ফটকাবাজের দখলে চামড়া বাজার

ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৩ আশ্বিন ১৪২৭

ফটকাবাজের দখলে চামড়া বাজার

জাফর আহমদ ১০:২১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৫, ২০২০

print
ফটকাবাজের দখলে চামড়া বাজার

চামড়ার বাজার স্বাভাবিক রাখতে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ী, চামড়া থেকে সুবিধাভোগী ও চামড়া রপ্তানি করে বৈদেশিক আয় ধরে রাখতে প্রণোদনা এবং নীতি সহায়তা দিয়েছিল সরকার। উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কাঁচা চামড়া রপ্তানির। শেষ পর্যন্ত সরকারের কোনো উদ্যোগই কাজে লাগল না। অশুভ সিন্ডিকেট সরকারের এ উদ্যোগ কাজে লাগাতে দেয়নি। এতে সর্বশ্বান্ত হয়েছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।

এবার প্রায় ২০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চামড়ার সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়াই ফটকাবাজের দখলে, চামড়ার প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাত প্রক্রিয়ার সঙ্গে আধুনিক ও দক্ষ মানুষ যুক্ত করা গেলে চামড়ায় যে সম্ভাবনা আছে, তা কাজে লাগানো সম্ভব। সারা বছরে চামড়ার অর্ধেকের বেশি সংগ্রহ হয় কোরবানির ঈদে। এ বছর কোভিড-১৯ এর কারণে দেশের পুরো অর্থনীতি বিপর্যন্ত। বাদ যায়নি কোরবানিকেন্দ্রিক চামড়া সংগ্রহও।

এ বছর কোরবানির ঈদের আগে লবণযুক্ত চামড়া সংগ্রহে গত বছরের চেয়ে ২০ শতাংশ কম দাম বেঁধে দেওয়া হয়। ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়া দাম প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। আর ঢাকার বাইরে ধরা হয় প্রতি বর্গফুট ২৮ থেকে ৩২ টাকা। সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় প্রতি বর্গফুট ১৩ থেকে ১৫ টাকা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে চামড়া বিক্রেতাদের অভিযোগ- ধার্য করে দেওয়া দামের এক-তৃতীয়াংশও পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও বিক্রি না করতে পেরে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামে এমন ঘটনা ঘটছে।

চামড়া সংগ্রহের প্রধান মৌসুমে ব্যবসায়ীরা যাতে দাম পায় এজন্য সরকার ব্যাংক ঋণ ও চামড়ার দাম বেঁধে দেয়। তারপরও চামড়ার দাম পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ফল আসছে না। অভিযোগ আছে আড়ৎদাররা চামড়ার দাম দিচ্ছে না। বছরের অধিক সময় ধরে চামড়ার বাকি টাকা পাচ্ছে না। মূলত তারাই চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে যেমন চামড়া তেমনই দিচ্ছি। আমরা চামড়ার দাম কম দিচ্ছি না বলে অভিযাগ খণ্ডন করেন পোস্টার রইসউদ্দিন নামে এক আড়ৎদার। তিনি বলেন, গত বছরের চামড়া পড়ে আছে। করোনার কারণে সব অনিশ্চিত। বেশি দামে চামড়া কিনে কি করব?

এ বিষয়ে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ খোলা কাগজকে বলেন, চামড়ার দাম পাওয়া, না পাওয়ার পেছনে আমাদের কোনো হাত নেই। লবণযুক্ত চামড়া আমাদের কাছে যখন আসবে তখন সরকার নির্ধারিত দামে ক্রয় করব।

চামড়া দেশের কৃষি-শিল্প-রপ্তানি বাণিজ্যের এক সম্ভাবনাময় খাত। এরপরও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে শিল্পটি শিরদাঁড়া মজবুত করতে পারছে না বলে মনে করেন পিআরআই-এর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর।

