চোখের পলকে ছিনতাই হয় মোবাইল ফোন

ঢাকা, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০ | ৯ কার্তিক ১৪২৭

চোখের পলকে ছিনতাই হয় মোবাইল ফোন

প্রীতম সাহা সুদীপ ৯:২৩ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

print
চোখের পলকে ছিনতাই হয় মোবাইল ফোন

দ্রুতবেগে এগিয়ে চলছে বাস, এমন সময় হঠাৎ গাড়ির ভেতরে জানালার কাছে বসা এক যাত্রীর চিৎকার ‘আমার মোবাইল, আমার মোবাইল’। এরপর চালককে বাস থামাতে বলে তড়িঘড়ি করে নেমে গেলেন ওই যাত্রী। তার পাশে থাকা আরেক যাত্রীকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল চলন্ত বাস থেকেই জানালা দিয়ে ওই যাত্রীর হাতে থাকা স্মার্টফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে গেছে ছিনতাইকারী। ঘটনাটি শুক্রবার বিকালে রাজধানী ঢাকার গুলিস্তান এলাকার। যারা সবসময় গণপরিবহনে যাতায়াত করেন, তাদের কাছে এই এলাকায় এমন ঘটনা নতুন নয়।

প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীর শাহবাগ, পল্টন ও গুলিস্তান এলাকায় অহরহই ঘটে চলেছে এমন ঘটনা। এলাকাগুলোর রোড আইল্যান্ডে প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় উঠতি বয়সী ছেলেদের। দেখে বোঝার উপায় নেই আসলে তাদের উদ্দেশ্য কী, আইল্যান্ডে দাঁড়িয়েই তারা খেয়াল করে কোন গাড়ির জানালার পাশে বসা যাত্রী মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। নজরে পড়ে গেলেই টার্গেট চূড়ান্ত। এরপর এক দৌড়, চিলের মতো ছোঁ মেরে টার্গেট করা যাত্রীর মোবাইলটি ছিনিয়ে নিয়ে উধাও। ভুক্তভোগী যাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ ঘোরের মধ্যে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন, আবার কেউ কেউ বাস থামিয়ে চোর ধরতে দৌড়ে নেমে যান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর গুলিস্তান, পল্টন ও শাহবাগ এলাকায় দিনে দুপুরে যাত্রীবাহী বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন থেকে মোবাইল ছিনতাই করে বেশ কয়েকটি গ্রুপ। তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ছিনতাই করা এসব মালামাল গুলিস্তান পাতাল মার্কেট, স্টেডিয়াম মার্কেটসহ ওসমানি উদ্যান, ফকিরাপুল এবং পল্টনের বিভিন্ন চোরাই মার্কেটের দোকানগুলোতে সরবরাহ করে। গুলিস্তান পাতাল, সুন্দরবন স্কয়ার ও মোতালিব প্লাজা মার্কেটে ছিনতাই হওয়া এসব মোবাইলের আইএমইআই নম্বর পরিবর্তন করে তা সুকৌশলে বিক্রি করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চক্র।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে নিয়মিত ছিনতাই স্পটগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে ২৫টি চিহ্নিত গ্রুপ। তারাই চুরি ও ছিনতাই করা পণ্য এ সকল চোরাই মার্কেটে সরবরাহ করছে। মতিঝিল, গুলিস্তান, পল্টন, ফকিরাপুল, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদসহ আশপাশের এলাকার চিহ্নিত ছিনতাইকারী ও তাদের গ্রুপের সদস্যদের অবাধ বিচরণ রয়েছে এসব মার্কেটে।

পুলিশের তালিকায় রাজধানীতে যেসব ছিনতাইচক্র তৎপর তাদের মধ্যে রয়েছে বাড্ডার সোহেল, গুলশানের নাসির, ল্যাংড়া বাচ্চু, কাইল্যা সেন্টু, মিরপুইর‌্যা আকতার, এতিম মনির, ইমু, জাকির, আরিফ, সুলতান, জাহাঙ্গীর ও সাগর গ্রুপ। মিরপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও উত্তরায় ছিনতাইকারীদের নেতৃত্ব দিচ্ছে খলিফা গ্রুপ। মতিঝিল ও ওয়ারী এলাকার নেতৃত্বে রয়েছে মকবুল গ্রুপ। প্রতিটি গ্রুপ ১০-১২ জন সদস্য রয়েছে। আর প্রত্যেক দলের রয়েছে একাধিক মোটরসাইকেল। ছিনতাই শেষে মালামাল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছে পৌঁছে দিতে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে তারা।

গুলিস্তানের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, শুধু গুলিস্তান পাতাল ও স্টেডিয়াম মার্কেটকে ঘিরেই সক্রিয় রয়েছে অর্ধ শতাধিক চোর ছিনতাইকারী। যাদের অধিকাংশই দেখতে স্মার্ট ও ভদ্র। তাদের দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এরা চোর। এদের ১০-১২ জনের কয়েকটি গ্রুপ এলাকাভিত্তিক মোবাইল চুরি করে। প্রতিটি গ্রুপেই একজন করে নেতা থাকে। চোরাই মার্কেটগুলোর ব্যবসায়ী এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন তারা।

সম্প্রতি যাত্রীবাহী বাসে মোবাইল ছিনতাই হয় পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজারের বাসিন্দা শেখ ফজলে রাব্বীর। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ওই তরুণ দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, জিপিও মোড়ে সিগনালে আটকে ছিল আমাদের বাস। আমি জানালার পাশে বসেছিলাম। দীর্ঘক্ষণ যানজটে আটকে থাকায় বিরক্ত লাগছিল, তাই বসে বসে নেট ব্রাউজ করছিলাম। এমন সময় জানালা দিয়ে আমার মোবাইলটি ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায় এক চোর। শুধু দেখলাম সে রাস্তা পার হচ্ছে, তার পেছনে ছুটতে গিয়ে দেখি সে উধাও। মোবাইলটি আমি কিছুদিন আগেই কিনেছিলাম ২৫ হাজার টাকা দিয়ে। কতটা কষ্ট লেগেছে তা বলে বোঝাতে পারব না।

রমনা ভবনের গার্মেন্ট আইটেমের ব্যবসায়ী সাইদুল ইসলাম খোলা কাগজকে বলেন, এরা যে শুধু বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকেই মোবাইল ছিনতাই করে তা নয়। বিভিন্ন সভা সমাবেশ থেকেও ব্যাগভর্তি মোবাইল চুরি করে। এরপর সেগুলো পাতাল মার্কেটসহ বিভিন্ন মার্কেটে বিক্রি করে। চোরাই মার্কেটের ব্যবসায়ীরা এসব মোবাইল কিনে আইএমইআই নম্বর পরিবর্তন করে তা সুকৌশলে বিক্রি করে দেয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) পল্টন মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক খোলা কাগজকে বলেন, পল্টন-গুলিস্তান এলাকায় যেসব চক্র গণপরিবহনে ছিনতাই-চুরির ঘটনা ঘটায়, তাদের অধিকাংশই মাদকাসক্ত। এই চক্রকে ধরতে আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। গতকালও একজনকে আটক করা হয়েছে। মাদকাসক্ত হওয়ায় তাদের অনেককেই আটক করার পর আমরা রিহ্যাবে পাঠিয়েছি।

চোরাই মোবাইল ক্রয় করে আইএমইআই নাম্বার পরিবর্তনকারী চোরাই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, এসব চোরাই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধেও পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। গত তিনদিন আগেও সিআইডি এই চক্রের বেশ কয়েকজন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করে মামলা করেছে। এসব চক্রের কেউ ছাড় পাবে না।

যেভাবে বদলে ফেলা হয় আইএমইআই নম্বর
চোরাই মোবাইলের আইএমইআই নম্বর পরিবর্তন করার ডিভাইসসহ গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) একটি সংঘবদ্ধ চোরাই সিন্ডিকেটের ১২ সদস্যকে আটক করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

এ বিষয়ে সিআইডির এডিশনাল ডিআইজি শেখ রেজাউল হায়দার বলেন, বিভিন্ন অপরাধী হত্যাসহ ছিনতাই, ডাকাতি করে ব্যবহারকারীর মোবাইল নিয়ে যাওয়ার কারণে আগে তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহজেই অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারত। কিন্তু সংঘবদ্ধ এই চক্রটি মোবাইল ফোনের আইএমইআই পরিবর্তন করার কারণে চাঞ্চল্যকর মামলার রহস্য উদ্ঘাটনসহ প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

আটকদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে শেখ রেজাউল হায়দার বলেন, আটকদের মধ্যে মুরাদ খান ও লাভলু হাসান নামে দুইজন রয়েছেন যারা ঢাকা শহরের বিভিন্ন চোরদের কাছ থেকে চোরাই মোবাইল কিনে নিয়ে তার লক খোলা এবং মোবাইলের আইএমইআই নম্বর পরিবর্তন করার জন্য অনিক, বশির ও মীম টেলিকমের মালিক আব্দুল মালেকের কাছে দিতেন।

অনিক, বশির ও মালেক ত৩ী ডিভাইস ব্যবহার করে মোবাইলের আইএমইআই পরিবর্তন করতেন। এরপর সুনির্দিষ্ট গ্রাহকের কাছে নির্ধারিত মূল্যের কম মূল্যে মোবাইলগুলো বিক্রি করতেন। তাদের কাছ থেকে আইএমইআই পরিবর্তন করা ২৬৫টি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের চোরাই মোবাইল, আইএমইআই পরিবর্তন করার ত৩ী নামের ৯টি ডিভাইস উদ্ধার করা হয়।

চক্রের সদস্যরা এই ডিভাইসগুলো গুলিস্তানের পাতাল মার্কেটের মাসুদ টেলিকম ও কবির টেলিকম থেকে কেনেন বলে জানা গেছে। ডিভাইসগুলো চীন থেকে আনা। মাসুদ এবং কবির টেলিকম অবৈধভাবে ডিভাইসগুলো বাংলাদেশে নিয়ে আসে। আটকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান সিআইডির ওই কর্মকর্তা।