ভয়ঙ্কর সাইবার ফাঁদে নারী

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২১ | ১৩ মাঘ ১৪২৭

ভয়ঙ্কর সাইবার ফাঁদে নারী

প্রীতম সাহা সুদীপ ৯:০১ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৩০, ২০২০

print
ভয়ঙ্কর সাইবার ফাঁদে নারী

ইন্টারনেটে প্রতিনিয়ত সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন নারীরা। এ হার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রতিনিয়ত র‌্যাব, পুলিশ, সিআইডিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন দফতরে জমছে এ-সংক্রান্ত অভিযোগের পাহাড়। গ্রেফতার করা হচ্ছে অভিযুক্তদের, তবুও কমছে না অপরাধ। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন ৬৮ শতাংশ নারীরা, তাদের মধ্যে অধিকাংশেরই বয়স ১৭ থেকে ২৫ বছর বয়সী। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্পর্শকাতর ছবি ও ভিডিও শেয়ার করার পর ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হচ্ছেন এসব উঠতি বয়সী নারীরা। তবে সমাজ ও লোকলজ্জার ভয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আইনি সহায়তা নিচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। এ সমস্যা কাটাতে নারীদের সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।

পুলিশের গোয়েন্দা তদন্ত সংস্থা সিআইডি সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সাইবার পুলিশ সেন্টারের ফেসবুক পেজে ১৭ সহাজার ৭০৩টি অভিযোগ এসেছে। এছাড়া ফোনে অভিযোগ করেছেন ৩৮ হাজার ৬১০ জন ভুক্তভোগী নারী। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৮২টি আর মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ১১৮টি। বাকিগুলোর তদন্ত চলমান রয়েছে।

সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (সিসিএ ফাউন্ডেশন) এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সাইবার অপরাধে আক্রান্তদের মধ্যে নারী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ২০১৮ সালের চেয়ে ২০১৯ সালে ১৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়েছে। গত বছর মোট ভুক্তভোগীর ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশই ছিল নারী। এসব ভিকটিমদের মধ্যে ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ আক্রান্ত হওয়ার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেন না। ২৩ শতাংশ নারী লোকলজ্জার ভয়ে বিষয়টি চেপে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আর ২২ দশমিক সাত শতাংশ নারীই জানেন না আসলে কীভাবে আইনি সহায়তা নিতে হয়।

এমন একজন ভুক্তভোগী ছাত্রীর সঙ্গে সম্প্রতি যোগাযোগ হয় এ প্রতিবেদকের। তানিয়া (ছদ্মনাম) নামের ওই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী জানান, রাসেল নামে এক ছেলের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। দীর্ঘ চার বছর তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল। এই সময়ের মধ্যে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেই ছেলে একাধিকবার তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়ান এবং অন্তরঙ্গ সেসব মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন।

সম্প্রতি ওই ছেলের সঙ্গে অন্য আরেকটি মেয়ের সম্পর্কের তথ্য জানতে পেরে তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন তানিয়া। আর এতেই ঘটে বিপত্তি। এক পর্যায়ে সেসব ছবি ও ভিডিও নিয়ে তানিয়াকে ব্ল্যাকমেইল করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে আবারও বাধ্য করার চেষ্টা করে ওই তরুণ। তানিয়া তাতে রাজি না হওয়ায় তার পরিবারকে এসব ছবি পাঠানোর কথা জানায় রাসেল। তখন তানিয়া ওই ছেলের আইডি ও মোবাইল নাম্বার ব্ল্যাকলিস্টে ফেলে দেয়। এর দুইদিন পরই তানিয়ার আইডিতে একটি ফেক আইডি থেকে মেসেজ আসে, সেখানে একটি পর্নো সাইটের লিংক দেয় আইডির ব্যবহারকারী। ওই লিংকে ক্লিক করে তানিয়া দেখতে পান রাসেলের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একটি ফুটেজ ওই পর্নো সাইটে আপলোড করা হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে তানিয়া যোগাযোগ করে সিআইডিতে। সেখানে তার অভিযোগ শুনে পরামর্শ দেওয়া হয় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা করতে। কিন্তু পরিবার জেনে যাবে এই ভয়ে ও লোকলজ্জায় আইনি ব্যবস্থা নিতে পিছপা হন তিনি। বন্ধুরা বোঝানোর পর অবশেষে মামলা করার বিষয়ে মানসিকভাবে শক্ত অবস্থান নিতে পেরেছেন ওই তরুণী। তবে পুলিশ বলছে, সমাজ ও লোকলজ্জার ভয়ে অনেক নারীই এমন অভিযোগ করার পর পরবর্তীতে মামলা এগিয়ে নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

সম্প্রতি মোহাম্মদ ইয়াসিন রাতুল নামে একজনকে গ্রেফতার করে সিআইডি। এই তরুণ কমপক্ষে ১৫ জন তরুণীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করে শারীরিক সম্পর্ক করেছেন। সেগুলোর ভিডিও ধারণ করে প্রত্যেককে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায় এবং পুনরায় শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হতে বাধ্যও করেন রাতুল।

সিআইডি বলছে, রাতুল প্রথমে তরুণীদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করতেন। এরপর শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন এবং সেগুলোর ফুটেজ প্রেমিকার মোবাইল ফোন দিয়েই ধারণ করতেন। পরে সুযোগ বুঝে প্রেমিকাদের ফোন চুরি করে রাতুল। পরে এসব ফুটেজ ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে অর্থ আদায় করতেন তিনি। এক তরুণীর অভিযোগ পেয়ে সম্প্রতি রাজধানীর বাংলামোটর এলাকা থেকে রাতুলকে গ্রেফতার করে সিআইডির সাইবার টিমের সদস্যরা। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠান।

সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের বিশেষ পুলিশ সুপার আশরাফুল আলম জানান, শনিবার পর্যন্ত রাতুলের বিরুদ্ধে আরও দুই তরুণী একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে প্রায় ২০ তরুণী এই ধরনের অভিযোগ করেছেন। রাতুলের মত এমন অনেককেই এমন অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা বিভিন্ন সময় গ্রেফতার করেছি। তাদের সবার বিরুদ্ধেই গুরুত্ব বুঝে মামলা হয়েছে, সেসব মামলার কার্যক্রমও চলমান আছে।

এদিকে সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান বলেন, আমাদের কাছে সাইবার ক্রাইমের শিকার যেসব তরুণী অভিযোগ করেন, তার বেশিরভাগই প্রেমঘটিত সাইবার ক্রাইম। এসব ক্ষেত্রে নারীদের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। আবেগকে কন্ট্রোল করতে হবে এবং নিরাপদভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তাহলে এ ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ বলেন, সাইবার জগতের ৬৮ শতাংশ নারীই সাইবার অপরাধের শিকার হোন। এদের মধ্যে সাধারণত ১৬ থেকে ২৪ বছরের নারীরা সাইবার অপরাধে সবচেয়ে বেশি ভিকটিম হয়। এখন পর্যন্ত সাইবার অ্যাক্টে ৬ হাজার ৯৯টি মামলা হয়েছে।

তিনি বলেন, এই অপরাধগুলো নিয়ে ডিএমপি, ডিবি, সিআইডি, পিবিআই কাজ করছে। যারা সাইবার জগতে প্রবেশ করছেন, তাদের সবার সাইবার জগতের ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন হয়েই এটি ব্যবহার করা উচিত। তারপরও যদি কোন অনাকাক্সিক্ষত সমস্যা তৈরি হয়, সে বিষয়ে আমরা কাজ করব। এক্ষেত্রে ভিকটিমের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করেই তাকে সেবা দেব আমরা।