‘যেই লাউ সেই কদু’

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ মার্চ ২০২১ | ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭

‘যেই লাউ সেই কদু’

আরিফ সাওন ৯:৩৬ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৭, ২০২১

print
‘যেই লাউ সেই কদু’

১৪ জানুয়ারি। বেলা সাড়ে ১২টার পর শনিরআখড়া থেকে লাব্বাইক বাসে উঠে গোলাপবাগ আসার পর দেখা যায় আরেকটি লাব্বাইক বাস সামনের বাসটিকে অতিক্রমের চেষ্টা করছে। কিন্তু সামনের বাসটি কোনোভাবেই পেছনেরটিকে সামনে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না। যখন অতিক্রম করতে যাচ্ছে তখনই সামনের বাসচালক কোনো না কোনোভাবে পেছনের বাসটিকে আটকে দিচ্ছে। পেছনের বাসটির সামনে যাওয়া ঠেকাতে কখনো সড়কে এক প্রকার গাড়ি আড়াআড়ি করে রাখছে, কখনো চাপ দিয়ে অন্য গাড়ির পেছনে ফেলে দিচ্ছে। এভাবে মগবাজার পর্যন্ত চলে এই রেষারেষি। শুধু এই গাড়ি নয়। সামনের স্টপিজে আগে গিয়ে যাত্রী তোলার জন্য এই রেষারেষির দৃশ্য রাজধানীতে এখন কমবেশি সবারই চোখে পড়ে। বেশির ভাগ গাড়ির চালকই এমন রেষারেষি করেন। উপরে উঠতে এবং ওঠা ঠেকাতে কখনো কখনো এক বাসের পেছনে আরেক বাসের ধাক্কা লাগে, কখনো বাসের বডিতে ঘষা লাগে, কখনো গ্লাস ভেঙে যাত্রীর গায়ে পড়ে কেটে রক্তাক্ত হয়।

কখনো যাত্রীরা গাড়ির মধ্যেই আঘাত পান। কারও কপাল ফোলে, কেউ হাতে, পায়ে কিংবা শরীরের অন্য কোনো অংশে গুরুত্বর আঘাত পান। দাঁড়ানো যাত্রীদের কেউ কেউ গাড়ির মধ্যে ছিটকে পড়েন। এমনকি স্টপিজে গিয়ে এক গাড়ি আরেক গাড়ির গেট আটকে দাঁড়িয়ে রাখে। যাতে যাত্রী ওই গাড়িতে উঠতে না পারেন। যাত্রী ওঠা এবং নামতে গিয়ে সবসময়ই জীবনের ঝুঁকিতে থাকেন। প্রতিনিয়তই ঝুঁকি বাড়ছে বাসযাত্রী, পথচারী কিংবা বাইক আরোহীদেরও। থামছে না সড়কে রেষারেষি। এতে যানজটও লেগে যায়।

এদিকে রেষারেষি বন্ধ করতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন অনেকে। তারা বলেছেন, যাত্রী হিসেবে গাড়িতে উঠতে হবে। যখনই কোনো গাড়ির চালক এভাবে রেষারেষি করবেন, সঙ্গে সঙ্গে তাকে এমন সাজা দেওয়া যাতে তিনি ভবিষ্যতে আর এমন না করেন। কারণ ১০ টাকার একজন যাত্রী তুলতে গিয়ে তিনি একটা জীবন ঝুঁকিতে ফেলবেন- তা হতে পারে না। ১০ টাকার যাত্রীর চেয়ে জীবনের মূল্য কি কম? ওই একজনের ওপর হয়তো অনেক মানুষই নির্ভর থাকেন। তাই এ ব্যাপারে কঠোর হওয়া উচিত। বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে বাসে চড়ে রেষারেষির সময় যাত্রীদের খুব নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কোনো কোনো যাত্রী বাসচালককে ভদ্র ভাষায় বকাঝকা করেছেন, কারও সঙ্গে অশালীন বাক্যবিনিময় হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, যখন কোনো দুর্ঘটনা হবে তখন আবার ছাত্ররা আন্দোলনে নামবে। অচলাবস্থা হবে। সরকার প্রতিশ্রুতি দেবে। কয়েক দিনের জন্য ঠিক হবে। পরে ‘যেই লাউ সেই কদু’। আসলে এসব দেখার কেউ নেই। মনিটরিং না থাকলে যা হয়। আবার কেউ কেউ বলেছেন, সাজাও হচ্ছে- তবুও তো এরা (বাস শ্রমিক) বদলাচ্ছে না। সামান্য কয়েকটা টাকা-একজন যাত্রীই এদের কাছে বেশি; এরা আসলে জীবনের মূল্য বোঝে না। কিন্তু কেন বোঝে না সে বিষয়টি শনাক্ত করে সেখানে তাদের জানানো উচিত। তা ছাড়া এসব বিষয়ে চালকদের কাউন্সিলিং করতে হবে, সচেতন করতে হবে।

