ক্রসফায়ারের নিরাপদ স্পট মেরিন ড্রাইভ সড়ক

ঢাকা, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১১ আশ্বিন ১৪২৭

ক্রসফায়ারের নিরাপদ স্পট মেরিন ড্রাইভ সড়ক

মো. নেজাম উদ্দিন, কক্সবাজার ৯:৪৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৮, ২০২০

print
ক্রসফায়ারের নিরাপদ স্পট মেরিন ড্রাইভ সড়ক

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হচ্ছে টেকনাফে পুলিশের হাতে মেজর সিনহা খুন হওয়া। মেজর সিনহা খুন হওয়ার পর থেকে সর্বমহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। তবে মেজর সিনহা খুন হওয়ার পর বিগত দিনে ঘটে যাওয়া ক্রসফায়ার আদৌ ক্রসফায়ার হয়েছিল কি-না জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছে ইয়াবাকে পুঁজি করে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ইয়াবা কারবারিদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা না পেলে তাদের ক্রসফায়ারের নামে খুন করত। আর এই খুন করার জন্য নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হতো পর্যটন এলাকার মেরিন ড্রাইভ সড়ক। এতে যেমন এলাকাবাসী আতঙ্কিত ছিল ঠিক তেমনি পর্যটকরা মেরিন ড্রাইভে যেতে ভয় পেত।

মেরিন ড্রাইভ পর্যটন শহর কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ জায়গা। এখানে একপাশে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে উত্তাল ঢেউ ও সৌন্দর্যমণ্ডিত গাছের সারি। আরেক দিকে উঁচু পাহাড়ের হাতছানি ঘিরে স্বপ্নের মেরিন ড্রাইভ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্পের ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগ অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পর্যটকদের জন্য বাস্তবায়ন করেছে।

সেই স্বপ্নের মেরিন ড্রাইভ কিছুদিনের মধ্যে পরিণত হয় আতঙ্কের ‘ক্রসফায়ারের’ নিরাপদ এলাকা হিসেবে। পুলিশ ও র‌্যাবের হাতে মেরিন ড্রাইভে এত ব্যাপকহারে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে যে মেরিন ড্রাইভ এখন যেন ‘রোড টু ডেথ’-এর সমার্থক হয়ে উঠেছে সকলের কাছে। গত দুই বছরে শুধু মেরিন ড্রাইভেই অর্ধশতাধিক ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা ঘটেছে।

অনেকে বলছেন টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ চালু করেন মেরিন ড্রাইভে ‘ক্রসফায়ারের’ এই প্রচলন। অবশ্য এর আগে ২০১৭ সালে টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামের ‘ক্রসফায়ারে’ ঘটনাটি মেরিন ড্রাইভে হয়েছিল।

এদিকে ২০১৮ সালের ১৯ অক্টোবর টেকনাফ থানায় যোগ দেন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। তার যোগদানের পরপরই স্বপ্নের সেই মেরিন ড্রাইভ সড়ক পরিণত হয় ‘ক্রসফায়ারের’ আতঙ্কময় এলাকা হিসেবে।

দুই বছরে এ সড়কে ক্রসফায়ারে শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। মাদক নির্মূলের নামে ক্রসফায়ারে মানুষ হত্যা করা ছিল ওই এলাকায় নিত্যদিনের ঘটনা। এই উন্মাদনা থেকে বাঁচতে পারেননি মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানও। এই ঘটনায় আদালতের নির্দেশমতে গত বুধবার রাতে ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলীকে প্রধান আসামি ও ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে ২নং আসামি করে ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা রেকর্ড হয়েছে।

গত ২২ মাসে টেকনাফে ১৪৪টি ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২০৪ জন মারা গেছেন। তাদের অর্ধেকের বেশি লাশ পড়েছিল মেরিন ড্রাইভে। যারা মারা গেছেন তাদের পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। যাকে ক্রসফায়ার করা হতো তাকে ১০ থেকে ১২ দিন থানা হাজতে রাখা হতো। আবার মাসের পর মাস থানা হাজতে রাখার ঘটনাও রয়েছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন- এ সময় ক্রসফায়ারে না দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ওই ব্যক্তির পরিবার-পরিজনের কাছ থেকে আদায় করা হতো লাখ লাখ টাকা। তবে শেষ সম্বলটুকু দিয়েও বাঁচতে পারেননি অনেকেই।

এদিকে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফ থানা বিভিন্ন সময় অভিযানে গত ২২ মাসে মাদকবিরোধী এ সমস্ত অভিযানের ঘটনাস্থল থেকে ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ৩৮০ পিস ইয়াবা, ৪৩১টি দেশি-বিদেশি অস্ত্র, ১৪০৩ রাউন্ড তাজা গুলি, ৭টি ম্যাগজিন, ১৯টি ধারালো কিরিচ, চোলাই ও বিদেশি মদ ৪০৩ লিটার, ৫৯ লাখ ২৮ হাজার ৪শ’ মাদক বিক্রির নগদ টাকা, ১৭ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার এবং ১৯৬৮ জন অপরাধীকে আটক করে। আসামিদের বিরুদ্ধে মাদক আইনে ৯২৪টি মামলা দায়ের করা হয়। মাদক পাচারে ব্যবহার হওয়া মোটরসাইকেল, সিএনজি, যাত্রীবাহী ১৮টি গাড়ি জব্দ করা হয়।

ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে উঠে আসা সব অপকর্ম সম্পর্কে জানতে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেনের সরকারি মুঠোফোনে কল করা হয়। তিনি ফোন না ধরায় বক্তব্য জানা যায়নি।