ঈদ যাত্রায় পরিবহনে উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি

ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৩ আশ্বিন ১৪২৭

ঈদ যাত্রায় পরিবহনে উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি

মাজহার মুনতাসসির ১০:২৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৫, ২০২০

print
ঈদ যাত্রায় পরিবহনে উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি

দেশে ঈদের সময় যাত্রীদের জিম্মি করে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়ের সংস্কৃতি চলমান। করোনার ক্রান্তিলগ্নেও সে ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। শুধু তাই নয়, সরকার নির্দেশিত এক আসন ফাঁকা রেখে যাত্রী নেওয়ার কথা থাকলেও তা ভেস্তে যায়। ঈদের দুদিন আগ থেকে আসন ফাঁকা না রেখেই যাত্রীপূর্ণ করে বাস গন্তব্যে যাত্রা করে। এমনকি ঈদের পরও এমন অনিয়ম অব্যাহত আছে। সরকার নির্দেশিত ৬০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির কথা থাকলেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মালিক পরিবহন দোর্দণ্ড প্রতাপে প্রকাশ্য দিবালোকে ঈদ উপলক্ষে পরিবহনে দ্বিগুণ ভাড়াই আদায় করা হয়েছে। এতে যাত্রীরা আশঙ্কা করছেন, তাদের করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যেই ফেলা হয়েছে। যদিও পরিবহন মালিকরা বলেছিলেন, ঈদের সময় ভাড়া বৃদ্ধি পাবে না এবং সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বাস চলাচল করবে। এসব বিষয়ে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মনিটরিং করার কথা থাকলেও তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। অতিরিক্ত ভাড়া ও আসন ফাঁকা না রেখে যাত্রী কেন নেওয়া হচ্ছে- এর প্রতিবাদ করলে যাত্রীদের হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে।

ঢাকার একটি গণমাধ্যমে প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত আছেন নজরুল ইসলাম। তিনি গত ৩০ জুলাই বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে সায়েদাবাস থেকে লক্ষ্মীপুরগামী ইকোনো বাসের টিকিট সংগ্রহ করতে যান। কাউন্টার থেকে ৬৫০ টাকা চাওয়া হলে সাংবাদিক নজরুল বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এ রোডে ভাড়া হওয়ার কথা ৫৬০ টাকা। এত বেশি কেন? এ নিয়ে নজরুলের সঙ্গে কাউন্টারে থাকা লোকজনের কথা কাটাকাটি হয়। তারা জানান, মালিক পরিবহনের নির্দেশেই বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। বাসে উঠে তিনি দেখতে পান এক আসন ফাঁকা থাকার কথা থাকলেও বাস পরিপূর্ণ।

এ বিষয়ে সাংবাদিক নজরুল প্রতিবাদ করলে বাসসংশ্লিষ্ট সবাই তার সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। এ সময় নজরুল ৯৯৯- এ কল করে অভিযোগ করলে মুগদা থানা থেকে পুলিশে এসে দেখে যায়। কিন্তু এ বিষয়ে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। নজরুল বলেন, এক আসন ফাঁকা না রেখেই বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে কোনো তদারিক দেখিনি এখানে। এতে করে বাড়তে পারে করোনার সংক্রমণ। মালিক পরিবহন ইচ্ছে করেই সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এ কাজগুলো করছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ দাবি করছি।

গাজীপুরে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করে নাটোরের জনি সিদ্দিকী। গত ৩০ জুলাই গাজীপুর থেকে নাটোরগামী বাসে উঠতে হলে তাকে গুণতে হয়েছে সরকার নির্দেশিত ভাড়ার চাইতে দ্বিগুণ ভাড়া। এমনকি স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি এবং এক আসন ফাঁকা থাকার কথা থাকলেও পুরো বাস যাত্রী দিয়ে পরিপূর্ণ করা হয়েছে বলে জানান জনি।

তিনি আরও জানান, গাবতলী থেকে নাটোর-রাজশাহীগামী বাসগুলো দ্বিগুণের চেয়েও বেশি ভাড়া আদায় করা হয়েছে। এখানেও মানা হয়নি সরকারি নির্দেশনা, মানা হয়নি স্বাস্থ্যবিধি।

ঈদের পরও মালিক পরিবহনের এ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ঢাকার একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন নোয়াখালীর সাজিদ। ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার সময় তিনি এমন পরিস্থিতির শিকার হন। তিনি ভেবেছিলেন হয়তো ঈদের পর স্বাভাবিক নিয়মে বাস চলবে। কিন্তু গত ৪ আগস্ট ঢাকার আসার সময় তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। অতিরিক্ত ভাড়া গুণে তিনি নোয়াখালী থেকে ঢাকাগামী বাসে উঠে তিনি দেখতে পান কোনো আসন ফাঁকা রাখা হয়নি। সকল আসনেই যাত্রী। এসময় এক যাত্রী আসন ফাঁকা না রাখার বিষয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে বাস থেকে নেমে যেতে বলা হয় বলে জানান সাজিদ। ঢাকার সঙ্গে যে সকল জেলার সড়ক পথে যোগাযোগ আছে সে সকল জেলাতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে সেখানেও একই চিত্র।

দূরপাল্লার পরিবহনগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না এবং এক আসন ফাঁকা থাকার কথা থাকলেও দুই আসনেই দ্বিগুণ ভাড়ায় যাত্রী নেওয়া হচ্ছে- এমন বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ স্বীকার করে খোলা কাগজকে বলেন, সকল বাসে নয় কিছু কিছু বাসে এমনটা হচ্ছে বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। আর এ বিষয়ে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত আছে। তারা বিষয়টা দেখছেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এর পরিচালক (প্রশাসন) মো. আজিজুল ইসলাম খোলা কাগজকে বলেন, গণপরিবহনে করোনার সংক্রমণ রোধে সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কিনা, দ্বিগুণ ভাড়া নেওয়া হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। যদি আমাদের অজ্ঞাতে কোনো পরিবহনে এমনটা হয়ে থাকে তাহলে আমাদের কাছে অভিযোগ দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাত্রীরা ৯৯৯-কল করেও এ বিষয়ে অভিযোগ দিতে পারেন।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ বিষয়ে খোলা কাগজকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে আমরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি বেশিরভাগ রোডের বাসে যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি। এ বিষয়ে মনিটরিংয়ের জন্য বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকলে তাদের কার্যক্রম আমাদের চোখে পড়েনি। মালিক পরিবহন কর্তৃপক্ষ তো তাদের স্বার্থ দেখবে, তাহলে যাত্রীদের স্বার্থ দেখবে কে। বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে- এমন কোনো বিবৃতি বা সংবাদও আমাদের চোখে পড়েনি। যাত্রীরা প্রতিকার পায় না বলেই সেখানে এখন অভিযোগ দিতে যায় না।