বনভূমি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন

ঢাকা, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৪ আশ্বিন ১৪২৭

বনভূমি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন

তানজেরুল ইসলাম ১০:১৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৭, ২০২০

print
বনভূমি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হাবিবুন নাহার। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের আসন নং-৯৭ বাগেরহাট-৩ (রামপাল-মোংলা) থেকে নির্বাচিত সংসদ। একাদশ সংসদে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। দেশব্যাপী প্রকৃতিপ্রেমী হিসেবে খ্যাতি পাওয়া হাবিবুন নাহার যশোর শিক্ষাবোর্ডে মাধ্যমিকে ষষ্ঠ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ১১তম স্থান অধিকার করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে লেখাপড়া করেন। তার স্বামী মো. তালুকদার আবদুল খালেক বর্তমানে খুলনা সিটি করপোরেশন মেয়র।

দেশের অপার সম্ভাবনাময় নৈস্বর্গিক বনাঞ্চলে কর্মরত কর্মকর্তা এবং স্টাফদের সাফল্য এবং দুর্ভোগ লাঘবে সরকারি বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন দৈনিক খোলা কাগজের সঙ্গে। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- তানজেরুল ইসলাম।

ভূমি সংস্কার বোর্ড ঢাকা সাভার এবং গাজীপুরে গেজেটভুক্ত বনভূমি লিজ দিয়েছে। লিজ গ্রহীতারা বন বিভাগের কর্মরতদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালাচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকা বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক সাজেদুল আলমকে কুপিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ভূমি মন্ত্রণালয়ের লিজকা- এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মরতদের জান ও সরকারি মাল রক্ষায় মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা-

শুধু লিজ দিলেই যে বনভূমি দখল হয় তা কিন্তু নয়। বনের জমি যে যেভাবে পাও নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা আছে। উচ্চপদস্থ এবং প্রভাবশালী অনেকেই বনভূমি দখল করেছেন। অনেকেই দখলের চেষ্টা চালাচ্ছেন। আর সাধারণ ভূমিদস্যুদের তো কথাই নেই। যেমন নদী দখল হচ্ছে, রেলওয়ের জমি দখল হচ্ছে তেমনি বনভূমিও দখল হচ্ছে। আমাদের অনেকের স্বভাব হয়ে গেছে ‘খাই, খাই। সরকারি জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলে ভূমিদস্যুদের মাথা নষ্ট হয়ে যায়। সেই জমি দখলের পায়তারা শুরু হয়ে যায়। অনেকের চরিত্রই এমন হয়ে গেছে। এসব লোলুপ দৃষ্টির মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। সারা দেশেই বনাঞ্চল। কত জায়গায় বাধা দেওয়া সম্ভব? সম্প্রতি সম্পন্ন স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় আমি বনভূমি লিজ বন্ধে কথা বলেছি। আমিও চাই, ‘বন বিভাগে কর্মরতদের ওপর হামলাকারীদের কঠোর সাজা হোক।’

মাঠপর্যায়ে একজন রেঞ্জ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে হচ্ছে। বিশেষ করে, ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা আছে এমন জেলাগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে। নিরসনে সেইসব জেলাগুলোতে ‘স্টেট কর্মকর্তা’ নিয়োগ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধান বন সংরক্ষক। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য-

স্টেট কর্মকর্তার প্রয়োজন আছে। এতে কাজের গতি বাড়বে। তবে যখন যেই দল ক্ষমতায় আসে, সরকারি জমি দখলের ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বনের চিত্র দেখা যায়। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে বৃহত্তর ময়মনসিংহে বিশাল আয়তনের বনভূমি প্রভাবশালীদের দখলে চলে যায়। আমাদের সরকারের আমলে যে দখল হয়নি তা কিন্তু নয়। সারা দেশেই বন বিভাগের কার্যক্রম চলছে। এই কারণে বন বিভাগের বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে অভিযোগ ওঠে। একটি পরিবারের সব সন্তান তো একই রকম হয় না।

মাঠপর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশি অসহযোগিতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। উত্তরণে মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা-

মাঠপর্যায়ে জরুবি সব প্রয়োজনে জেলা প্রশাসন এবং পুলিশকে পাশে পায় না বন বিভাগ-এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এটি বহুবছরের সমস্যা। আমি দায়িত্ব পেয়েছি ২০১৯ সালে। এর আগে শরণখোলায় বিশাল আয়তনের অভয়ারণ্য মানুষকে লিজ দেওয়া হয়। দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্প ওই অভয়ারণ্যতে। আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে শুধু অনুমোদন করা হয়। তবে বাস্তব চিত্র যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হতো তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস তিনি কখনো ওই কাজে সহায়তা করতেন না। তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসানকে আমি অভিনন্দন জানাই। তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন, বাধা দিয়েছিলেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এমন না যে তিনি একদিকে বলবেন বন রক্ষা করো অন্যদিকে বনে আশ্রয়ণ কেন্দ্র দিবেন। বর্তমানে ওই বনভূমি কারো দখলে যায়নি। বন বিভাগ ওই বনভূমি এখনো কাজে লাগাতে পারেনি।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের রক্ষা কবচ ‘সুন্দরবন’ রক্ষায় মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা-
সম্প্রতি স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় আমি বলেছি, ‘যেসব বনভূমি দখল হয়ে গেছে, সেসব বনভূমি আমরা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। তবে যেসব বনভূমি দখল হতে যাচ্ছে যেসব বনভূমি কি শুধুমাত্র বন বিভাগ একাই রক্ষা করতে পারবে।’ সুন্দরবনের ভেতরে নৌবাহিনী ‘রিসোর্ট মার্কা’ কেন্দ্র বানিয়েছে। সরকারের এতো রাজস্বের দরকার নেই যে সুন্দরবন ধ্বংস করে রাজস্ব আদায় করতে হবে। এখন তাদের দেখাদেখি অনেকেই রিসোর্ট বানাতে চাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার জায়গা বাছাই করছেন, পরিকল্পনাও করছেন। বাইরের বন যেমন সুরক্ষিত নয় তেমনি সুন্দরবন। সুন্দরবন থেকে কিভাবে হরিণ পাচার করতে হয় তা অভিজ্ঞরা জানেন। কিভাবে বিষ প্রয়োগ করতে হয় সেটাও অভিজ্ঞরা জানেন। বন বিভাগের কেউ যদি সহযোগিতা না করে তবে সুন্দরবনে এসব অপকর্ম করা সম্ভব নয়। সুন্দরবন রক্ষা করতেই হবে। সুন্দরবন থেকে লোলুপ দৃষ্টি সরাতে হবে। সুন্দরবন রক্ষায় সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

