তার আর্তনাদ এখনো তাড়া করে আমায়

ঢাকা, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৪ আশ্বিন ১৪২৭

খুব কাছ থেকে দেখা শেখ কামাল (২)

তার আর্তনাদ এখনো তাড়া করে আমায়

বদরুল আলম চৌধুরী ৯:৩৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৬, ২০২০

print
তার আর্তনাদ এখনো তাড়া করে আমায়

আমি ছাত্রলীগ করতাম। সে হিসেবে আমার বাসা ছিল ধানমন্ডিতে, তাজউদ্দিন সাহেবের বাসার কাছে। অর্থাৎ আবাহনী ক্লাবের পাশেই। আমরা প্রায় দেখতাম বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দিন সাহেবকে উঠাত আবার বিকালে নামিয়ে দিয়ে যেতেন। এভাবে সম্পর্কটা আরেকটু ঘনিষ্ট হল। তো ১৯৬৭ সালের কথা। আমরা তখন আবাহনী মাঠ নিয়ে আন্দোলন করছি।

একদিন বঙ্গবন্ধু এবং তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মর্নিং ওয়ার্ক করছিলেন। ছাত্র রাজনীতি করতাম বলে আমায় চিনতেন বঙ্গবন্ধু। আবাহনী মাঠে তখন ইট পাথর ছিল। আমাকে দেখে বলল যে, আমাকে আবার নোয়াখাইল্লা বলে ডাকত। আর ছাত্র রাজনীতি করতাম বলে বঙ্গবন্ধু আমাকে চিনতেন। 

আমাকে ডেকে বললেন- ‘তোদের এখানে তো দেখতেছি পরিবেশ একটু ভালো, তো ধানমন্ডি ক্লাবে কামাল থাকে, ওখানে তো মাইর পিট হচ্ছে, কামালকে বলবো যে তোদের এখানে চলে আসতে।

তোরা আরও একটু সংঘবদ্ধ হয়ে মোহাম্মদপুরে নন-বেঙ্গলিদের প্রতিহত কর। নন-বেঙ্গলিরা লালমাটিয়ায় যেই বাঙালি পরিবারগুলো থাকে, তাদের মাঝে মাঝে আক্রমণ করে। তোরা যদি একত্রিত থাকিস, তাহলে মাঝে মাঝে তাদেরকে প্রতিহত করতে পারিস।’

তো উনি মনে হয় কামালকে গিয়ে বাসায় বলল, কামাল বিকালেই আমাদের সঙ্গে দেখা করল। তো আমরা কামাল সম্পর্কে একটু ফ্রি-হার্ট ছিলাম। কিন্তু কামাল আইসা শুধু খেলাধুলা ছাড়া আর কোন কথা নাই। খেলার যে সমস্ত চিন্তা, ধারণা, দূরদর্শিতা, পরিকল্পনা বলল তাতে আমরা সকলে থো খাইয়া গেলাম।

শেখ কামালের সঙ্গে সেদিনই প্রথম পরিচয় এবং সেদিনই তিনি আমাদের সবাইকে মোহচ্ছন্ন করে তুললেন খেলাধুলা নিয়ে তার ধ্যান-ধারণা, চিন্তাগুলো প্রকাশ করে। তার বিভিন্ন কথা শুনে আমরা বিমোহিত হয়ে গেলাম। দেশের খেলাধুলার মান কী, কীভাবে উন্নতি করা যায় এগুলো নিয়ে ওর কথা শুনে, ওর দূরদর্শিতা দেখে তিনি হয়ে গেলেন আমাদের অলিখিত ক্রীড়ানেতা।

গঠিত হল পাড়ার ক্লাব, নাম ছিল আবাহনী সমাজ কল্যাণ সমিতি। এর তিনটি অংশ ছিলÑ আবাহনী ক্রীড়া চক্র, আবাহনী সমাজ চক্র এবং আবাহনী সাংস্কৃতিক চক্র।

পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ রেহানা, শেখ জেলি উনারা আসতেন, আমাদের ক্লাবের প্রচারের জন্য প্রভাত ফেরিতে অংশ নিতেন। আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উনারা অংশ নিতেন। তারপর এমন সময় তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মারা গেলেন। কামাল বলল যে, উনার নামে একটি টুর্নামেন্ট করি তাতে আমাদের ক্লাবের পরিচিতিটাও চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। তখন বড় আকারের একটা টুর্নামেন্ট হল।

এরপর আমরা যুদ্ধে চলে গেলাম। অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। আমরা কামালের নেতৃত্বে ক্লাবের কাছে বদ্ধ একটা জায়গা প্রায় চল্লিশজন অস্ত্রের ট্রেনিং নিলাম। এটা ফিডব্যাকের জন্য বা বঙ্গবন্ধু পরিবারের জন্য করা হয়েছে।

এরপর যুদ্ধ থেকে ফিরে কামাল সবাইকে ডাইকা বলল-‘আমরা পাড়াগত ক্লাবকে আর পাড়া পর্যায় রাখব না, এটাকে আমরা জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যাব। আমরা এক কাজ করি, আমাদের ক্লাবের সমাজ চক্র ও সাংস্কৃতিক চক্র বাদ দিয়ে শুধু ক্রীড়া চক্রকে নিয়েই থাকি। যাতে একটা ভালো দল গড়তে পারি।’

ওর কথায় ১৯৭২ সালে আবাহনী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পদার্পণ করল। আমরা এখানে ইয়াং প্লেয়ারদের সঙ্গে, ওখানে একটা স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠিত হয়েছিল, ওপাড়ে। ওদের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা একটা টিম বানাব। যার ম্যানেজার ছিল আমাদের ক্লাবের তান্না (তানভীর মাজহার)।

তো যে কথা সেই কাজ। ওই দিন থেকে আবাহনী ক্রীড়াচক্রের যাত্রা শুরু হল। আমরা প্রথম বছর এ ক্লাব, ঐ ক্লাব থেকে দু’চারজন ইয়াং খেলোয়াড় নিয়ে দল বানালাম। ইয়াংদের প্রতি ও আকৃষ্ট ছিল।

তো কামালের নিয়ত ছিল, লক্ষ্য ছিল যে, দেশের তরুণ সমাজ যারা যুদ্ধ থেকে এসেছে তাদের সবার হাতে ছিল অস্ত্র। এই অস্ত্র যদি না ফেলতে পারি, ওই অস্ত্র যদি তাদের হাতে থাকে তাহলে ভবিষ্যতে এদেশ শাসন করা কঠিন হয়ে উঠবে। হতাশ, বখাটে হয়ে যাবে তরুণ সমাজ। তাহলে তাদের খেলার মাঠে আনতে হবে। তো যে কথা সেই কাজ। খেলার মাঠে সে আবাহনীকে আনল, ব্রাদার্স ইউনিয়নকে আনল, ধানমন্ডি ক্লাবকে আনল। তো এখানে ইয়াংদেরকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছিল প্রায় চার/পাঁচটা ক্লাবে। এদের সুযোগসুবিধা দিল, কামাল নিজে খেলতো। ফুটবল খেলতো, হকি খেলতো, বাস্কেটবল খেলতো, ক্রিকেট খেলতো। যখন খেলতো তখন একেবারেই বন্ধু কিন্তু যখন ক্লাবে ঢুকতো তখন একেবারে কঠিন ব্যক্তিত্ব, প্রশাসক।

একটা দিক ছিল যে, আবাহনী ক্লাবে কেউ ঢুকতে পারবে না যারা দেশ বিরোধিতা করছে, আর সবার জন্য ছিল উন্মুক্ত। এভাবে আসলে আমাদের নতুন করে যাত্রা শুরু হল। এরপর কামাল বলল যে, আমাদের খেলা সেই পাকিস্তান আমলের পুরনো ধাচের খেলা চলবে না। আধুনিক বিশে^র উন্নয়নশীল দেশের খেলার ধারা চালু করতে হবে।