তিনি খোলা কাগজকে বলেন, নানামুখী অযত্নে পড়ে আছে দেশের চামড়া শিল্প। ঈদ এলে চামড়ার নানা সম্ভাবনার কথা বলা হলেও চামড়া নিখুঁতভাবে বের করার প্রশিক্ষণ নেই। সরকার নির্দিষ্ট স্থানে প্রশিক্ষিত মানুষ দ্বারা পশু জবাইয়ের ব্যবস্থা করতে পারেনি।

ফলে পশু জবাই করার সময় বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এবার বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়েছে। যা হয় ঢাকার বাইরে থকে বহন করে আনার সময় নষ্ট হয়ে যাওয়া, সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে না পারা অথবা চামড়া কাঁটা ছেড়া থাকা। এবার বিপুল পরিমাণ চামড়া ফেলে দেওয়ার পেছনে এমন কারণ রয়েছে বলে মনে করেন চামড়া প্রক্রিয়াজাতকারণ কর্মীরা।

এদিকে চামড়ার দাম পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার কাঁচা চামড়া রপ্তানির কথা ঘোষণা দেয় ঈদের সময় এসে। ফলে বিদেশি কাঁচা চামড়া ক্রেতাদের খুঁজে পেতেই সময় পার হয়ে যায়। আবার কাঁচা চামড়া রপ্তানিতে বন্ধ ঘোষণা চলে আসে। ফলে মাঠপর্যায়ে চামড়ার দাম পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার যে উদ্যোগ নেয়, তা কোনো কাজে আসে না। এবারও তাই হয়েছে; ঈদের কয়েকদিন আগে কাঁচা চামড়া রপ্তানি উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোথায় কীভাবে চামড়া রপ্তানি করবে বুঝে উঠোর আগে কাঁচা চামড়া দাম পাওয়ার ক্ষেত্রে সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। অন্যদিকে কাঁচা চামড়া রপ্তানিতে না করতে ট্যানারি মালিকদের চাপ থাকে। এজন্য তারা কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করে রাখে।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ এলেও চামড়া দেশে বাণিজ্যকভাবে পালিত খামারের পশুর উপজাত পণ্য। এসব খামারে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মরত আছে। কোরবানির ঈদ এলে বৈদেশিক মুদ্রা অপচয় করে পশু আমদানি করা হতো, দেশে খামার বেশি গরু পালন শুরু হওয়ার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে। সঙ্গে যুক্ত কৃষক, মাঠপর্যায়ের মৌসুমি ব্যবসায়ী, আড়ৎদার ও ট্যানারি শিল্পের মালিকরা। এসব খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মরত আছে। বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আসে এ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে। চামড়ার সঙ্গে যুক্ত থাকে সামাজিক কল্যাণের বিষয়। সারা বছর যে পরিমাণ চামড়া সংগৃহীত হয় তার অর্ধেকের বেশি আসে কোরবানির ঈদে।

বিপুলসংখ্যক মাদ্রাসা চামড়া সংগ্রহ করে এতিম শিশুদের জীবন নির্বাহ করে। আহসান এইচ মনসুর বলেন, এই চামড়া প্রক্রিয়া থেকে বাজারজাত পর্যন্ত যা কিছু হয় তা পুরাতন ধ্যান-ধারণার কিছু মানুষ দ্বারা। চামড়া বাজারজাতকরণে দেশের নিজস্ব বাজারের পাশাপাশি বিদেশে বাজার খুঁজে বের করার জন্য দক্ষ ও পুঁজিÑকোনোটাই পরিকল্পিত উপায়ে হয় না।

ফলে সরকার যে সহায়তা দেয়, তা চলে যায় কিছু ফটকবাজের পকেটে। আবার তারাই সংকট সৃষ্টি করে এ মাঠপর্যায়ে চামড়া দাম পেতে অসহযোগিতা করে।

চামড়া নিয়ে প্রতিবছর বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টির পেছনে একটি দক্ষ ও কর্মক্ষম কর্তৃপক্ষের অভাব বলে মনে করেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, টেকসই চামড়া খাত বিসিকের মতো প্রতিষ্ঠান দিয়ে সম্ভব নয়, দরকার ইপিজেডের মতো একটি দক্ষ প্রতিষ্ঠান।