ভয়াবহ পর্যায়ে শব্দদূষণ

ঢাকা, শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭

ভয়াবহ পর্যায়ে শব্দদূষণ

শাহাদাত স্বপন ১০:০৮ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৪, ২০২১

print
ভয়াবহ পর্যায়ে শব্দদূষণ

শব্দদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।বিশ্বে শব্দদূষণের তালিকায় শীর্ষ দেশগুলোর কাতারে চলে আসছে বাংলাদেশ। এই মুহূর্তে শব্দদূষণের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হবে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দূষণ রোধে যেসব কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন, তার মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি অন্যতম।

এ-সংক্রান্ত বেশ কিছু আইন ও বিধিমালা থাকলেও প্রয়োগে তৈরি হয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। এমনকি এসব আইন, বিধিমালা ও নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা এবং আমদানি নীতি আদেশ ২০১৫, ২০১৮ প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দেখা দিয়েছে দৈন্যতা। শব্দদূষণের অন্যতম উৎস হর্ন বাজানো। আর এই হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি রোধে আমদানি নীতি আদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রণয়ন করা হলেও নেই তার প্রয়োগ। যেসব সীমান্ত এলাকা দিয়ে এসব হর্ন আমদানি করা হচ্ছে। তার মানমাত্রা নির্ধারণের জন্য এসব সীমান্ত এলাকার কাস্টমসের কাছে নেই নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র। তিন বছর ধরে এই আমদানি নীতিমালা করা হলেও সীমান্ত এলাকায় কাস্টমসের কাছে আমদানিকৃত হর্নের মানমাত্রা ৭৫ ডেসিবেলের ঊর্ধ্বে কি-না তা যাচাইয়ের জন্য মানমাত্রা মাপের মাপার যন্ত্র নেই কেন- তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। এমনকি আইন থাকার পরও খোদ রাজধানীতে ব্যবহৃত হচ্ছে এরকম হাইড্রোলিক হর্ন। হাইড্রোলিক হর্ন যাতে ব্যবহৃত না হয় সে জন্য আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থাও তেমন তৎপর নয়।

শব্দদূষণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বলা হয়, মানুষ সাধারণত ১৫ থেকে ২০ কিলোওয়াট সীমার মধ্যে শব্দ শুনতে পায়। ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশনের তথ্য মতে, ৬০ ডেসিবলের ঊর্ধ্বে শব্দ মানুষকে সাময়িক বধির করে এবং ১০০ ডিসিবলের ঊর্ধ্বে শব্দ মানুষকে পুরোপুরি বধির বানিয়ে দেয়। শব্দের প্রত্যাশিত মাত্রা বেডরুমে ২৫ ডেসিবল, ডাইনিং-ড্রইং রুমে ৪০ ডেসিবল, অফিস রুমে ৩৫ থেকে ৪০ ডেসিবল, শ্রেণিকক্ষে ৩০ থেকে ৪০ ডেসিবল, লাইব্রেরিতে ৩৫ থেকে ৪০ ডেসিবল, হাসপাতালে ২৫ থেকে ৩৫ এবং রেস্টুরেন্টে ৪০ থেকে ৬০ ডেসিবল হওয়া উচিত। অথচ বর্তমানে ঢাকার যে কোনো ব্যস্ত সড়কে শব্দদূষণের মাত্রা ৮০ থেকে ৯০ ডেসিবল। যানবাহনের শব্দ ৯৫, মোটরসাইকেল ৮৭ থেকে ৯২, ট্রাক ও বাসের শব্দ ৯২ থেকে ৯৪ ডেসিবল পর্যন্ত হচ্ছে। এ ছাড়াও বর্তমানে লাউড স্পিকারে গান বাজালে ৯০ থেকে ১০০ ডিসিমল, মিল-কারখানায় স্বাভাবিক অবস্থায় শব্দ উৎপাদিত হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ ডেসিবল, রেস্টুরেন্ট-সিনেমা হলে ৭৫ থেকে ৯০, টি-স্টল এবং বিভিন্ন উৎসবে ৮৫ থেকে ৯০ ডেসিবল শব্দ নিয়মিত উৎপাদিত হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন বলছে, বিশ্ব জনসংখ্যার মোট ৫ শতাংশ শব্দদূষণের দ্বারা মানুষ বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদফতরের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, শব্দদূষণের অন্যতম উৎস যানবাহনের অতিমাত্রায় সাধারণ হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার, মাইকের ব্যবহার, নির্মাণকাজ, যে কোনো স্থাপনা ধ্বংস, বিভিন্ন প্রচারণার কাজে ব্যবহৃত মাইক, লাউড স্পিকারের ব্যবহার, বিস্ফোরণ, শিল্প কারখানায় উৎপাদিত শব্দ, উচ্চস্বরে কথা বলা, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বা উৎসবে লাউড স্পিকার ব্যবহার, আবাসিক কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতির উপকরণ, বিমানের শব্দ ও বিভিন্ন জলযানের শব্দ অন্যতম। পরিবেশ অধিদফতর বলছে, এমন শব্দদূষণের ফলে মানুষের মারাত্মক মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি যেমন : হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, মাথাধরা, বধির হওয়া, আতঙ্কগ্রস্ত, অনিদ্রা ইত্যাদি বেড়ে যায়। যানবাহনের হর্নের মাধ্যমে শব্দদূষণের কারণে দাফতরিক কাজ, শিক্ষা কার্যক্রম, পথচারী ট্রাফিক পুলিশ, রিকশাচালক, হকাররা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বড় শহরগুলোতে নির্মাণ কার্য ও শিল্প-কারখানার শব্দে হাসপাতাল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোগী এবং শিক্ষার্থীরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে। শব্দদূষণের কারণে শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে অবস্থান করছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত লাউড স্পিকারের ফলে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দাফতরিক কাজ সঠিকভাবে পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না।