চালু করতে হলে কি করতে হবে। ’৭৩ থেকে আমরা চেষ্টা করলাম, ’৭৪ সালে এসে আমাদের কোচ আসল, উইলিয়াম বি হার্ট। সে এসে ওয়ান টাচ, টু টাচ এই আধুনিক খেলা চালু করল। এটা দেখে তো তরুণ সমাজ অবাক। তারা আবাহনী ক্লাবের ভক্ত হয়ে গেল। সবাই বলতে শুরু করল এত সুন্দর খেলা এত সুন্দর খেলা। টুক টাক টুক টাক করেই গোল। কামাল বলল শুধু খেলাই না, খেলার ড্রেস, খেলার সরঞ্জাম সবকিছুতেই চেঞ্জ করব। এখন দেখেন আমাদের জার্সিসহ সবকিছু চেঞ্জ হল। তো খেলার দিকটায় একটা পরিবর্তন আনল সে।

১৯৭৩ সালে ইস্পাহানী ক্লাব থেকে ক্রিকেট ও হকি দল দুটি নিয়ে নিলাম। ইস্পাহানীর সঙ্গে তখন আমাদের ভালো সম্পর্ক ছিল। একদিন কামাল বললেন, ইস্পাহানী তাদের ক্রিকেট ও হকি দল দুটি দিতে চায়। আমরা সম্মতি দিলাম। তারা তখন আমাদের কিছু আর্থিক সহায়তাও দিল দল দুটি পরিচালনার সুবিধার্থে। কামাল প্রতিষ্ঠাতা হলেও ও কিন্তু শুরুতে সভাপতি ছিলেন না। আসলে আমরা তখন কেউই পদ-পদবি চাইতাম না। কামাল ক্লাবের সভাপতি হন ১৯৭৫ সালে।

এমনিতেই সে নিজেই সংস্কৃতি মনা ছিল। ছায়ানিটে সে সেতারা বাজাতো। সেখান থেকেই আমার মনে হয় তার সংস্কৃতির প্রতি লক্ষ্য ছিল, সে স্পন্দন শিল্পগোষ্ঠী গঠন করল। সেখানে ফেরদৌস ভাই, ফিরোজ শাই’রা ছিলেন। এছাড়া সে নাট্যকর্মী ছিল। ঢাকা থিয়েটারের সে একজন নেতা। সেখানে দশ/বারোটা নাটকও করল, ছিল একজন দিকনির্দেশক।

যুদ্ধে সে ট্রেনিং নিল, আর্মিতে জয়েন্ট করল, ক্যাপ্টেন হল, আমাদের সেনাপ্রধান কর্নেল ওসমানীর এডিসিও ছিল। কিন্তু কিছুদিন থাকার পর সে বলল আমার স্বাভাবিক লাইফই ভালো, সামরিক বাহিনীতে থাকলে এসব করতে পারব না।

একটা ছেলে তার ছাব্বিশ বছর বয়সে সে মারা গেছে। এ বয়সেই সে একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন আর্মি, একজন নাট্যকর্মী, একজন নাট্যনেতা, একজন সংস্কৃতি মনা, সংস্কৃতি নেতা, ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠক, আবার ছাত্রলীগ নেতা ছিল। তো আমরা মনে করি, সবকিছু মিলে এ বয়সে একজন তরুণের কাছে এত কিছু পাওয়াটা আজকাল আমাদের চোখে পড়ে না। আমরা মনে করি কামালের যে আদর্শ ছিল, সে আদর্শ যদি আমরা আজ চালিয়ে যেতে পারতাম বা কামাল যদি জীবিত থাকত তাহলে ৮০-৮৫ সালের মধ্যেই আমরা এশিয়ান লেবেলে প্রবেশ করতে পারতাম। তার লক্ষ্য ছিল আবাহনীর মতো আদর্শ ক্লাব সারা দেশে তৈরি করা। ইয়াং জেনারেশনকে লক্ষ্য করা, খেলার মাঠে তাদের রাখা, ভবিষ্যতের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। যাতে তারা ভবিষ্যতে এদেশ চালাতে পারে, শাসন করতে পারে, পরিচালনা করতে পারে, এ ধরনের তার লক্ষ্য ছিল।

