প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তি কী

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

নিরাপদ সড়ক দিবস আজ

প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তি কী

শাহাদাত স্বপন ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০২০

print
প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তি কী

দেশব্যাপী আজ পালিত হচ্ছে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’। চার বছর আগে থেকে দিবসটি পালিত হলেও দেশব্যাপী কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হয় ২০১৮ সালের শেষদিকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলনের পর থেকে। সে সময় তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপদ সড়ক আইন পাস করতে বাধ্য হয় সরকার। ২০১৮ সালের শেষদিকে রাজধানীতে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়ক ও সেই ঘাতক বাসচালকের বিচার দাবিতে ৯ দফা দাবি নিয়ে রাজপথে নেমে আসে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবিগুলো ছিল- বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো সেই চালকের ফাঁসি, তৎকালীন নৌ-পরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্যের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ ও রাস্তায় লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো বন্ধ করা, বাসে অতিরিক্ত যাত্রী না নেওয়া, শিক্ষার্থীদের চলাচলে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সড়কে স্পিড ব্রেকার স্থাপন, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্রছাত্রীদের দায়ভার সরকারের গ্রহণ, সিগনাল দিলে ছাত্রছাত্রীদের বাসে তুলে নেওয়া এবং ঢাকাসহ সারা দেশের পরিবহনে শিক্ষার্থীদের ভাড়া অর্ধেক করা।

দাবিগুলোর পরিপ্রেক্ষিত সড়ক পরিবহন আইন পাস করে সরকার। সেখানে ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনায় চালকের ফাঁসির ব্যবস্থা রেখে আইন পাস হলেও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তা শিথিল করে সরকার। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েক দফা রাস্তায় নামতে দেখা গেছে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে প্রাপ্তির মধ্যে সড়ক আইন ও দিবস পালন বড়। কিন্তু সড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালনার মতো বড় অপরাধের বিষয়ে যে আইন পাস করা হয়েছে, তার কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। কিন্তু এ আইন প্রয়োগের বিরুদ্ধেই সোচ্চার একটি গোষ্ঠী। তারা বরাবরই চায় এ আইন যাতে বাস্তবায়ন না হয়। আইন বাস্তবায়ন পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটলেও তার উপযুক্ত বিচার পাননি ভুক্তভোগীরা। এ আইনের ফাঁকে কোনো না কোনোভাবে বের হয়ে যাচ্ছে ঘাতক চালকরা। আইনের উপযুক্ত প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর ফাঁক-ফোকর বন্ধ করে সড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালকদের বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান তারা।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও প্রাপ্তির বিষয়ে জানতে চাইলে নিরাপদ সড়ক চাই- নিসচার চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় অপ্রাপ্তির জায়গা হচ্ছে সড়কে অপরাধের দায়ে যাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে, কেউ কেউ তাদের পক্ষে কথা বলছেন এবং আইনটি যাতে অকার্যকর হয়- এ ব্যাপারে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আইন বাস্তবায়নের সঙ্গে যেসব পরিবহন নেতা যুক্ত রয়েছেন, তারা আইন বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রামাদিতে অংশ নিচ্ছেন না। তারা এখানে বিভাজন সৃষ্টি করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এমনকি তারা এ আইনের বিরুদ্ধে ৯ দফা দাবিতে আন্দোলনও করছেন। তারা চান আইনটি বাতিল হোক।

তিনি বলেন, দেখুন সড়ক থেকে মানুষ নিরাপদে বাসায় ফিরবে- এ নিশ্চয়তার জন্য আইন করা হলো, তার বিরুদ্ধে ঠিকই একটি গোষ্ঠী অবস্থান নিয়েছে। বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এটি অপ্রাপ্তির সবচেয়ে বড় বিষয়। প্রধানমন্ত্রী ১৭টি দাবি পূরণ করে ঘাতকদের হাত থেকে সড়ক নিরাপদ করতে আইন পাস করেছেন এবং অনুমোদন দিয়েছেন। এর যথাযথ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাব। ‘মুজিববর্ষের শপথ, সড়ক করব নিরাপদ’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে সড়ক নিরাপদ করতে শত বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

এ বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী খোলা কাগজকে বলেন, নিরাপদ সড়ক শুধু দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। বিষয়টি নিশ্চিত করার নির্বাচনী অঙ্গীকার জরুরিভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ সড়কে প্রাণ দিচ্ছে, আহত হচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে। তাদের সুরক্ষা দিতে এ দিবসটি অন্যান্য জাতীয় দিবসের মতো গতানুগতিকভাবে একদিন পালন না করে নিরাপদ সড়ক দিবসকে কেন্দ্র করে মাসব্যাপী স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার সংক্রান্ত আলোচনা সভা, মসজিদ-মন্দির-গীর্জায় আলোচনাসহ দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরতে হবে। সমাজের সব স্তরে নিরাপদ সড়কের বার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে দিবসটি উদযাপনের সুফল পাওয়া যাবে।

