সেলিমপুত্রের ডিজিটাল সাম্রাজ্য

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সেলিমপুত্রের ডিজিটাল সাম্রাজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২০

print
সেলিমপুত্রের ডিজিটাল সাম্রাজ্য

নৌবাহিনীর এক লেফটেন্যান্টকে মারধরের অভিযোগে ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গতকাল সোমবার তাকে গ্রেফতার করা হয়। এর জের ধরে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সোয়ারিঘাটে হাজী সেলিমের বাড়ি ঘিরে অভিযান শুরু করে র‌্যাব। অভিযানে অস্ত্র, মদ, ওয়াকিটকিসহ নানা অবৈধ সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় মাদক ও অস্ত্র মামলায় ইরফান সেলিমকে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এর আগে গত রোববার সন্ধ্যার পর ধানমন্ডির কলাবাগান ক্রসিংয়ের কাছে মারধরের ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনায় গতকাল সোমবার সকাল ৮টার দিকে হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা হয়েছে। ধানমন্ডি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) কামরুন্নাহার জানান, নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমদ খান বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। মামলায় তিনজন নামীয় এবং অজ্ঞাত আরও দুই-তিন জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিরা হলো- ইরফান সেলিম, তার বডিগার্ড মোহাম্মদ জাহিদ, হাজী সেলিমের মদিনা গ্রুপের প্রটোকল অফিসার এবি সিদ্দিক দিপু এবং গাড়িচালক মিজানুর রহমানসহ অজ্ঞাত আরও দুই তিনজন। গাড়িচালক মিজানুর রহমানকে ঘটনার পরই গ্রেফতার করা হয়।

হাজী সেলিমের বাসায় র‌্যাবের অভিযান
গতকাল সোমবার দুপুর ১টা থেকে পুরান ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের চকবাজারের ২৬ দেবীদাস লেনের বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। অভিযানে বেরিয়ে আসে ভেতরের ভয়ঙ্কর চিত্র। পুরান ঢাকা এলাকায় ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং করতে হাজী সেলিমের বাসায় গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিসহ অত্যাধুনিক ‘কন্ট্রোল রুম’। কন্ট্রোল রুমে রয়েছে- আধুনিক ভিপিএস (ভার্চুয়াল প্রাইভেট সার্ভার), ৪০টি ওয়াকিটকি, ড্রোনসহ বিভিন্ন ডিভাইস। রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের (ভিভিআইপি) নিরাপত্তায় নিয়োজিত এলিট বাহিনীর কাছে যেসব সরঞ্জাম থাকে, সেরকম সরঞ্জাম পাওয়া গেছে এখানে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ফাঁকি দিয়ে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় এমন কন্ট্রোল রুম ব্যবহার করা হতো বলে র‌্যাবের ধারণা। অভিযানে বিদেশি অস্ত্র, হ্যান্ড কাফ ও মদও জব্দ করেছে র‌্যাব। ইতোমধ্যে হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষী জাহিদকে র‌্যাবের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, ওই বাড়ির চতুর্থ ও পঞ্চম তলাটি ডুপ্লেক্স সিস্টেমে নির্মাণ করা হয়েছে। চতুর্থ তলার উত্তর কর্নারের রুমটিতে বসবাস করতেন এমপি পুত্র ইরফান সেলিম। তার রুমের তোশকের নিচে ম্যাগজিনভর্তি একটি বিদেশি পিস্তল পাওয়া গেছে। এছাড়া ৫ম তলায় পূর্ব পাশের কর্নারে পাঁচটি ওয়্যারলেস এবিএস সিস্টেম ও ৪০টি ওয়াকিটকি সেট, একটি হ্যান্ডকাপ, একটি বন্দুক, বিদেশি মদের বোতল ও বিয়ার মদ পাওয়া গেছে।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলেন, এসব ওয়াকিটকির প্রতিটি চার কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা কাভার করত। এ ধরনের ওয়াকিটকি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির অনুমোদন ছাড়া ব্যবহার করা নিষেধ। এছাড়া ওই বাসায় একটি ড্রোন, রাউটার, একটি ভার্চুয়াল প্রাইভেট সার্ভার বা ভিপিএস পাওয়া গেছে। এই ভিপিএস দিয়ে মূলত তার পুরো নেটওয়ার্কে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করত, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ট্র্যাক করতে না পারে। সাধারণত ভিপিএস ব্যবহারের অনুমোদন পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা নিরাপত্তায় নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থা। বিটিআরসি এই অনুমোদন দেয়। তবে হাজী সেলিম কোনো অনুমোদন নেননি। বাসা থেকে আরও উদ্ধার করা হয়েছে সাত বোতল বিদেশি মদ ও ১২ ক্যান বিয়ার। এক জোড়া হ্যান্ডকাফও উদ্ধার করেছে র‌্যাব। র‌্যাবের ধারণা, এ হ্যান্ডকাফ পরিয়ে হাজী সেলিমের লোকজন র‌্যাব ও ডিবি পরিচয় দিয়ে মানুষকে ধরে নিয়ে যেত। র‌্যাবের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষী জাহিদ তাদের হেফাজতে রয়েছে।

