করোনা ভেঙেছে খামারির স্বপ্ন

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৯ আশ্বিন ১৪২৭

করোনা ভেঙেছে খামারির স্বপ্ন

জাফর আহমদ ৯:৫৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৬, ২০২০

print
করোনা ভেঙেছে খামারির স্বপ্ন

ঈদ ও করোনাভাইরাস গবাদি ডেইরি ফার্ম এবং ব্যক্তিপর্যায়ে গরু পালনকারীদের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে। সারা বছর গরু পালন করে ঈদুল আজহায় বিক্রি করে খরচ তোলার লক্ষ্য ছিল। চার মাস ধরে করোনার উপর্যুপরি আঘাত আর ঈদে গবাদি পশু ন্যায্য দামে বিক্রি করতে না পারায় বড় লোকশান গুনতে হলো খামারিদের। গত কয়েক বছরে দেশি খামারগুলো বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ে খামার বৃদ্ধির হার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। দেশে বর্তমান খামারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ। এসব খামারে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে গরু-ছাগল-ভেড়া-মহিষ মিলে এক কোটি ১৯ লাখ পশু প্রস্তুত ছিল। এর বাইরে ছিল ব্যক্তি পর্যায়ে গরু-ছাগল। পল্লী অঞ্চলে কৃষক ও প্রান্তিক মানুষ গরু পালন করেন। এ হারও কম নয়। এসব খামার ও ব্যক্তিপর্যায়ে গবাদি পশু পালনে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে। 

দুগ্ধ উৎপাদনের বাইরে পুরোটাই প্রায় কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে। সারা বছর গরু-ছাগল পালন করে কোরবানির ঈদের আগে বিক্রি করে। কিন্তু এবার ঈদে গরু বিক্রি করে সঠিক মূল্য না পাওয়ার কারণে গবাদি পশু খামার ও ব্যক্তিপর্যায়ে গবাদি পশু পালনকারীরা সর্বশ্বান্ত হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত এক বছরে গবাদি পশুর খাদ্যের দাম বেড়েছিল ১৫ থেকে ধরন ভেদে ২০ শতাংশ। অন্য সময় কোরবানির ঈদ ও সারা বছর ধরে ভারত এবং মিয়ানমার থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ গরু আসত। মার্চে করোনার কারণে পুরো দেশ লকডাউনে চলে গেলে দেশের এসব ফার্মের গরু ও দুধ বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু খরচ অব্যাহত থাকে।

এরপর করোনার কারণে ঘোষিত ছুটি সিথিল হলে উৎপাদন, বিপণন, যোগাযোগ ব্যবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে বিক্রি শুরু হয়। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি। তারপর লক্ষ্য ছিল কোরবানির ঈদ। ঈদে বেচাকেনা করতে পারলে লোকশান পুষিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু ঈদে গরু বিক্রি করে দাম না পাওয়ায় ক্ষতটা আরও গভীর হয়। বছরের অধিক সময় ধরে পশুর পেছনে খরচ করে ঈদের আগে বিক্রি করে লোকশান গুনতে হয়েছে। বছর ধরে বিনিয়োগ করে অর্ধেক টাকা ওঠেনি। ব্যাংক ঋণ শোধ করে আবার ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করবে নাকি অন্য কোনো ব্যবসা শুরু করবে তা নিয়ে হিসাব-নিকাশ করছে।

দাম কমের কারণে এবার যশোরের নয়ন এগো ফার্মের মালিক রইসউদ্দিন ১০টি গরু বিক্রির জন্য বাজারে তুলেছিলেন। বাজারে তোলার মতো তার ফার্মে আরও কমপক্ষে ১০টি গরু রয়ে গেছে। দাম না পাওয়ার অনিশ্চয়তায় সব গরু বাজারে তোলেননি। অর্ধেক গরু বিক্রি করে জরুরি খরচগুলো মিটিয়েছেন। তার এখনো রয়ে গেছে ব্যাংক ঋণ। রইসউদ্দিন বলেন, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গরুর দাম পাওয়া যাবে না, সে পর্যন্ত পালন করতে হবে। এতটা সময় গরু পালনের জন্য যে খরচের প্রয়োজন হয়, তা কোনোভাবেই চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে মাঝপথে হয়তো নামমাত্র দামে গরু বিক্রি করে দিতে হবে। তখন পুঁজির অবশিষ্টটুকুও হারাতে হতে পারে।