তথ্য মতে, ২০১৫ সাল থেকে বিগত ৫ বছরে ২৬ হাজার ৯০২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৭ হাজার ১৭০ জন নিহত ও ৮২ হাজার ৭৫৮ জন আহত হয়েছেন। তবে সংগঠিত দুর্ঘটনার সিংহভাগই গণমাধ্যমে আসে না। যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে ৬ হাজার ৫৮১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৬৪২ জন নিহত ও ২১ হাজার ৮৫৫ জন আহত হয়েছেন। ২০১৬ সালে ৪ হাজার ৩১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৫৫ জন নিহত ও ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত হয়েছেন। ২০১৭ সালে ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৯৭ জন নিহত ও ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হয়েছেন। ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ২২১ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। ২০১৯ সালে ৫ হাজার ৫১৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৮৫৫ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন ১৩ হাজার ৩৩০ জন। এসব সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বর্তমান সরকারের সময়ে সড়ক-মহাসড়কে উন্নয়নের ফলে যানবাহনের গতি বেড়েছে, এ সময়ে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো এবং বিপজ্জনক অভারটেকিং বেড়ে যাওয়ার কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।

তাদের দাবি, জনগণের বহুল প্রত্যাশিত সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়নের পরও সড়কে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন লক্ষ্য করা যায়নি। বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি ঠিক আগের মতোই বিদ্যমান। ফলে যাত্রী ভোগান্তি, যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা দিনদিন বেড়েই চলেছে। সড়কে এহেন পরিস্থিতি বহাল রেখে নিরাপদ সড়ক দিবস পালন বেমানান। ২০২১ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে জাতিসংঘের অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সড়কে পথচারীর মৃত্যুর হার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এ অঙ্গীকার নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে মনে করেন যাত্রীদের সুবিধা নিয়ে কাজ করা এ সংগঠনটির মহাসচিব।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে একটি আধুনিক, নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ চলছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ মহাসড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণসহ উপ-আঞ্চলিক মহাসড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় নিরলস কর্মপ্রয়াস চালানো হচ্ছে। বর্তমান সরকারের সময় বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নির্মিত হয়েছে পৃথক সার্ভিস লেনসহ চারলেন বিশিষ্ট মহাসড়ক এবং এক্সপ্রেসওয়ে।

ইতোমধ্যে ৪৫৩.০৭ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক চারলেনে উন্নীতকরণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে পৃথক দুটি সার্ভিস লেনসহ ছয় লেনের মহাসড়ক রয়েছে ১২৫ কিলোমিটার এবং এক্সপ্রেসওয়ে ৫৫ কিলোমিটার। বর্তমানে প্রায় ৪৪১ কিলোমিটার মহাসড়ক সার্ভিস লেনসহ ছয় লেনে এবং ১৭৫.৬৪ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত কাজ চলছে। এছাড়া ১ হাজার কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক সার্ভিস লেনসহ ৪ লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলমান রয়েছে। মহাসড়ক স্ন্যাকস্পট নিরসন, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে রাশি স্থাপন, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আন্ডারপাস নির্মাণ এবং হাইওয়ের পাশে ট্রাক চালকদের বিশ্রামাগার নির্মাণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ঢাকা মহানগরী ও এর আশপাশের এলাকার যানজট নিরসন এবং নিরাপদ ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ১ লাখ ৫১ হাজার ৮০১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪টি মেট্রোরেল নির্মাণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। তাছাড়া দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য পেশাজীবী গাড়িচালকদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রদান, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশেষ প্রচার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রম পরিচালনার ফলে সড়ক আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ হয়েছে।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে দুর্ঘটনা রোধে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সড়ক-মহাসড়কের প্রকৌশলগত ত্রুটি নিরসন ছাড়াও বিদ্যমান আইনের ব্যবহার এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সড়কে একটি মৃত্যুও চাই না। তার পরও ঘটছে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা। ইতোমধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসহ সারা দেশের ১২১টি দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁকের ঝুঁকি হ্রাস করা হয়েছে।

মহাসড়ক নিরাপদ করতে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনা প্রতিপালনে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। এরই মাঝে মহাসড়কে চারটি বিশ্রামাগার নির্মাণকাজ এগিয়ে চলেছে। দেশব্যাপী জাতীয় মহাসড়কসমূহ দুই পাশে ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন রেখে পর্যায়ক্রমে চারলেনে উন্নীত করা হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বিশেষ আকুশন প্ল্যান। তাছাড়া জনগণ সচেতন হওয়া জরুরি।

জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিআরটিএর উদ্যোগে সারা দেশে সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কিত লিফলেট, পোস্টার, স্টিকার বিতরণ করা হচ্ছে। তবে অংশীজনদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং সরকারি উদ্যোগসমূহের সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সম্ভব।