আলুর দরে সার্কাস

ঢাকা, রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০ | ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

আলুর দরে সার্কাস

নির্ধারিত দামে রদবদল, বিক্রি বন্ধ করে নীরব হুমকি, বিভাগীয় হুঁশিয়ারি

তুষার আহসান ৯:৪৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০২০

print
আলুর দরে সার্কাস

পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে আলুর। এরপরও বাড়ছে দাম। কেন বাড়ছে তার উত্তর নেই যেন কারও কাছেই। দামের ঊর্ধ্বগতিতে লাগাম টানতে যে চিঠি ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো হয়েছিল ৭ অক্টোবর, তা জানাজানি হলো এক সপ্তাহ পর। এখানেও জেগে ওঠা কেন-এর উত্তর পাওয়া যায়নি। মাত্র ছয় দিন আগে বিশেষ মনিটরিংয়ের কথা উল্লেখ করে শিগগির আলুর দাম কমে আসার যে আশ্বাস দিয়েছিলেন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, তাতেও পড়েছে ভাটা।

গতকাল মঙ্গলবার তিনিই নির্ধারিত দাম থেকে সড়ে দাঁড়িয়ে কেজিপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসছে বলে জানিয়েছেন। গত দুই দিন কারওয়ান বাজারের পাইকারি দোকানে আলু বিক্রি বন্ধের মধ্যে এই ঘোষণাকে ‘সিন্ডিকেটের চোখ রাঙানি’ বলে মনে করছেন সাধারণ জনগণ।

এদিকে রোদে পুড়ে লাইনে দাঁড়িয়ে টিসিবি পণ্য-ট্রাক থেকে আলু নিতে গিয়েও ক্রেতাদের পড়তে হচ্ছে বিপত্তিতে। নিম্ন আয়ের বয়োজ্যেষ্ঠরা কম শক্তির কারণে ভিড় ঠেলে যেতে পারছেন না ট্রাকের কাছে, অন্যদিকে সেখানে কেউ স্বাস্থ্য মানছে না বলে রয়েছে করোনার ভয়াল থাবার ভয়। সব মিলিয়ে আলুর দরে সার্কাস চলছে বলে দাবি ভোক্তাদের।

সাধারণরত ১৫ থেকে ২০ টাকার মধ্যে ঘুরে বেড়ানো পণ্যটি এ বছর জন্ম দিচ্ছে নতুন নতুন রেকর্ডের। হু হু করে বেড়ে যাওয়া দামে সবচেয়ে বেশি সংকটের মধ্যে আছেন স্বল্প আয়ের মানুষ। অথচ হিমাগার সমিতির হিসেবে, দেশে বর্তমানে মোট আলুর মজুদ রয়েছে ২৩ থেকে ২৫ লাখ মেট্রিক টন। সেহিসাবে বাড়তি না থাকলেও আলুতে ঘাটতির সম্ভাবনা বা শঙ্কা এখনো দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তারপরও ভালো মানের চালের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে আলুর দামও।

ফলে নিম্নবিত্তদের জন্য এক সময়ের স্লোগান ‘বেশি বেশি আলু খান, ভাতের ওপর চাপ কমান’ও এখন ম্লান। বাজার সামলাতে তাদের উঠছে নাভিশ্বাস। কারণ সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের নির্দেশনা তোয়াক্কা করছে না এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা। যদিও অপর এক হিসাবে হিমাগার মালিক সমিতি জানায়, গত বছর কোল্ড স্টোরেজে আলু মজুদ ছিল ৫৫ লাখ টন। এ বছর মজুদ হয়েছে ৪৫ লাখ টন। অর্থাৎ এবার চাহিদার তুলনায় মজুদ ১০ লাখ টন কম।

গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান বলছে, জুলাইয়ে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে আলু। আর গত এক মাসজুড়ে বাজার ভেদে তা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ থেকে ৫৫ টাকায়। এমন এক পরিস্থিতিতে কৃষি বিপণন অধিদফতর গত ৭ অক্টোবর আলুর দাম হিমাগার পর্যায়ে কেজিপ্রতি ২৩ টাকা, পাইকারি বাজারে ২৫ টাকা ও খুচরা বাজারে ৩০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। এর এক সপ্তাহ পর নির্দেশনার বিষয় জানাজানি হলে আলুর দর কেজিপ্রতি ৫ টাকা কমে আসে। ওই এক সপ্তাহ জেলা প্রশাসনের কোনো নড়াচড়া না দেখে প্রশ্ন ওঠে জনমনে। আর গত বৃহস্পতিবার কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বিশেষ মনিটরিংয়ের হুঁশিয়ারি দিলে সোমবার থেকে কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরা বন্ধ করে দেন আলু বিক্রি।