২০২০ সালের ১৮ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ীতে দুই বাসের রেষারেষিতে প্রাণ যায় ওমর ফারুক তুহিন (২৮) নামের এক মোটরসাইকেল চালকের। রেষারেষির কারণে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে ডান হাত হারান রাজধানীর তিতুমীর কলেজের স্নাতক শিক্ষার্থী রাজীব। তিনি বিআরটিসি বাসের গেটে দাঁড়ানো ছিলেন। আরেকটি বাস বাম পাশ থেকে ওভারটেক করে বিআরটিসি বাসের ঘা ঘেঁসে উঠতে গেলে দুই বাসের ঘষায় রাজীবের হাত কেটে বাসের সঙ্গে ঝুলে থাকে। বিষয়টি নিয়ে তখন বেশ তোলপাড় হয়। আন্দোলনে সড়কে নেমে আসে শিক্ষার্থীরা। তৈরি হয় অচলাবস্থা। পরে বিভিন্ন আশ^াসে সড়ক ছাড়ে শিক্ষার্থীরা। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। দুই একটা ঘটনা নিয়ে বেশ হইচই হচ্ছে। অনেক ঘটনাই সামনে আসছে না। রাজীবের ঘটনার পর কিছুদিন সড়কে শৃঙ্খলা থাকলেও এখন প্রতিটা মুহূর্তই সড়কে চলছে এ অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম গতকাল শনিবার দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, চালকদের বাড়াবাড়ির বিষয়ে সড়ক-মহাসড়কে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর বিষয়ে রাস্তায় ভ্রম্যমাণ টিম নিয়মিত কাজ করছে। এ ধরনের ঘটনা ক্ষতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী খোলা কাগজকে বলেন, পরিবহন সেক্টরের কোনো অভিভাবক আছে বলে আমাদের মনে হয় না- থাকলে যাত্রী হয়রানির এই বিশৃঙ্খলা থাকত না। যখন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে হতাশা প্রকাশ করা হয়, তখন আমরা কার কাছে দাবি করব? এ কাজটা মূলত সরকার করবে। সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হোক। বিভিন্ন দেশে গণপরিবহন সেক্টরে ভর্তুকি দেয়। চালক হেলপারের বেতন নির্ধারণ থাকে। তিনজন যাত্রী হলেও চলে যায়। আর আমাদের দেশে, একজন যাত্রী ধরার জন্য এক বাস আরেক বাসকে ধাক্কা দেয়, যাত্রী গায়ের উওপর দিয়ে চলে যায়।

তিনি বলেন, সরকার তো বিআরটিসিও ঠিকভাবে চালাতে পারে না। যেটা জনগণের টাকা দিয়ে কিনেছে, তাও লিজ দিয়ে রেখেছে। এগুলো সঠিকভাবে পরিচালনার সক্ষমতা যদি অর্জন করত, তা হলেও একটা কথা ছিল। অনেক বাস কোম্পানি একটা বাস থেকে ৭ থেকে ৮০০ বাস করেছে। আর বিআরটিসিতে ১২০০ বাস কিনে দিলেও পরে দেখা যায় তা অকেজো। এসব মূলত পরিচালনার অযোগ্যতার জন্য হয়। ফলে আমরা আশা করব কীভাবে? বিভিন্ন কিছু আমরা সেনাবাহিনীর হাতে ছেড়ে দিয়েছে। ত্রাণ কার্যাক্রমও আমার সেনাবাহিনী নিয়ে করিয়েছি। এখন কয়েক বছর গণপরিবহন সেক্টরও সেনাবাহিনীর হাতে দিয়ে দেখা যেতে পারে, আমরা এ বিশৃঙ্খলা থেকে রেবিয়ে আসতে পারি কিনা।