বন বিভাগে জনবল সংকট দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন পদে পদোন্নতিতে দেখা দিয়েছে বহুমুখী প্রতিবন্ধকতা। ফরেস্ট গার্ড থেকে ফরেস্টার, ফরেস্টার থেকে রেঞ্জ কর্মকর্তা এবং রেঞ্জ কর্মকর্তা থেকে সহকারী বন সংরক্ষক পদে পদোন্নতিতে জটিলতা দীর্ঘদিনের। অথচ বন বিভাগ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা দেয়। এসব জটিলতা থেকে উত্তরণে মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কি?

আপনি তো বলছেন জনবল সংকট। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ‘বনে এত জনবল দিয়ে কি হবে। শুধু কারি কারি টাকা নষ্ট।’ যারা এমন মন্তব্য করেন তারা দেশের বিশাল আয়তনের বনাঞ্চলের সীমানার কথা ভেবে দেখেন না। যেমন আয়তন, তেমন কার্যক্রমে তো জনবল প্রয়োজন হবেই। ইতোমধ্যে জনবল নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে মহামারি করোনার কারণে বিলম্ব হচ্ছে। এরপরও কিছু জনবল নিয়োগ হয়েছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে বন বিভাগে একই পদে কর্মরত আছেন তাদের ব্যাপারে আমার চিন্তাধারা ভিন্ন ধরনের। আমিও চাই যোগ্য এবং অভিজ্ঞরা পদোন্নতি পাক। তবে দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করছেন এমন কেউ কেউ বন কব্জায় রাখার কৌশল জানেন। দুর্নীতি করেন। বন যেমন ভোগের জিনিস নয় তেমনি সবাই খারাপ না। আমি চাই নতুনদের প্রশিক্ষিত করে বনের দায়িত্ব দেওয়া হোক। বনভূমি রক্ষা করতে হবে আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের জন্য।

দুর্গম এলাকায় কর্মরতদের নৌ অ্যাম্বুলেন্সের দাবি দীর্ঘদিনের। এ ব্যাপারে আপনার পরিকল্পনা-
ফেন্ডশিপ এনজিওর পক্ষ থেকে নৌ অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হবে। এই ব্যাপারে ওই এনজি’র সঙ্গে আলাপ হয়েছে।

বন বিভাগে মাঠ পর্যায়ে কর্মরতদের ঝুঁকি ভাতার দাবি দীর্ঘদিনের। এই ব্যাপারে আপনার পরিকল্পনা-
বুলবুলের সময় যখন তিন নম্বর সতর্ক সংকেত তখন আমি সুন্দরবনের ভেতর। সাত নম্বর সতর্ক সংকেতের সময় আমি বের হয়ে এসেছি। আমি স্বচক্ষে দেখেছি এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাঠ পর্যায়ে কর্মরতরা কিভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। ভাঙা বেড়ার ঘর। ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যায়। এমন দুর্গম যে ডাকাতরাও বন বিভাগের লোকজনদের ওপর হামলা করে না। যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত আছেন, বনভূমি রক্ষা করছেন, আমি চাই তাদের ঝুঁকি ভাতা দিয়ে মূল্যায়ন করা হোক।

বন অধিদফতরের প্রধান বন সংরক্ষকের ব্যাপারে আপনার প্রত্যাশা-

বর্তমান প্রধান বন সংরক্ষক সুন্দরবনে সাত বছর কাটিয়েছেন। শুধু সুন্দরবন নয়। দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চলে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ওয়াইল্ড লাইফ বিষয়ে ভারতে প্রশিক্ষণে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। শুধু আমি নই। মন্ত্রী মহোদয় নিজেও চেয়েছেন তারুণ্য নির্ভার আমির হোসেন চৌধুরী প্রধান বন সংরক্ষকের দায়িত্বে আসুক। তাকে যদি দীর্ঘদিন রাখা যায় তবে বন অধিদফতরে একটা বিশাল পরিবর্তন হবে। তার ব্যাপারে আমি আশাবাদী। এছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে কতদিন এই দায়িত্বে রাখবেন জানি না। যতদিন আছি সরকারের সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে কাজ করে যাবো। আমি মনে করি, ‘বনাঞ্চল তথা সুন্দরবন আমার সন্তান।’ দেশের বনাঞ্চল রক্ষায় আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।

দৈনিক খোলা কাগজকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
দৈনিক খোলা কাগজকেও ধন্যবাদ।