কাশিমপুর কারাগারে বন্দির নারীসঙ্গে তোলপাড়

ঢাকা, রবিবার, ৭ মার্চ ২০২১ | ২২ ফাল্গুন ১৪২৭

কাশিমপুর কারাগারে বন্দির নারীসঙ্গে তোলপাড়

প্রীতম সাহা সুদীপ ৯:৪৪ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৪, ২০২১

print
কাশিমপুর কারাগারে বন্দির নারীসঙ্গে তোলপাড়

বাইরে থেকে নারী নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে এক বন্দির একান্ত সময় কাটানোর ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি ঘটিয়েছেন আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারির মূলহোতা তানভীর মাহমুদের অন্যতম সহযোগী কারাবন্দি তুষার আহমেদ। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তিনি একজন নারীকে কারাগারের ভিতরে নিয়ে একান্ত সময় কাটিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে প্রচার হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

গত ৬ জানুয়ারি দুপুরে ওই ঘটনা ঘটে। কারা কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় তাদের যাওয়া-আসার দৃশ্য প্রধান ফটকের ভিতরের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। ওই ঘটনার জন্য গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার-১ থেকে তিন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তারা হলেন- ডেপুটি জেলার গোলাম সাকলাইন, সার্জেন্ট ইনস্ট্রাক্টর মো. আব্দুল বারী ও সহকারী প্রধান কারারক্ষী মো. খলিলুর রহমান। কারা মহাপরিদর্শকের পক্ষে অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক মো. আবরার হোসেনের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে গত ১৮ জানুয়ারি তাদের প্রত্যাহার করা হয়। তবে গত শুক্রবার সাংবাদিকরা এ তথ্য জানতে পারেন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রশাসনিক কারণে তাদের প্রত্যাহার করে কারা অধিদফতরে সংযুক্ত করা হয়েছে। কারা সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় জেল সুপার রত্না রায়

ও জেলার নূর মোহাম্মদ মৃধার বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে। গঠন করা হয়েছে দুটি তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে কারা অধিদফতরের গঠন করা কমিটিতে অধিদফতরের অতিরিক্ত আইজি প্রিজন্স কর্নেল আবরার হোসেনকে প্রধান করা হয়েছে। বাকি দুজ্স্বন- রাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব ও কারা বিভাগের একজন ডিআইজি প্রিজন্স। অন্য কমিটি গঠন করেছে গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের দফতর। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন গাজীপুরের অতিরিক্ত ডিসি (এডিএম) আবুল কালাম।


জঘন্যতম অপরাধ, বিধি অনুযায়ী শাস্তি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, কারাগারের অভ্যন্তরে একজন বন্দির নারীসঙ্গের ঘটনা একটি জঘন্যতম অপরাধ। এ ঘটনার পিছনে যাদেরই সম্পৃক্ততা রয়েছে, তাদের সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, কারাগারের ভিতরে এ ধরনের ঘটনা একটি জঘন্যতম অপরাধ। এ ঘটনাকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। এ ঘটনায় মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। যারাই এর পিছনে জড়িত, বিধি অনুযায়ী তারা কঠোর শাস্তি পাবে। সব কারাগারের জন্য এটি একটি সতর্ক বার্তা। করোনার কারণে দেশের সব কারাগারে বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ বন্ধ রয়েছে গত বছরের মার্চ মাস থেকে। শুধু মোবাইল ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এমন অবস্থায় একজন কারাবন্দিকে কারা ফটকের ভিতরে ফিল্মি কায়দায় চলাফেরা ও নারী নিয়ে একান্ত সময় কাটানোর ঘটনা বিব্রত করে তুলেছে কারা অধিদফতরকে।

যেভাবে কারাগারে নারীর সঙ্গে একান্ত সময় কাটান তুষার
কারাগারের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, গত ৬ জানুয়ারি কারাগারের প্রবেশ পথে কর্মকর্তাদের কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায় কালো রঙের জামা পরে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘোরাফেরা করছেন ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত হলমার্কের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) তুষার আহমেদ। দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে দুই যুবকের সঙ্গে বাইরে থেকে কারাগারে প্রবেশ করেন বেগুনি রঙের সালোয়ার কামিজ পরা এক নারী। ওই নারীকে অভ্যর্থনা জানান ডেপুটি জেলার সাকলাইন। পরে তাকে একটি কক্ষে নিয়ে যান। ১০ মিনিট পর সেখান থেকে সাকলাইন বের হয়ে যান। কিছুক্ষণ পর বন্দি তুষার ওই কক্ষে প্রবেশ করেন। ১০ মিনিট পর জেল থেকে বেরিয়ে যান জেল সুপার রতœা রায়। পরে তুষার ও ওই নারী রত্না রায়ের কক্ষের দিকে যান। যাওয়ার সময় তুষার জড়িয়ে ধরেন নারীকে। কিছুক্ষণ পর আবারও তারা আগের কক্ষে ফিরে যান। ওই কক্ষের ভিতরে তারা ৪৫ মিনিট সময় কাটান।

যা বলছেন অভিযুক্তরা
কারা সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত কমিটি ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে জেল সুপার, জেলার, ডেপুটি জেলার, অভিযুক্ত বন্দি তুষারসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গেই কথা বলেছে। ঘটনার জন্য জেলার ও ডেপুটি জেলার দোষ দিচ্ছেন জেল সুপার রত্না রায়কে। যদিও রতœা রায় কিছু জানেন না বলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে দাবি করেছেন। এদিকে ডেপুটি জেলার সাকলাইন ঊর্ধ্বতন কারা কর্মকর্তাদের জানান, জেল সুপারের নির্দেশেই তিনি ওই নারীকে কারাগারের ভিতরে অভ্যর্থনা দিয়ে নিয়ে আসেন এবং তুষারের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ করে দেন। এদিকে বন্দি তুষার দাবি করেছেন, ওই নারী তার স্ত্রী।

সূত্র আরও জানায়, ঘটনার পর জেল সুপার, জেলার ও ডেপুটি জেলার যে যার পিঠ বাঁচানোর চেষ্টা করলেও ঘটনার সঙ্গে তারা সবাই জড়িত এবং এ জন্য তারা টাকার ভাগও পেয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার পরপরই একটি গোয়েন্দা সংস্থা খবর পেয়ে যায়। এ নিয়ে তারা কাজে নেমে পড়ে। এ অবস্থায় ১২ জানুয়ারি জেল সুপার রত্না রায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান। এরপরই গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। কমিটির তদন্ত চলার সময় বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেল ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ পায় এবং প্রকাশ করে।

গাজীপুরের অতিরিক্ত ডিসি (এডিএম) আবুল কালাম দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ওই ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। যেহেতু এটি তদন্তাধীন বিষয় তাই এখন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তদন্ত শেষে সব কিছুই জানানো হবে।

এদিকে দেশের সব কারাগারে দর্শনার্থী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকা অবস্থায় কীভাবে কাশিমপুর কারাগার-১-এ এমন ঘটনা ঘটল তা জানতে জেল সুপার রত্না রায়কে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি জেলার নূর মোহাম্মদের সঙ্গেও।