জাতির পিতা আজ আরও শক্তিমান

ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৮ আশ্বিন ১৪২৭

জাতির পিতা আজ আরও শক্তিমান

শাহনেওয়াজ খান ১:৩০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৫, ২০২০

print
জাতির পিতা আজ আরও শক্তিমান

জাতীয় শোকের দিন আজ ১৫ আগস্ট। স্বাধীন বাংলার মানুষের অশ্রুসিক্ত হওয়ার দিন আজ। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সব সদস্যকে ১৯৭৫ সালের এই দিনে একদল বিপথু সেনা সদস্য নির্মমভাবে হত্যা করে। ঘাতকের বুলেটের আঘাতে বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টার বুকের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে তার প্রিয় বাংলার মাটি।

বঙ্গবন্ধু রাজধানী ঢাকায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে নিজ বাসভবনে সপরিবারে বাস করতেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী কর্মকর্তা তার বাড়ি ঘিরে ফেলে হামলা চালায়। তারা নির্দয়ভাবে খুন করে বঙ্গবন্ধুকে। তার পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে হত্যা করে। সেদিন শোকের যে আবহ রচিত হয়েছে তার আগুন জ¦লবে কালান্তরে। আজ সেই দুঃখের দিন, বাংলার অবিসংবাদিত নেতা স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী।

সেই ভোরে ঘাতকের হাতে নিহত হন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, এস বি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, কর্নেল জামিল, সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক। এ ছাড়াও ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনির বাসায় হামলা চালিয়ে শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনিকে হত্যা করে। প্রায় একই সময়ে বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় হামলা চালিয়ে সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা বেবী, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত এবং এক আত্মীয় বেন্টু খানকে হত্যা করা হয়। অত্যন্ত নির্দয় ও নির্মমভাবে এ হত্যাকা- ঘটানো হয়।

এ হামলা থেকে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। এ সময় স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে জার্মানিতে সন্তানসহ অবস্থান করেন শেখ হাসিনা। সেখানে বড় বোনের সঙ্গে শেখ রেহানাও ছিলেন।

ঘাতকের বুলেট বঙ্গবন্ধুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে কিন্তু এই বাংলাদেশের মাটিতে তিনি অমর। তিনি আজ আরও বেশি শক্তিমান। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা তিনি এবং স্থপতিও তিনি। দেশকে স্বাধীন করার মানসে সমগ্র জাতিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি পর্বতের মতো দৃঢ় একটি প্রতিষ্ঠান।

অসাধারণ আদর্শের ধারক তিনি। তার আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছে বাংলার মানুষ। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ দর্শন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনাকে ধারণ করে তিনি গঠন করেছেন স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান।

সংবাদ প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের (বিবিসি) এক জরিপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন। তিনি পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম করেছেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তিনি ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন। সেদিন তিনি বজ্রকণ্ঠে বলেছেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তার এই আহ্বানে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বাংলার মানুষ, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বাঙালি জাতি আজ বীরের জাতি।

স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা বাংলার মাটিতে গণহত্যা চালায়। পাকিস্তানি সেনারা সে রাতেই বঙ্গবন্ধুকে তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তাকে বন্দি করে রাখা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে কারাগারে। বন্দি অবস্থায় মৃত্যু পরোয়ানা মাথার ওপর ঝুললেও স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস করেননি তিনি। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির জয়লাভের পর তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি শাসকরা। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি তার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন।

দেশে ফিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, বাংলার মানুষ কখনো তার ত্যাগ ও অবদানকে ভুলে যাবে না। রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান হওয়া সত্ত্বেও তিনি সরকারি বাসভবনে না থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে তার নিজের বাড়িতেই বাস করতেন।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। তারা চক্রান্ত করেই গেছে। এই চক্রান্ত বাস্তবায়ন করেছে সেনাবাহিনীর বিপথগামী উচ্চাভিলাষী কয়েকজন সদস্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এদিন ভোর রাতে তারা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটিতে হামলা চালায়। হত্যা করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের। বিশ্ব ও মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঘৃণ্য ও নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সেদিন তারা কেবল বঙ্গবন্ধুকেই নয়, তার সঙ্গে বাঙালির হাজার বছরের প্রত্যাশার অর্জন স্বাধীনতার আদর্শতেও হত্যা করতে চেয়েছে। এই হত্যাকা- বাঙালি জাতির জন্য করুণ বিয়োগগাথা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নাম, একটি ইতিহাস। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ছাত্র অবস্থায় তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন সংগ্রামী নেতা। বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ছয় দফার প্রণেতাও ছিলেন তিনি। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু তার দল আওয়ামী লীগকে এ দেশের গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীকে পরিণত করেন। পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে ষাটের দশক থেকে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন।