‘টিকায় স্বচ্ছতা আনতে হবে’

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১২ ফাল্গুন ১৪২৭

‘টিকায় স্বচ্ছতা আনতে হবে’

মাহমুদুল হাসান ১১:১৫ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৬, ২০২১

print
‘টিকায় স্বচ্ছতা আনতে হবে’

সরকারের হ-য-ব-র-ল অবস্থার কারণে করোনার টিকা নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। আস্থা বজায় রাখার জন্য সরকারকে স্বচ্ছতার প্রমাণ দিতে হবে বলে মনে করেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম। গত রোববার রাতে শান্তিনগরে নিজ চেম্বারে দৈনিক খোলা কাগজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। ভ্যাকসিন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে বিএনপির পক্ষ থেকে একটি মিনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। 

ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, দেখুন করোনাভাইরাস দুর্ভোগটা বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যাপারে সরকার শুরু থেকেই উদাসীন। বিএনপি শুরু থেকেই করোনার সচেতনতায় লিফলেট বিতরণ করে। সরকার দল অনেক পরে লিফলেট ও জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে। শুধু তাই নয়, ২০০০ কীট নিয়ে আইডিসিআর ঘোষণা দেয় সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সমন্বয়হীনতা শুরু ওখান থেকেই। সরকার জেকেজি, রিজেন্ট হাসপাতালকে কারোনা পরীক্ষা করার অনুমোদন দেয়। তারা ভুয়া টেস্ট রিপোর্ট দেয়। এতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। এ ছাড়া সুরক্ষা সামগ্রীর মধ্যে পিপিই, মাক্স, হ্যান্ড স্যানিটাইজার যারা দেওয়া হয় তাও ছিল নকল। ফ্রন্টলাইনার যারা আছেন তারা তাতে আস্থাহীনতা ভোগেন। যথাযথ সুরক্ষা না থাকায় শতাধিক ডাক্তার মারা যায়।

কারোনা পরীক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেখানে বিনামূল্যে যে টেস্ট করার কথা, সেখানে সরকার টাকা নির্ধারণ করে দেয়। যে কারণে টেস্টের সংখ্যা কমে আসে। যা পরবর্তীতে প্রাইভেটাইজেশনের ফলে মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। এ ছাড়া নির্দিষ্ট ছকে লকডাউন করা হয়নি। ঈদের ছুটি, গার্মেন্টস ছুটিসহ সরকার একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থায় নিয়ে যায়। পাশাপাশি প্রবাসীরা দেশে ফেরাত পর তাদের জন্য কোয়ারান্টিনে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। ফলে এই রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অথচ দেখুন, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম ও ভুটান শুরু থেকেই কারানোভাইরাস সংক্রমণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়। ফলে সে সব দেশে করোনার ব্যাপ্তিটা কম ছিল।

ভ্যাকসিন প্রসঙ্গে ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রথম ট্রেনে উঠতেই মিস করেছি। রাশিয়া, চীনের সঙ্গে চুক্তিতে গেলে আমরা নামমাত্র অথবা বিনামূল্যে ভ্যাকসিন পেতে সুবিধা হতো। সরকার লুকোচুরি খেলে যাচ্ছে। প্রথমে বলা হল জি টু জি চুক্তি হবে। পরবর্তীতে দেখা গেল বেসরকারি এক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়। এতে আমাদের দেশে চড়ামূল্যে ভ্যাকসিন কিনতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ভ্যাক্সিনেশন কর্মসূচি বাংলাদেশে ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পিপিই শিডিউলের মাধ্যমে আটটি উপজেলায় চালু করেছিলেন। ভ্যাকসিন কর্মসূচিতে মানুষকে আস্থা এনে চালু করতে হবে। ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, পোলিও, বিসিজি ভ্যাকসিনগুলো মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। সে কারণে শিশুদের এ টিকাগুলো দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া হেপাটাইটিস-বি টিকা দিচ্ছে মানুষ।

মানুষের আস্থা ফেরাতে কী করণীয় এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, মানুষের মধ্যে আস্থা অর্জন করতে হলে সমাজের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আগে দিয়ে শুরু করতে হবে। বহির্বিশ্বে তাই করা হচ্ছে। আরেমিকান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ও ইংল্যান্ডের রানী তারা কিন্তু আগে টিকা নিয়েছেন। মানুষের ভয়টা কাটাতেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আগে ভ্যাকসিন নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, টিকা নিয়ে প্রথম থেকেই মানুষকে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া উচিত ছিল। এটা সেরামের ভ্যাকসিন। তাহলে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি হতো। এখন অবশ্য সরকার বলতে শুরু করেছে, এটা সেরামের ভ্যাকসিন। এটা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা ফলো করতে হবে। যারা ফ্রন্টলাইনার আছেন তাদের আগে দিয়ে ভ্যাকসিন চালু করতে হবে। ভ্যাকসিনের পরিবহন এবং রিজার্ভেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা যদি সঠিক পদ্ধতিতে না হলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। আমাদের দেশে এখান দেখার বিষয় হচ্ছে, কীভাবে ভ্যাকসিন পরিবহন করা হচ্ছে বা রিজার্ভেশন করা হচ্ছে। যদি ঠিকঠাক মতোই হয় তাহলে কোনো অসুবিধা নেই।

মানুষের নানা প্রশ্ন সম্পর্কে তিনি বলেন, বেক্সিমকোর সঙ্গে সেরাম কোম্পানির চুক্তি এখানে সরকার একটা পার্ট মাত্র। সারা পৃথিবীতে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে ফ্রি। এবং সরকারের মাধ্যমে। ওই সব দেশে কোনো বাণিজ্যিকভাবে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে দেওয়া প্রক্রিয়া চলছে। ফলে ক্রয়মূল্য বেড়ে গেছে। বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

জনসচেতনতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টিকা নিয়ে মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা আনতে হবে। পজিটিভ দিক তুলে ধরতে হবে। যদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তাহলে সরকার নিজ দায়িত্বে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেবে এর নিশ্চয়তা দিতে হবে। এখানে কোনো দলীয়করণ ও আত্মীয়করণ চলবে না। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভ্যাক্সিনেশন কর্মসূচি করতে হবে। পৃথিবীর সঙ্গে তাল মেলাতে হলে ভ্যাকসিন কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হবে। কিন্তু শঙ্কার কথা হচ্ছে, এখনো কোনো ডাটাবেজ তৈরি করা হয়নি। এতে চরম সমন্বয়হীনতা রয়েছে। কীভাবে ডাটাবেজ হবে তারও কোনো গাইডলাইন নেই। মাঠ পর্যায়ে এর কোনো কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। কথিত আছে, উচ্চমূল্যে বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে। দেখার বিষয় শেষটা কীভাবে হয়?