তবে তার মৃত্যুটা আমাকে খুব বেশি নাড়া দেয়। কারণ মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি তার সঙ্গে ফোনে আলাপরত অবস্থায় ছিলাম- খুব ভোরে গুলির আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়। দরজা খুলে গুলির আওয়াজ কোন দিক থেকে আসছে বোঝার চেষ্টা করতেই আমি বারান্দায় গেলাম। প্রথমে ভাবছিলাম ওদিক থেকে আওয়াজটা আসছে। প্রথমে ভাবছিলাম, বঙ্গবন্ধু যাবে ইউনিভার্সিটিতে সেজন্য হয়ত ফূর্তি হচ্ছে। পরে বুঝলাম ওটা ৩২ নম্বরের আশপাশের কোনো দিক থেকে আসছে। তখনই কামালের বাসায় ফোন করার চেষ্টা করলাম। বহুবার ফোন করার পরও কেউ না ধরায় অস্থির হয়ে গেলাম। আমার এক ভাই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর একজন সিকিউরিটি অফিসার। ও ওর হটলাইনে চেষ্টা করেও পাচ্ছিল না। অনেকক্ষণ পর রিসিপশনে ফোন করতে মুহিত ধরলেন। মুহিতকে জিজ্ঞেস করলাম শেখ কামাল কোথায়।

মুহিত বলল কামাল ভাই আমার পাশেই আছেন। শেখ কামাল পাশ থেকে প্রশ্ন করলেন, কে? মুহিত আমার কথা বলতেই ফোন ধরলেন। আমি বললাম কি ব্যাপার তোমাকে পাচ্ছি না। কামাল বললেন, কিছুই বুঝতে পারছি না। ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি বাড়ির দিকে আসছে। শেখ কামাল বলে যাচ্ছেন, কালো পোশাক পরে একজন একজন করে ছয়জন লোক আমাদের বাড়িতে ঢুকছে। রিসিপশনটা মূল গেটের কাছে ছিল। আমাকে ফোনে রেখেই শেখ কামাল মুহিতকে বলতে বললেন আমি বঙ্গবন্ধুর ছেলে শেখ কামাল? এ কথাটা মুহিতের আর বলতে হয়নি। কারণ যারা এসেছিল তারা শেখ কামালকে চিনত। তারা ঘরে এসে দু’তিনটা বাজে গালি দিয়ে ব্রাশফায়ার করতে শুরু করল। ব্রাশফায়ারের পর ফোনটা পড়ে গেল।

আমি ওপাশ থেকে সব শুনছি। গুলির পর শেখ কামালের আর্তনাদ আমি শুনেছি। আর্তনাদের পর নিস্তব্ধ হয়ে গেল সব। আমার লোম সব খাড়া হয়ে গেছে, এখনো খাড়া হয়ে আছে। আমি প্রায় ২০-২৫ সেকেন্ড দম বন্ধ করে ফোন কানে দিয়ে ওই আর্তনাদ শুনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। শেখ কামালের আর্তনাদ এখনও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এটা আমাকে খুব পীড়া দেয়, আমার খুব মনে পড়ে। আর ১৫ আগষ্ট আসলে এটা আমাকে বেশি আলোচিত করে আলোকিত করে। কামালের ৭২তম জন্মদিন পার হল, এদিনে আনন্দের কিছু নেই, কারণ আগষ্টই হচ্ছে আমাদের জন্য শোকের। আমরা তার দোয়া করব যেন আল্লাহ তাকে বেহেস্ত নসিব করেন। সাড়ে তিন বছরে শেখ কামাল দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য যা করে গেছেন আমি মনে করি তারই ফল ভোগ করছে দেশ। নিজের কাজ দিয়েই তিনি সবার কাছে অমর হয়ে থাকবেন।