রইসউদ্দিনের মাঝারি ফার্মের মতো ভালো নেই বড় ফার্মগুলোও। সেখানে ব্যাংকের কিস্তি আপাতত ফেরত না দিতে হলেও বাড়ছে সুদের বোঝা। কর্মচারীর বেতন ও পশু পালনের জন্য ঠিকই খরচ করতে হয়েছে। কিন্তু কোরবানিতে দাম না পেয়ে ভেঙে পড়েছেন তারা। এ অবস্থায় নতুন করে আবার গরু বাড়াবে-করোনার মধ্যে কোনো উদ্যোক্তাই ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। ফলে আগামী ঈদকে কেন্দ্র গরু পালন শুরু হবে সে সাহস মনোবল ও পুঁজি দুটিই হুমকিতে পড়লো। পল্লী অঞ্চলে খামারের বাইরে কৃষক ও ব্যক্তিপর্যায়ে গবাদি পশু পালন হয়ে থাকে।

দারিদ্র্য দূরীকরণে ভূমিকা রাখে এসব গবাদি পশুপালন। অন্য পেশার পাশাপাশি এসব গরু পালিত হয়। এনজিও বা নিজস্ব উদ্যোগে এসব পশু ক্রয় করে পালন করে। কোরবানির ঈদের আগে বিক্রি করে সংসারের বড় ধরনের কাজ করে থাকে। এবার কোরবানির ঈদে গরুর দাম না পেয়ে সর্বশ্বান্ত হয়েছে এসব প্রান্তিক মানুষ। যে গবাদি পশুপালন এতদিনে ধরে দারিদ্র্য দূরীকরণে ভূমিকা রেখে আসছিল, কোরবানির ঈদের আগে দাম না পাওয়ায় সে গবাদি পশু আপদে পরিণত হয়েছে। এনজিওর কাছে থেকে ঋণ নিয়ে বা ধারদেনা করে পশু ক্রয় ও পালন করে বিক্রি করে দাম না পেয়ে এখন মানুষ দিশাহারা।

নাটোরের লালপুর উপজেলার নবী হোসেন এমন একজন গরু পালনকারী। পরিবারের এটা-ওটা বিক্রি ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে থেকে ধারদেনা করে করে এক বছর আগে ৩০ হাজার টাকায় একটি গরু কিনেছিলেন। দিনমজুরি করার পাশাপাশি নিজে ঘাস কেটে সন্তানআদরে গরুটি পালন করেছিলেন। আশা ছিল কোরবানির ঈদের আগে বিক্রি করে ঋণ শোধ করার পাশাপাশি নিজের টাকায় আরও একটি ছোট্ট গরু কিনে পালন করবেন। কিন্তু করোনার কারণে দাম হবে না ভেবে ঈদের পাঁচদিন আগে বিক্রি করে দিয়েছেন, ন্যায্য দাম পাননি। ধারদেনা শোধ করতেই তার টাকা শেষ।

দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আমিষের চাহিদা পূরণ ও বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করছে এ খাত। কিন্তু করোনা অতিমারিতে বিপর্যস্ত এ খাতের পাশে ব্যাংক নেই। সরকার এসব চাষির জন্য ৪ শতাংশ হারে পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল ঘোষণা করলেও ছোট-বড় ও প্রান্তিক গরুপালনকারীর ভাগ্যে তা জুটছে না। খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রই জানিয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের কৃষি ব্যাংক ছাড়া কোনো ব্যাংক আগ্রহ দেখাচ্ছে না। দুয়েকজন ব্যাংকের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খোলা কাগজকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক গবাদি পশু পালনের জন্য তহবিল ঘোষণা করেছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল। ৪৩টি ব্যাংক এ তহবিল বিতরণের জন্য বাংলাদেশ, ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। ফসল উৎপাদনেও অনুরূপ তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো গ্রাহক ব্যাংকে ঋণ না পেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট অভিযোগ কেন্দ্রে অভিযোগ করলে আমরা সেই ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। তবে কম সুদেও সরকারের এ তহবিল বিতরণে ব্যাংকগুলো অনাগ্রহ দেখাচ্ছে বলে স্বীকার করেন এ কমকর্তা।