ধারদেনার জন্য ছুটছে সরকার

ঢাকা, রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১ | ৫ বৈশাখ ১৪২৮

ধারদেনার জন্য ছুটছে সরকার

সাজেদ রোমেল ৯:১৫ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ০৮, ২০২১

print
ধারদেনার জন্য ছুটছে সরকার

কোথাও জাতীয় বাজেট বাস্তবায়ন, কোথাও আবার বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে করোনা মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে ধারদেনার জন্য ছুটছে সরকার। চীন-জাপানের মতো দেশ থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাংক, এডিবির মতো ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভা করেই চলেছে সরকারের অর্থনীতি সম্পর্ক বিভাগ। এর মধ্যে জাপান সর্বোচ্চ ২৯ হাজার কোটি টাকা, এডিবি প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা, বিশ্বব্যাংক প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা, চীন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার ডলার দিতে রাজি হয়েছে বলে সরকার মনে করছে।

কয়েকজন অর্থনীতিবিদ দৈনিক খোলা কাগজকে বলছেন, অর্থনীতির ওপর এসব ঋণের ঝুঁকি পড়লেও সবচেয়ে বড় ঝুঁকি করোনা ও এর প্রভাব মোকাবেলায় এ ছাড়া বিকল্প নেই সরকারের হাতে।

নামমাত্র সুদে ২৯ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা দেবে জাপান
বাংলাদেশকে নামমাত্র সুদে ২৯ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা ঋণ দেবে বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী জাপান। জাপানের ৪২তম অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স (ওডিএ) ঋণ প্যাকেজের আওতায় বাংলাদেশ এ অর্থ পাবে।

জাপান বিশ্বের ৭০টি দেশে ওডিএ ঋণ দিয়ে থাকে। এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ওডিএ ঋণ পেতে যাচ্ছে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটি।

এই ঋণে সুদের হার হবে বার্ষিক শূন্য দশমিক ৬০ শতাংশ। ১০ বছরের রেয়াতসহ (গ্রেস পিরিয়ড) ৪০ বছরে এ ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

এ মাসের শুরুর দিকে ওডিএ ঋণের বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন ও বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূত নাওকি ইতোর সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালি আলোচনা হয়েছে। রেকর্ড পরিমাণে ঋণের প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় নাওকি ইতোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ফাতিমা ইয়াসমিন।

প্রকল্প বাস্তবায়ন ও করোনা সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বিপুল অংকের এই ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। যা বাংলাদেশের জন্য জাপানের সর্বোচ্চ ঋণের প্রতিশ্রুতি। জাপানি ইয়েনের বিবেচনায় এটাই বাংলাদেশকে দেওয়া সবচেয়ে বড় ঋণ-সহায়তা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের সময় পাঁচ বছরে ৬০০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এ দফার ঋণ-সহায়তা তারই অংশ।

৭৯৯০ কোটি টাকা দিচ্ছে এডিবি
করোনাভাইরাসের টিকা কেনা ও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার আওতা বাড়াতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশকে ৯৪ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তায় সায় দিয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার (১ ডলারে ৮৫ টাকা) অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় এই সহায়তার পরিমাণ ৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা।

করোনাভাইরাসের টিকা কিনতে ঋণ হিসেবে এটাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সহায়তা।

সম্প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সঙ্গে ভার্চুয়াল আলোচনায় এডিবি এই ঋণ সহায়তায় সম্মতি দেয়। চলতি মাসে এই ঋণ সহায়তার বিষয়টি ম্যানিলায় এডিবির সদর দপ্তরে অনুষ্ঠেয় বোর্ড সভায় অনুমোদন পেলে সরকারের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তিতে যাবে এডিবি।

এ প্রসঙ্গে ইআরডির এডিবি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব পিয়ার মোহাম্মদ সম্প্রতি বলেছেন, ‘সম্প্রতি আমরা এডিবির ঢাকা কার্যালয়ের সঙ্গে ভার্চুয়াল মিটিং করেছি। বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনার পর তারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে ৯৪০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার আগ্রহ দেখায়।

