স্নাতক হয়েও পদোন্নতি পেতে কুড়ি বছর পার

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২১ | ১৪ মাঘ ১৪২৭

স্নাতক হয়েও পদোন্নতি পেতে কুড়ি বছর পার

তোফাজ্জল হোসেন ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ০২, ২০২০

print
স্নাতক হয়েও পদোন্নতি পেতে কুড়ি বছর পার

বাংলাদেশ সচিবালয় (ক্যাডার বহির্ভূত গেজেটেড এবং নন-গেজেটেড কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৪ সংশোধন নিয়ে বাংলাদেশ সচিবালয়ে সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটরদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। উচ্চমাধ্যমিক পাস কর্মচারীরা পদোন্নতি পেলেও স্নাতক ডিগ্রিধারী কর্মচারীদের পদোন্নতিতে দীর্ঘ সময় ব্যয় হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ মাধ্যমিক পাস কর্মচারীর নিচের পদে কাজ করতে হয় স্নাতক ডিগ্রিধারী কর্মচারীদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সচিবালয়ে (ক্যাডার বহির্ভূত গেজেটেড কর্মকর্তা এবং নন-গেজেটেড কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা-২০১৪ এর সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধিত নিয়োগ বিধিমালার তফসিল-১ এর ক্রমিক-৭ ও ৮ অনুযায়ী সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর (গ্রেড-১৩, নিয়োগ যোগ্যতা স্নাতক) ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক (গ্রেড-১৬, নিয়োগ যোগ্যতা এইচএসসি) পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার পার্সোনেল নিয়োগ বিধিমালা-২০১৯ অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত কম্পিউটার অপারেটর (গ্রেড-১৩, নিয়োগ যোগ্যতা স্নাতক) ও ডাটা এন্ট্রি/কন্ট্রোল অপারেটর (গ্রেড-১৬, নিয়োগ যোগতা এইচএসসি) পদধারীদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পদে সমান পাঁচ বছরে পদোন্নতির বিধানই শুধু রাখা হয়েছে তা নয়, গ্রেড-১৩ পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের তুলনায় গ্রেড-১৬ পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য বেশি সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। এতে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, সচিবালয়ের বিভাগসমূহে সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর (১০০০টি পদ) ও কম্পিউটার অপারেটর পদধারীদের (২৫০টি পদ) সংশোধিত নিয়োগ বিধিমালা তফসিল-১ এর ক্রমিক-৪ এ বর্ণিত প্রশাসনিক কর্মকর্তা ১৩শর মধ্যে ১৯৫টি পদে পদোন্নতির সুযোগ রাখা হয়েছে। তফসিল ১ এর ক্রমিক-৪ এ বর্ণিত ব্যক্তিগত কর্মকর্তার ৮০০র মধ্য ৬৪০টি সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর, কম্পিউটার অপারেটর ও ডাটা এন্ট্রি/কন্ট্রোল অপারেটর পদধারী হতে পদোন্নতির সুযোগ রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ মোট সংখ্যার ৮০ শতাংশ। সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর, কম্পিউটার অপারেটর ও ডাটা এন্ট্রি/কন্ট্রোল অপারেটর ১৬৫০টি পদধারীদের জন্য ডাটা এন্ট্রি/কন্ট্রোল অপারেটর প্রশাসনিক কর্মকর্তার ৯৬৫টি পদে পদোন্নতির সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ১৬৫০ জন ৯৬৫টি পদে পদোন্নতি পেলেও বাকি ৬৮৫ জন পদোন্নতির সুযোগই পাবে না। অপরদিকে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকের পদধারী রয়েছে প্রায় ৭০০টি। প্রশাসনিক কর্মকর্তা ১৩শর মমধ্যে ৮৪৫টি পদে ৭০০ অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদোন্নতি পাওয়ার পরও ১৪৫টি পদ বাকি থাকে। ফলে সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর ও কম্পিউটার অপারেটরদের পদোন্নতির ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হয়েছে। এতে করে তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।