শব্দদূষণ রোধে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ত্রুটিপূর্ণ বা মেয়াদোত্তীর্ণ যানচলাচল বন্ধ এবং অনুমোদনহীন মোটর ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। পরিবহন শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। হর্ন বাজানো ড্রাইভারদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন প্রয়োজন। বিআরটিএর ট্রেনিংয়ে ‘নো হর্ন’ বিষয়ে প্রশিক্ষণ কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং গাড়ি চালানোর সময় ড্রাইভারদের হর্ন না বাজানো ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শব্দদূষণকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে শব্দদূষণ রোধে ‘শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০০৬’ এর বিধানসমূহ কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং প্রয়োজনে এর সংশোধনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এক্ষেত্রে বাস্তবায়নকারী সংস্থা যেমন : পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদফতর, বিআরটিএ, পুলিশ বিভাগ, বাংলাদেশ স্কাউটস, রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

এ ছাড়াও অবকাঠামোগত উন্নয়নকালে অতিমাত্রায় শব্দ উৎপাদনে ও বায়ুদূষণ রোধে কঠোরতা আরোপ করতে হবে। আবাসিক এলাকার মধ্যে নতুন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গাড়ি মেরামতের কারখানা চালু করা যাবে না। আবাসিক এলাকায় শব্দ দূষণমুক্ত করতে বিয়ে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, জন্মদিন, দিবস উদযাপন সমূহে উচ্চশব্দে মাইক ব্যবহার ও সঙ্গীত পরিবেশনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ বিভাগ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষ এবং গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ শাহাব উদ্দিন বলেন, প্রতি বছর বিআরটিএ প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ নতুন গাড়ি রেজিস্ট্রেশন প্রদান করছে। এসব যানবাহনে যত্রতত্র সাউন্ড বক্স মাইকের মাধ্যমে উচ্চ শব্দ সৃষ্টি করে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। আমাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে অন্যান্য দূষণের পাশাপাশি শব্দদূষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার এখনই সময় ক্ষতিকর দিকগুলো বিবেচনা করে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন, বিধি বাস্তবায়ন ও দ্বিরুক্ত শব্দ করা থেকে বিরত থাকার সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে হবে। আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গভীর রাতে যখন আমার হাইড্রোলিক হর্নের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তখন আমার মনে হয় মন্ত্রী আমি নিজেই, অথচ আমারই ঘুম হচ্ছে না। তাহলে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা?

এ বিষয়ে নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, বর্তমানে শব্দদূষণ মারাত্মক অবস্থা ধারণ করেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। আমরা নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে শব্দ দূষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নাক-কানের রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছি। প্রতিনিয়ত শব্দ দূষণের ফলে এমন রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদেরও যানবাহন চলাচল, নির্মাণকাজ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে জনসচেতনতার মাধ্যমে অনেকটা শব্দদূষণ নিরসন সম্ভব। এ ছাড়াও সরকারি-বেসরকারিসহ সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। শব্দদূষণ বিষয়ক গবেষক ড. কামরুজ্জামান বলেন, বর্তমানের ৯০ শতাংশ সময় ৭৫ ডেসিবলে বেশি শব্দ দূষণ হচ্ছে। এ অবস্থা চলার কারণে মানুষ নিয়মিতভাবে শ্রবণশক্তি হারাচ্ছে। মানুষ বাধ্য হয়ে শব্দের কারণে ঢাকার বাইরে অবস্থান করতে চাচ্ছে। আপনারা জানেন, ইতোমধ্যে ‘পলিউশন রিফিউজি’ নামে একটি কথা প্রচলিত হয়ে উঠেছে। যারা শব্দদূষণ এলাকা থেকে চলে গিয়ে কম শব্দদূষণ এলাকায় অবস্থান করছে তাদের বলা হচ্ছে ‘পলিউশন রিফিউজি’। এভাবে চলতে থাকলে শব্দদূষণ ভবিষ্যতে ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।