গত নভেম্বরে করোনাভাইরাসের টিকা কিনতে এডিবির কাছে ৫০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়ে চিঠি দেয় সরকার। কিন্তু এডিবি তার চেয়ে বেশি সহায়তা দিচ্ছে।
পিয়ার মোহাম্মদ বলেন, ‘বৈঠকে এডিবি জানিয়েছে কোভিড-১৯ এর টিকা কেনার জন্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশের জন্য ৯৪০ মিলিয়ন বা ৯৪ কোটি ডলার ধরা হয়েছে। এডিবি বাংলাদেশকে পুরোটাই দিতে চায়। আমরাও এতে রাজি হয়েছি।’

ইআরডির এই কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবিত ঋণের অর্ধেক বা ৪৭ কোটি ডলার ‘নমনীয় ঋণ’ বা ২ শতাংশ হারে সুদ হবে। বাকি অর্ধেকের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে লন্ডন আন্তঃব্যাংক লেনদেন হারের (লাইবর) সঙ্গে দশমিক পাঁচ শতাংশ হারে কমিটমেন্ট চার্জ আরোপ করা হতে পারে।’

বর্তমান লাইবর সুদ হার এক শতাংশেরও কম। বর্তমান হার অনুযায়ী এক দশমিক পাঁচ শতাংশের মতো সুদ হার হতে পারে। এই খাতের ঋণের জন্য কখনও সুদের হার সাড়ে তিন শতাংশের বেশি হয় না। পাঁচ বছরের রেয়াতকালসহ ৩০ বছরে এই ঋণ ফেরত দিতে হবে।

৫৫ লাখ মানুষকে বাঁচাতে ৩৩৭৮ কোটি টাকা চীনা ঋণ
চীনের কাছ থেকে তিন হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার। সারা দেশে ডিজিটাল সংযোগ স্থাপনে ৩ হাজার ৩৭৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ঋণ দেবে বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী চীন। ঋণের ধরন পারফারেনশিয়াল বায়ার ক্রেডিট।

বিশ্বব্যাংকের কাছে ৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছে বাংলাদেশ
বাজেট বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা চেয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গত সোমবার রাতে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভায় তিনি এ সহযোগিতা চান।

কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর জন্য ছাত্রীদের প্রযুক্তিগত ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রকল্পে এবং করোনার প্রভাব মোকাবিলায় বাজেট সাপোর্ট হিসেবে অর্থমন্ত্রী ৫০০ মিলিয়ন ডলার সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন।

সভায় বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বিষয়গুলো ইতিবাচকভাবে দেখা হবে।

এর আগে গত ১৮ মার্চ বিশ্বব্যাংক করোনাভাইরাসের টিকা কিনতে বাংলাদেশের জন্য ৫০ কোটি ডলার অনুমোদন দিয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকার ও বিশ্ব ব্যাংকের মধ্যে এ সংক্রান্ত চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এআইআইবির সঙ্গে কথা চলছে
এছাড়া এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) টিকা কিনতে বাংলাদেশকে ১০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সম্মতি জানিয়েছে। ঋণের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে অর্থনীতি সম্পর্ক বিভাগ থেকে। এছাড়া প্রতিবেশি ভারত এবং ইসলামিক দেশগুলোর কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে সরকার।

রাষ্ট্রায়ত্ত গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুর্শিদ কথা বলেছেন খোলা কাগজের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দেশে করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে যথাযথভাবে সামাল দিতে না পারায় আজ এ ভয়াবহ পর্যায়ে এসেছি আমরা। এখন ঋণ নিয়ে হলেও দ্বিতীয় ঢেউ এবং এর প্রভাবে মানুষের জীবন-জীবিকা সুনিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। ভালোভাবে সামাল দিতে না পারলে আমাদের সবই শেষ হবে। বিশাল বিশাল ঋণের ঝুঁকি তো অর্থনীতির জন্য থাকবেই। তবে এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি করোনা। আর এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের সরকারের হাতে বিকল্প নেই।’