বাড়ছে ধর্ষণ জমছে মামলার পাহাড়

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১ | ৭ বৈশাখ ১৪২৮

বাড়ছে ধর্ষণ জমছে মামলার পাহাড়

প্রীতম সাহা সুদীপ ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ০৯, ২০২১

print
বাড়ছে ধর্ষণ জমছে মামলার পাহাড়

একের পর এক ধর্ষণ নিপীড়নের ঘটনায় বিক্ষোভের মুখে গত বছর অক্টোবরে আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদ-ের বিধান করা হয়। তাতেও কমানো যাচ্ছে না এই অপরাধ, উল্টো আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা। আর এসব ঘটনায় দেশের থানা ও আদালতগুলোতে মামলার পাহাড় জমছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৮ সাল থেকে এর পরের বছরে সারা দেশে ধর্ষণের ঘটনা দ্বিগুণ বেড়েছে। ২০২০ সালে এই সংখ্যা আরও দুই শতাধিক বেড়েছে। এদিকে সম্প্রতি আদালতে দাখিল করা পুলিশের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত সারা দেশের থানাগুলোতে ২৬ হাজার ৬৯৫টি ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। 

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসেই ৮৪ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ধর্ষণে মৃত্যু হয়েছে ২ জনের আর ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন একজন। এ ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে আরও ১৭ জন নারীকে। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এক বছরে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১,৬২৭ জন নারী। এই সময়ে ধর্ষণে মৃত্যু হয়েছে ৫৩ জনের এবং ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১৪ জন। এ ছাড়া এই ১২ মাসে ৩২৬ জন নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এক বছরে ১,৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া এই ১২ মাসে ২২৪ জন নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। ধর্ষণে মৃত্যু হয়েছে ৭৬ জনের এবং ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন ১০ জন। অথচ এর আগের বছর (২০১৮) সারা দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৭৩২টি।

গত এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেশ কয়েকটি ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার পৌর এলাকার ভিংলাবাড়ির একটি মুদি দোকানে ৯ বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ওই ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর মা বাদী হয়ে রোববার (৭ মার্চ) ছোট্ট মিয়া (৬২) নামের একজনকে অভিযুক্ত করে দেবিদ্বার থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ জানিয়েছে, ভুক্তভোগী শিশুটি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। অভিযুক্ত ছোট্ট মিয়া মুদি দোকান পরিচালনা করেন। গত ৪ মার্চ ওই শিশুকে ফুসলিয়ে নিজের দোকানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেন ছোট্ট মিয়া।

এছাড়া গত ৫ ও ৬ মার্চ মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় এক নারী, খুলনার ডুমুরিয়ায় শিশু ও পিরোজপুরের ভা-ারিয়ায় এক গৃহবধূ ধর্ষণের শিকার হন।
৪ মার্চ খুলনার পাইকগাছায় গোপনে গোসলের ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ভাবিকে ধর্ষণ ও চাঁদা দাবির অভিযোগে সমীরণ ম-ল নামের এক যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ। পাইকগাছা থানার ওসি এজাজ শফী বলেন, ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। এরপর আসামি সমীরণকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়। মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী নারীর স্বামী ডুমুরিয়া থানার হেতালবুনিয়া এলাকায় একটি মুরগির ফার্মে কাজ করেন। তার বাড়িতে গোত্রীয় সম্পর্কের ভাই সমীরণ ম-লের যাতায়াত ছিল। এ সুযোগে ভাবির সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন সমীরণ। সুযোগ বুঝে গত বছরের ৪ মে গোপনে ভাবির গোসলের ভিডিও ধারণ করে সমীরণ। পরে তা দেখিয়ে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করে। পরে ভিডিও ডিলিট করার শর্তে আবারও ধর্ষণ করে এবং দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। বিষয়টি জানাজানি হলে ভুক্তভোগীকে বাড়ি থেকে বের করে দেন তার স্বামী।

গত ৩ মার্চ চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় এক গৃহবধূকে দল বেঁধে ধর্ষণের অভিযোগে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মচারী সনজিব কুমার দাস ও তার সহযোগী আনিকাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ডিএমপির সবুজবাগ জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) রাশেদ হাসান জানান, মাদারটেক এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা এক নারীকে ব্যাংকে চাকরি দেওয়ার নাম করে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ মাদারটেকের একটি বাসায় ডেকে নিয়ে যান সনজিব দাস। তার সঙ্গে রাসেল, জামাল, আজিজুর রহমান ও আনিকা নামে এক নারী ওই বাসায় ছিলেন। সেখানেই তাকে দল বেঁধে ধর্ষণ করা হয়।

এ ছাড়া ভোলার রাজাপুরে পানি খাওয়ার কথা বলে ঘরে ঢুকে শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে সালাউদ্দিন মীর নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে। গত ৩ মার্চ বিকালে সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আহত অবস্থায় শিশুটিকে ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
৪ বছরে শুধু থানায়ই প্রায় ২৭ হাজার মামলা

সারা দেশে থানাগুলোতে ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ২৬ হাজার ৬৯৫টি ধর্ষণের মামলা রেকর্ড করেছে পুলিশ। হাইকোর্টের আদেশে সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। এর বাইরে সারা দেশের সংশ্লিষ্ট আদালত বা ট্রাইব্যুনালেও মামলা করেছেন ভুক্তভোগীরা। তবে গত পাঁচ বছর কতগুলো মামলা আদালতে হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের দেওয়া প্রতিবেদনে সে তথ্য আসেনি।

পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে থানাগুলোতে ২৬ হাজার ৬৯৫টি ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ৪ হাজার ৩৩১টি, ২০১৭ সালে ৪ হাজার ৬৮৩টি, ২০১৮ সালে ৪ হাজার ৬৯৫টি, ২০১৯ সালে ৬ হাজার ৭৬৬টি ও ২০২০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৬ হাজার ২২০টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে কতটি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে বা কতজনের সাজা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য এ প্রতিবেদনে আসেনি।

মামলার দীর্ঘসূত্রতার অবসান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন

এসব বিষয়ে মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী বলেন, ‘ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিভিন্ন আইন ও নির্দেশনার সমন্বয়ে একটি সমন্বিত দিকনির্দেশনা প্রণয়ন এবং প্রয়োগ দরকার। আমরা চাই মামলার দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটিয়ে বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর মামলাগুলো দ্রুত বিচার আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করা হোক।’

মানবাধিকার কর্মী ও নারী নেত্রী খুশি কবীর বলেন, ‘দেশে ধর্ষণ ও নারীদের প্রতি সহিংসতা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে এসব ঘটনার সঙ্গে সরকারদলীয় বিভিন্ন লোকজন সম্পৃক্ত, যে কারণে অনেক ক্ষেত্রেই বিচার হয় না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ এসব প্রভাবশালীকে গ্রেফতারও করে না বা গ্রেফতার হলেও তারা জামিনে মুক্ত হয়ে যায়। সে হিসেবে ধর্ষণ বা নারীদের প্রতি সহিংসতার এসব ঘটনায় আমরা সমাজে খুব ভালো বার্তা দিতে পারছি না। এই কারণে এই ধরনের অপরাধও থামানো যাচ্ছে না। আমার মনে হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে এই অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে এসব অপরাধ কমে আসবে।’