কর্নেল হলেন কোমায় থাকা সেনাকর্মকর্তা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

কর্নেল হলেন কোমায় থাকা সেনাকর্মকর্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০২০

print
কর্নেল হলেন কোমায় থাকা সেনাকর্মকর্তা

হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কোমায় চলে যান দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা। এরপর টানা আট বছর ধরে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন। হাত-পা নাড়াতে পারলেও কোমায় আচ্ছন্ন তিনি। প্রতিটি মুহূর্তে জীবন থেকে একটি একটি করে সেকেন্ড, মিনিট আর ঘণ্টা হারিয়ে গেছে। ভাগ্যের নির্মমতায় অজুত সম্ভাবনার সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। হাসপাতালের শয্যায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে চাকরি জীবনের শেষ দিনে এসে পৌঁছলেন। বিদায়লগ্নে বিরল এক সম্মান পেলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা।

গত সোমবার তাকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদ থেকে কর্নেল হিসেবে পদোন্নতির সম্মানে ভূষিত করেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। দূর থেকে কাছের মানুষের কাছেও এটি এসেছে খুশির খবর হয়ে। এ সম্মানে আপ্লুত কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজার জীবনসঙ্গী মোসলেহা মনিরা রাজাও। তিনি সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি সেনাপ্রধান আমার স্বামীকে এমন সম্মান দেবেন। এ সম্মানে আমরা গর্বিত। বিদায়বেলায় প্রত্যাশার চেয়ে এটি অনেক বড় এক অর্জন। সেনাবাহিনী থেকে এ বিদায় আমাদের জন্য সুখকর হয়েছে। আমি আশাবাদী একদিন আমার স্বামী সুস্থ হয়ে উঠবেন। স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন। তিনি নিজেও তার সম্মান ও মর্যাদার কথা অনুধাবন করতে পারবেন। সেই অপেক্ষাই এখন আমাদের।

পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেনাবাহিনীর কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা মরমি কবি হাছন রাজার প্রোপুত্র। ১৯৮৯ সালের ২৩ জুন তিনি সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। দীর্ঘ চাকরিজীবনে ১৯৯৬ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অধীন ইরাক-কুয়েত ও ২০০৭ সালে সুদানে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করেন। প্রায় অর্ধশতাধিক দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। চাকরি জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও লেখালেখিতে হাত পাকিয়েছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা। কবি হাছন রাজার জীবন ও কর্ম নিয়ে হাছন রাজা সমগ্র, মেজর জেনারেল এম এ জি ওসমানিকে নিয়ে ‘ও জেনারেল মাই জেনারেল,’ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসসহ একাধিক বই লিখেছেন তিনি।

মোসলেহা মনিরা রাজা জানান, তার স্বামী সর্বশেষ সেনাবাহিনীর হিস্ট্রি প্রজেক্টে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে কর্মরত ছিলেন। ২০১৩-এর ১১ মার্চ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে তিনি ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেদিন সন্ধ্যায় তিনি হার্ট অ্যাটাক করেন। ওই বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মে মাসে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনরায় সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। এরপর দীর্ঘ আট বছর ধরে তিনি কোমায় রয়েছেন। সিএমএইচের চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, সিএমএইচে যখন যে ধরনের সাপোর্ট চেয়েছি আল্লাহর রহমতে পেয়েছি। প্রায় আট বছর ধরে এক কঠিন সংগ্রাম করে চলেছি। তিন সন্তানকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বলেই সব রকমের সহযোগিতা আমরা পেয়েছি। অন্য কোথাও হলে সম্ভবত এরকমের সুযোগ-সুবিধা পেতাম না।

সিএমএইচের আইসিইউ প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাসুদ মজুমদার জানান, কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজার এ অসুস্থতাকে চিকিৎসার ভাষায় বলা হয় হাইপোস্কিক স্মিমিক ইনজুরি টু ব্রেইন ইফেক্টস। আমাদের হার্ট বন্ধ হয়ে ব্রেইন সার্কুলেশন বন্ধ হয়ে গেলে ৫ মিনিটের মধ্যে ব্রেইনের সেলগুলোতে চেঞ্জ আসতে থাকে। হার্টের মধ্যে ইফেক্ট পড়ে ৭ থেকে ১৫ মিনিটের মাথায়। ওর (দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা) হার্ট ফিরে এসেছে, ব্রেইন ফিরে আসেনি। পুরো প্রক্রিয়ার সময় তার ব্রেইনে সার্কুলেশন ৫ মিনিটের অতিরিক্ত ছিল। কিন্তু ১৫ মিনিটের কম ছিল। এজন্য ওর ব্রেইনের নিচের অংশ ভালো। কিন্তু বাইরের যে অংশগুলো আমাদের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে জড়িত সেই এরিয়ার সেলগুলো পুনরুজ্জীবিত হয়নি। এজন্য জীবন চালানোর জন্য বেসিক বডির প্রটেকটিভ সিস্টেম ভালো থাকলেও হাইয়ার সাইকোলজিক্যাল ফাংশনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।