গণপরিবহনে আগের রূপ নৈরাজ্য হুল্লোড় হয়রানি

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৭ আশ্বিন ১৪২৭

গণপরিবহনে আগের রূপ নৈরাজ্য হুল্লোড় হয়রানি

নিজস্ব প্রতিবেদক ৯:৩৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১২, ২০২০

print
গণপরিবহনে আগের রূপ নৈরাজ্য হুল্লোড় হয়রানি

করোনা বিস্তার রোধে সারা দেশে ৬৬ দিন বন্ধ ছিল গণপরিবহন। দীর্ঘ লকডাউন শেষে গত ৩১ মে থেকে গণপরিবহন চলাচল শুরু এবং ১ জুন থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করতে বলা হয়েছিল প্রজ্ঞাপনে। শর্ত ছিল, সীমিতসংখ্যক যাত্রী নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিচালনা করতে হবে বাস। এ নিয়মে যাত্রীসেবা দিতে গিয়ে পরিবহন মালিকদের ক্ষতি পোষাতে বাস ও মিনিবাসের ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। করোনা সংকটে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে শুরুর দিকে সীমিত যাত্রী বহন এবং স্বাস্থ্যবিধি কিছুটা অনুসরণ করা হয় বাস ও মিনিবাসে।

এরপর ক্রমে যাত্রীর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের মতোই অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন শুরু হয়। কিন্তু বাড়তি ভাড়া আর কমানো হয়নি। রাজধানীসহ দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় ৬০ শতাংশের পরিবর্তে ১০০ শতাংশ অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে।

সর্বত্র বর্ধিত ভাড়া আদায়ে শতভাগ তৎপরতা দেখালেও স্বাস্থ্যবিধিসহ প্রজ্ঞাপনের অন্য সব শর্তের দিকে কিন্তু কোনো ধরনের ভ্রƒক্ষেপ নেই গণপরিবহনগুলোতে।

অবশ্য পূর্ব অভিজ্ঞতার সূত্রে শুরুর দিকেই যাত্রীদের ধারণা ছিল, ভাড়া বেশি নিয়েও প্রজ্ঞাপনের শর্ত মানবেন না পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। শেষমেশ সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। বেশি ভাড়ার বিনিময়ে দুই সিটে একজন বসানোর নিয়ম ভেঙে এখন সিট ভর্তির পর দাঁড় করিয়েও যাত্রী নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ভাড়া না কমিয়ে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গত কয়েক দিনে রাজধানীর ভিআইপি সড়ক, প্রগতি সরণি ও মিরপুর রোডসহ, খুলনা, রাজশাহী, বন্দরনগরী চট্টগ্রামের প্রতিটি রুটেই বেড়েছে যাত্রীর চাপ। অফিস সময়ের আগে ও পরে চাপ বেশি দেখা গেছে। এই সময়ে বাসগুলোর সব সিট যাত্রীতে পূর্ণ থাকে। এরপর দাঁড় করিয়েও নেওয়া হয়েছে যাত্রী। কিন্তু বেশি ভাড়া ঠিকই নেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রাম নগরীর বেশ কয়েকটি রুটে গণপরিবহনে সরকার ঘোষিত ৬০ শতাংশ বেশি ভাড়ার চেয়েও অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হলেও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কোনো ধরনের নিয়ম মানার প্রবণতা চোখে পড়েনি। নগরীর ১ নম্বর রুট কালুরঘাট থেকে কোতোয়ালি মোড় পর্যন্ত হিউম্যান হলারে (মিনিবাস) যাত্রীপ্রতি ভাড়া আগে ১৩ টাকা থাকলেও করোনা পরিস্থিতিতে আদায় করা হচ্ছে ২৫ থেকে ২৬ টাকা। বায়েজিদ বোস্তামী পেট্রল পাম্পের বিপরীত পাশে টেম্পো থেকে নামা এক যাত্রীর কাছ থেকে ১০ টাকা ভাড়া রাখা হলো। দ্বিগুণ টাকা কেন নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে চালক নিস্পৃহ কণ্ঠে বলেন, ‘ভাড়া আগে পাঁচ টাকা ছিল, এখন ১০ টাকা।’

