‘পার্টটাইমের’ লাগাম টানা হচ্ছে শিক্ষক-কর্তাদের

ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৭ আশ্বিন ১৪২৭

‘পার্টটাইমের’ লাগাম টানা হচ্ছে শিক্ষক-কর্তাদের

তোফাজ্জল হোসেন ৯:১৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১২, ২০২০

print
‘পার্টটাইমের’ লাগাম টানা হচ্ছে শিক্ষক-কর্তাদের

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বেসরকারি টেলিভিশনের টকশো সঞ্চালনা থেকে শুরু করে নিউজ প্রেজেন্টিং, অফিসের নিয়মিত মিটিং-এ অংশগ্রহণ, অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা পর্যন্ত করেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন এনজিও, বেসরকারি ফার্মের কনসালট্যান্সি করছেন নিয়মিত। এসব ‘পার্টটাইম’ চাকরিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অনুমতি নেই। ফলে শিক্ষকরা যে যার মতো কাজের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা, গবেষণায় কোনো মনোযোগ নেই। আইনের কারণে ‘হাত বাঁধা’র মতো অবস্থা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। স্বায়ত্তশাসিত বা নিজস্ব আইনে চলায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কিছু করতে পারে না। এ অবস্থায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের লাগাম টানা হচ্ছে।

গত রোববার এ-সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করেছে ইউজিসি। একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা দেশের ৪৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক-কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা তার নিয়োগ দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিবিধি/প্রবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ ও প্রতিপালন করতে হবে। প্রবিধি অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারী যথাযথ কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে অন্য কোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগতভাবে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা বা কোনো ধরনের লাভজনক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকতে পারেন না। এর ব্যতয় হলে স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। ইউজিসির পরিচালক (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট) মো. কামাল হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে আরও বেশ কিছু নির্দেশনা রয়েছে। 

শুধু শিক্ষক নয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। রাজধানীর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সেকশন অফিসার সরবরাহ লাইসেন্স করে সরকারি হাসপাতালে ঠিকাদারি কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। প্রতিষ্ঠানের নাম ভিন্ন হলেও লাইসেন্স তার নামে। ছাত্রজীবনে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না। করোনার সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমতি না দিয়ে চীনে যান। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কাজকর্ম শুরু হলেও তিনি অফিসে অনিয়মিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) নকল মাস্ক সরবরাহ করায় সম্প্রতি গ্রেফতার হয়ে জেলে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি রেজিস্ট্রার শারমিন জাহান। শিক্ষা ছুটিতে থেকে থাকায় অবস্থায় নিজের নামে গড়ে তোলেন অপরাজিতা ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

ঢাবি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ব্যবসা করায় গড়ে তোলায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক এই ছাত্রলীগ নেত্রী ক্ষমতার দাপটে কাউকে পাত্ত দিতেন না। শুধু শারমিন বা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই সেকশন কর্মকর্তা নয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে নিজের নামে ব্যবসা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পার্টটাইম চাকরি, এনজিওতে চাকরি, কখনও নিজের নামে এনজিও গড়ে তোলা, ঠিকাদারি, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, অনলাইনে ব্যবসা, ঢাকা বাইরে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা, এমনকি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারী। একই দৃশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরাও। তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস নিচ্ছে দেদারছে। কেউ কেউ মিডিয়া হাউসে নিয়মিত চাকরি পর্যন্ত নিয়েছেন। দেশি-বিদেশি এনজিও ছাড়াও দেশের বিভিন্ন ফার্মে কনসালট্যান্সি করেছেন শিক্ষকরা। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার দিকে যেমন নজর কম তেমননি বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করছেন।

এ ব্যাপারে ইউজিসির পরিচালক (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট) মো. কামাল হোসেন বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরি প্রবিধি অমান্য করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। এটাই আমরা স্পষ্ট করে সার্র্কুলার দিয়েছি। শুধু কর্মকর্তা নয়, শিক্ষকরা একই ধরনের কাজ করছেন। এক্ষেত্রে কমিশনের বক্তব্য হলো, শিক্ষকরা যা করবেন তা অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি নিয়ে করতে হবে। এর বাইরে কিছু হলে উপাচার্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।
ইউজিসিও ওই নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলোর পরিচালন ও উন্নয়ন খাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চাহিদা মতো প্রতি অর্থবছরে সরকার অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে গবেষণা কার্যক্রম অন্যতম বিধায় কমিশন গবেষণা কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এ খাতে অর্থ বরাদ্দ প্রদান করে থাকে।

গবেষণা খাতের অর্থ গবেষণা কার্যক্রমে ব্যয় করার নিয়ম থাকলেও কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে। এ বিষয়টিও কমিশনের দৃষ্টিতে এসেছে। গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত সমুদয় অর্থ শুধু নির্বাচিত গবেষণা প্রকল্পের কার্যক্রমে ব্যয়ের নিশ্চয়তা বিধানের অনুরোধ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সরকার ও দাতা সংস্থা যৌথ অর্থায়নে উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নে যেসব প্রকল্প চলছে তাতে এক ধরনের হরিলট চলছে। প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভিসির ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, অনুদান প্রকল্প থেকে নেওয়া, এমনকি ভিসির দেশ বিদেশে যাতায়াত খরচ এসব প্রকল্পে থেকে সংকুলনা করা হয়। এসব খরচ অনুমোদন দিতে পরবর্তীতে ভিসি প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের চাপ তৈরি করেন। এমন অভিযোগ ইউজিসির কাছে রয়েছে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তা ব্যক্তি বা প্রভাবশালী শিক্ষকরা বিভিন্ন ওয়ার্কশপ সেমিনারে অনুপস্থিত থেকেও নিজের সম্মানি নেন।

একই দিনের সার্কুলারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি এবং লেখাপড়ায় মুক্তিযোদ্ধা ও দরিদ্র-মেধাবী কোটায় অনিয়ম বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং ৩ শতাংশ অসচ্ছল দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের বিনাবেতনে পাঠদান নিশ্চিতে ইউজিসি নির্দেশনা থাকলেও বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৬ ভাগ বিনাবেতনে অধ্যয়নের সুযোগ দিচ্ছে না। যা আইনের চরম ব্যত্যয় বলে জাননো হয়। বিনাবেতনে পড়ানোর ক্ষেত্রে আইন না মানলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইউজিসি।

অভিযোগ রয়েছে, যেসব বিশ্ববিদ্যালয় এ ৬ শতাংশ পূর্ণ দেখাচ্ছে সেগুলোর ট্রাস্টি বোর্ড নিজ আত্মীয়স্বজনের সন্তানকে দরিদ্র দেখিয়ে বিনামূল্যে পড়াছেন। আবার বিভিন্ন শর্ত জুড়ে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ভর্তিকৃত শিক্ষাার্থীদের বিনাবেতনে অধ্যয়ন থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ইউজিসি বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা নিজস্ব শর্তজুড়ে নিয়ে তথ্য লুকিয়ে শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করছে।