্ত গরমে ডিমের ভেতরের পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায়। এর ফলে ডিমের ভেতরে নড়ে এবং ভাঙলে নকল বলে মনে হয়।

দেশে নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাজ করছে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। নকল ডিমের এই বিভ্রান্তি দূর করতে এগিয়ে এসেছে তারাও। সংস্থাটি বলছে, বাজারে নকল ডিমের কোনো অস্তিত্ব নেই। এ নিয়ে বিভ্রান্ত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। এ সংস্থার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহফুজুল হক জানিয়েছেন, আমরা গভীরভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখেছি, বাংলাদেশে কোথাও কোনো জায়গায় নকল বা কৃত্রিম ডিমের কোনো উপস্থিতি নেই। নকল ডিমের তথ্য নিয়ে তিনি বলেন, এগুলো অসত্য প্রতিবেদন, যা দিয়ে বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত করা হয়েছে ভোক্তাকে।

 
.