খুলনায় ১২০ টাকার ভাড়া নিচ্ছে ১৫০ টাকা। করোনার আগে ছিল মাত্র ৮০ টাকা। ৬০ শতাংশ বাড়ালেও হয় ১২০ টাকা। সেখানে বাড়তি নিচ্ছে ৩০ টাকা। খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কের পরিবহনে রীতিমতো চলছে ভাড়া ডাকাতির মহোৎসব। প্রতিবাদ করে উল্টো পরিবহন শ্রমিকরা নাজেহাল করছেন যাত্রীদের। কথাগুলো গতকাল বুধবার সকালে ক্ষোভ আর আক্ষেপের সঙ্গে বলছিলেন এ সড়কের নিয়মিত যাত্রী খুলনার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা জোবায়ের মাহফুজ। খুলনা বাস-মিনিবাস কোচ মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বলেন, ভাড়া নৈরাজ্যের বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। সাধারণ মানুষকে বিশেষ করে গরিব মানুষকে জিম্মি করা কোনোভাবেই বাড়তি ভাড়া আদায় মেনে নেওয়া যায় না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। শ্রমিকরা এ বাড়তি ভাড়া আদায় করে নিজেরাই নিয়ে যাচ্ছে। এটা মালিক কিংবা মালিক সমিতি জানে না। শ্রমিকরা নিয়মিত নির্ধারিত ক্যাশও জমা দেয় না। পরিবহনে যাত্রী হয় না বলে।

এদিকে রাজশাহীতে দূরপাল্লার প্রতিটি বাসে অংশ বিশেষ স্বাস্থ্যবিধি মানা হলেও আন্তঃজেলা রুটের বাসগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। আন্তঃজেলা রুটে সেই গাদাগাদি করেই যাত্রী নিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। ভাড়াও দ্বিগুণ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। মহানগরের গৌরহাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে আসা চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী যাত্রী আলমগীর কবীর বলেন, আগে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতে গেটলক ও মহানন্দা বাস সার্ভিসের ভাড়া ছিল ৭০ টাকা।

করোনাকালে সেই ভাড়া বাড়িয়ে করা হয়েছে ১১০ টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১২০ টাকা করে ভাড়া আদায় করা হয় যাত্রীদের কাছ থেকে। অন্যদিকে আগে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ পর্যন্ত ভাড়া ছিল ১১০ টাকা। সেই ভাড়া এখন বাড়িয়ে ১৫৫ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। এর ওপর যেতে যেতে সিটের বাইরেও লোকজন তোলা হচ্ছে দেদার! এখন যে স্বাস্থ্যবিধির কথা বলে এই বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে সেই স্বাস্থ্যবিধিই যদি না মানা হয় তাহলে বাড়তি ভাড়া কেন নেওয়া হচ্ছে প্রশ্ন রাখেন তিনি।

আর রাজধানী ঢাকার অবস্থাও প্রায় একই। উত্তরা থেকে এয়ারপোর্ট হয়ে কুড়িল বিশ^রোডে আসা বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় ভাড়া একবার বাড়লে তা আর কমে না। করোনার সময় যাত্রী কম ছিল, বাসে স্যানিটাইজারও দেওয়া হতো। কিন্তু এখন কিছুই নেই। দাঁড় করিয়ে যাত্রী এনেছে, এর পরও বিকাশ পরিবহনের বাসটি ১০ টাকার বদলে ১৬ টাকা ভাড়া নিয়েছে। আগের মতো স্বাভাবিক রেটে ভাড়া দিতে চাইলে কন্ডাক্টর-হেলপারদের হাতে অপমান-অপদস্থ হতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। আগের রেটে ভাড়া দিতে চাইলে গালাগাল করা ছাড়াও আপত্তিকর মন্তব্যসহ যাত্রীকে বাস থেকে নামিয়ে দিতে তৎপর হয় কন্ডাক্টর-হেলপাররা।

রামপুরা এলাকায় অনাবিল পরিবহনের একটি বাস থেকে নামা যাত্রী সবুজ মিয়া বলেন, বাসের লোকজনের নেচার খারাপ। বেশি ভাড়া নিব, কিছু কওয়াও যাইব না। কইতে গেলে গালিগালাজ করে। আর প্যাসেঞ্জারের মধ্যে কোনো মিল নেই। মিল থাকলে এগুলা করতে পারতো না।

এ ব্যাপারে বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, নিয়ম অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া সব বিভাগীয় কমিশনারকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কঠোর হওয়ার জন্য। প্রতিদিন বহু মামলা করছেন ম্যাজিস্ট্রেটরা। এর পরও অভিযোগ আসছে। তবে আমরা আরও কঠোরতা অবলম্বন করব। ৬০ শতাংশ ভাড়া রহিত করার বিষয়ে এখনো আলোচনা হয়নি।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে গণপরিবহনে সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি আদায় করছে। এ বিষয়ে বিআরটিএর পক্ষ থেকে নজরদারি ও শাস্তি নিশ্চিত হওয়া জরুরি।