পাইকারি বিক্রেতারা জানিয়েছেন, কৃষি বিপণন অধিদফতর পাইকারিতে আলুর দাম কেজিপ্রতি ২৫ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও তাদের কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। হিমাগার থেকে নির্ধারিত দামে আলু পাওয়া যাচ্ছে না। কারওয়ান বাজারের আলুর আড়তের ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজশাহী, বগুড়া ও মুন্সীগঞ্জে হিমাগার থেকে সরকারের নির্ধারিত দামে আলু বিক্রি হচ্ছে না। ২৫ টাকার জায়গায় আলু কিনতে হচ্ছে ৩৭ থেকে ৩৮ টাকা কেজিতে। তাই বাইরে থেকে ব্যবসায়ীরা ঢাকায় আলু নিয়ে আসছেন না।

পাইকারি বিক্রেতা মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘২৫ টাকা দামে আলু বিক্রি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। কারণ কেজি প্রতি আলু আমাদের কিনতে হয় ৩৭ থেকে ৩৮ টাকায়। লোকসান দিয়ে তো ব্যবসা করা যায় না। সোমবার থেকে আলু বিক্রি বন্ধ আছে।’

আরেক আলু ব্যবসায়ী মো. সোহেল বলেন, ‘আমাদের জরিমানা করা হচ্ছে। অথচ যে আলু আমরা বেশি দাম দিয়ে কিনেছি, সেটা কম দামে বিক্রি করব কীভাবে?’

এ পরিস্থিতে আলুর বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে করণীয় নির্ধারণে গতকাল মঙ্গলবার আলু ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা ডাকে কৃষি বিপণন অধিদফতর। বেলা ৩টার দিকে খামারবাড়িতে অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে এই সভা আয়োজন করা হয়। এর আগেই প্রতি কেজি আলুতে ৫ টাকা বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করার সিদ্ধান্তের কথা জানান কৃষিমন্ত্রী।

মন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে আলুর এই নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ সূত্র বলছে, পণ্যটির উৎপাদন খরচ কেজি প্রতি মাত্র ৮ দশমিক ৩২ টাকা। কৃষকের কাছ থেকে আলু সংগ্রহ করতে ব্যবসায়ীদের প্রতি কেজিতে ৩-৫ টাকা বেশি গুনতে হয় লাভে। কৃষি বিপণন অধিদফতরের সাম্প্রতিক এক হিসেব বলছে, হিমাগারে রাখাসহ প্রতি কেজি আলুর পেছনে খরচ পড়েছে ১৮ টাকা ৯৯ পয়সা।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ‘হঠাৎ দাম বৃদ্ধির পেছনে কারণ হতে পারে মজুদ সংকট। এর পেছনে রয়েছে শক্ত সিন্ডিকেট। আর তা হাতে-নাতেই প্রমাণ মিলেছে গত দুই দিনের কারওয়ান বাজারে। সরকারও নড়েচড়ে বসেছে। দাম বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছে।’

যদিও দাম বাড়ার পেছনে সম্প্রতি চারটি কারণের একটিতে হিসাবে বিপুল পরিমাণ রপ্তানিকে তুলে ধরে কৃষি মন্ত্রণালয়। কৃষিমন্ত্রী গণমাধ্যমে জানান, সরকারের ২০ শতাংশ ভর্তুকির কারণে গত বছরের তুলনায় চলতি বছর প্রায় ৪০ গুণ বেশি আলু রপ্তানি হয়েছে। আর কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ডলার মূল্যের আলু।

আর চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৪৮ হাজার ডলার মূল্যের আলু। এছাড়া উত্তরাঞ্চলে দফায় দফায় বন্যার কারণে আলুর পাশাপাশি সবজির আবাদ কম হয়েছে। সেটার চাপ পড়েছে আলুর ওপর।