হাজী সেলিমের ছেলে ইরফানকে ১ বছরের কারাদণ্ড
অবৈধ অস্ত্র ও মাদক রাখার দায়ে সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিমের ছেলে ইরফানকে ৬ মাস করে ১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার আলমের ভ্রাম্যমাণ আদালত এ কারাদণ্ড দেন। সন্ধ্যায় র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

হাজী সেলিমের গাড়িচালক মিজানুর রিমান্ডে
নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় সংসদ সদস্য (এমপি) হাজী সেলিমের গাড়িচালক মিজানুর রহমানের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল সোমবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু সুফিয়ান মোহাম্মদ নোমান শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। আদালতের সংশ্লিষ্ট থানার সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, ধানমন্ডি থানার মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা আশফাক রাজীব হাসান সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে তাকে আদালতে হাজির করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ বিরোধিতা করে। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক রিমান্ডের এই আদেশ দেন।

ওয়াসিফ আহমদ
এতে অভিযোগ করা হয়, রোববার নীলক্ষেত থেকে বই কিনে মোটরসাইকেলে করে তিনি মোহাম্মদপুরে তার বাসায় ফিরছিলেন। সঙ্গে তার স্ত্রীও ছিলেন। ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে তার মোটরসাইকেলটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় সংসদ সদস্যের স্টিকার লাগানো একটি কালো রঙের ল্যান্ড রোভার গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১১-৫৭৩৬)। তখন ওয়াসিফ আহমদ মোটরসাইকেল থামিয়ে গাড়িটির গ্লাসে নক করে নিজের পরিচয় দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার কারণ জানতে চান। তখন এক ব্যক্তি বের হয়ে তাকে গালিগালাজ করে। তারা গাড়ি নিয়ে কলাবাগানের দিকে যায়। মোটরসাইকেল নিয়ে ওয়াসিফ আহমদও তাদের পেছনে পেছনে যান। কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডে গাড়িটি থামলে ওয়াসিফ তার মোটরসাইকেল নিয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়ান। তখন তিন-চারজন লোক গাড়ি থেকে নেমে বলতে থাকে, ‘তোর নৌবাহিনী/সেনাবিহিনী বাইর করতেছি, তোর লেফটেন্যান্ট/ক্যাপ্টেন বাইর করতেছি। তোকে আজ মেরেই ফেলব’ এই কথা বলে তাকে কিলঘুষি দিতে থাকে। পরে ট্রাফিক পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে এবং হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।

গত রোববার রাতে কলাবাগানের ট্রাফিক সিগন্যালে হাজী সেলিমের একটি গাড়ি থেকে দুই-তিনজন ব্যক্তি নেমে নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমদ খানকে ফুটপাতে ফেলে এলোপাতাড়ি মারধর করে। পরে ট্রাফিক পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে। পথচারীরা এই দৃশ্য ভিডিও করেন, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। সেখানে নৌবাহিনীর এই কর্মকর্তাকে রক্তাক্ত মুখে বলতে শোনা যায়, তিনি পরিচয় দেওয়ার পরও তাকে মারধর করা হয়েছে, তার স্ত্রীর গায়েও হাত দিয়েছে। পরে ধানমন্ডি থানা পুলিশ এসে ঘটনাস্থল থেকে গাড়িটি থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে পথরোধ করে সরকারি কর্মকর্তাকে মারধর, জখম ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন ওয়াসিফ আহমদ খান।

হাজী সেলিম বর্তমানে ওই এলাকার সংসদ সদস্য। আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগরের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক হাজী সেলিম এর আগেও দুই দফায় এই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। এর মধ্যে ২০১৪ সালে বিদ্রোহী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে হারিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

র‌্যাব জানায়, ইরফান মোহাম্মদ সেলিম ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করীম চৌধুরীর মেয়ের জামাতা।