একাধিক প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২৭ বছর সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি করার পর প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পান এবং তাঁর ব্যাচের প্রত্যেকের-ই পদোন্নতি পেতে কমপক্ষে ২০ বছর সময় ব্যয় হচ্ছে। অথচ অফিস সহায়ক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে এলডি কাম টাইপিস্ট পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত হয়ে পরবর্তীতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পেয়ে আমার শাখার দায়িত্ব পেয়েছে। আমরা তার অধীনে কাজ করেছি। এত বিচক্ষণ কর্তৃপক্ষের কেন এই জটিলতা প্রশ্ন তাদের।

বাংলাদেশ সচিবালয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নূরুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ সচিবালয় যারা চাকরি করেন তাদের প্রত্যেকের পদোন্নতি পাওয়ার অধিকার আছে। চাকরি জীবনে পদোন্নতি হলো রিওয়ার্ড। এটা যেমন সম্মান বৃদ্ধি করে তেমনি আর্থিক সুবিধাও বাড়ে। তাই রেশিও অনুসারে প্রত্যেকটি পদধারীর পদোন্নতি পাওয়া উচিত। তবে সচিবালয় নিয়োগ বিধিতে ফিডার পদধারীদের পদোন্নতির জন্য যে কোটা পদ্ধতি রয়েছে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বর্তমানে সচিবালয় তৃতীয় শ্রেণির বিভিন্ন ক্যাটাগরির পদ থাকলেও তাদের কাজের ক্ষেত্রে কোনো ভিন্নতা নেই। তাই সচিবালয় ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরির পদ রাখারও কোনো যৌক্তিকতা নেই।

কর্মচারীদের এই নেতা আরও বলেন, বর্তমানে সচিবালয়ে তৃতীয় শ্রেণির বিভিন্ন ক্যাটাগরির যতগুলো পদ রয়েছে তার একটি তালিকা প্রণয়ন করে যে কোনো এক ক্যাটাগরির যেমন কম্পিউটার অপারেটর বা সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর নামে ততগুলো পদ সৃজন করতে হবে। তৃতীয় শ্রেণির বিদ্যমান কর্মচারীদের পদোন্নতির জন্য সম্বলিত গ্রেডেশন তালিকা অনুযায়ী পদোন্নতি প্রদান করার পাশাপাশি এ সব কর্মচারী পদোন্নতি বা পিআরএল জনিত কারণে পদ শূন্য হলে নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ওই পদে জনবল নিয়োগ করতে হবে। তাহলে দীর্ঘদিনের পদোন্নতি জনিত সৃষ্ট জটিলতা নিরসন হবে।

বাংলাদেশ সচিবালয়ের সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর/কম্পিউটার অপারেটর কল্যাণ সমিতির সভাপতির রোকন উজ জামান বলেন, বাংলাদেশ সচিবালয় (ক্যাডার বহির্ভূত গেজেটেড কর্মকর্তা এবং নন-গেজেটেড কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী আমাদের নিয়োগ যোগ্যতা স্নাতক, কম্পিউটারে এপটিটিউট টেস্ট এবং বাংলা ও ইংরেজি শর্টহ্যান্ড গতি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৩তম গ্রেডে চাকরিতে প্রবেশ করি। তবে পদোন্নতির কোটা কম থাকায় আমাদের পদোন্নতি হতে প্রায় ১০-১২ বছর সময় লাগে। নিয়োগ বিধিমালা সংশোধনের ফলে পদোন্নতির ক্ষেত্রে আরও দীর্ঘ সূত্রতার সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে একই নিয়োগ বিধিমালায় আওতাধীন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে যোগদান করে পদোন্নতির কোটা বেশি থাকায় ৫ বছরেই প্রশাসনিক কর্মকর্তা হন। অথচ আমাদের নিয়োগ যোগ্যতা, বেতনগ্রেড ও বাংলা ও ইংরেজি শর্টহ্যান্ড গতি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগ পাওয়া সত্ত্বেও আমরা পদোন্নতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।