তিনি ছিলেন আধুনিক ফুটবলের প্রবর্তক

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৭ আশ্বিন ১৪২৭

খুব কাছ থেকে দেখা শেখ কামাল

তিনি ছিলেন আধুনিক ফুটবলের প্রবর্তক

বদরুল আলম চৌধুরী ১০:১২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৫, ২০২০

print
তিনি ছিলেন আধুনিক ফুটবলের প্রবর্তক

বাংলাদেশের আধুনিক ফুটবলের প্রবর্তক বলা হয় তাকে। যার ধ্যান-জ্ঞানে সার্বক্ষণিক জড়িয়েছিল খেলাধুলা ও সংস্কৃতি। বাংলাদেশের খেলাধুলাকে আলোচিত জায়গায় নিয়ে যাওয়াই ছিল যার লক্ষ্য। তিনি হচ্ছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল। এ আগস্টেই তার জন্ম এবং মৃত্যু। খেলাধুলায় শেখ কামালের মেধা, চিন্তা-চেতনা নিয়ে দৈনিক খোলা কাগজের পাঠকদের জন্য তাঁর কাছের লোকজনের ধারাবাহিক কথোপকথন- ‘খুব কাছ থেকে দেখা শেখ কামাল’...

আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে। আমি তখন রহমতগঞ্জ ক্লাবে খেলা করতাম। অর্থাৎ সেপ্টেম্বর কি অক্টোবরের শেষদিকে। তখন আমাকে অফার করে আবাহনীতে খেলার জন্য। তার আগে তার সঙ্গে আমার পরিচয়টা হয় আউটার স্টেডিয়ামে অর্থাৎ যেটা এখন হকি স্টেডিয়াম। এখানে আগে খোলা মাঠ ছিল। সেখানে ক্রিকেট লিগ খেলা হতো। তো আমি একদিন নারায়গঞ্জ থেকে আসছি। যেহেতু আবাহনীর সাপোর্টার হয়ে গেছি ইতোমধ্যে। জানতাম কামাল ভাই খেলবে।

আরও অনেক ভালো ভালো ক্রিকেটাররা খেলবে। তো নারায়ণগঞ্জ থেকে খেলা দেখতে আসছি। আমি হাঁটতে হাঁটতে আবাহনী টেন্টের দিকে গিয়ে দাঁড়ালাম। তো দেখছি আবাহনী ব্যাটিংয়ে। তারপরে এখানে একটা ছোট্ট গ্যালারি ছিল। এই গ্যালারির মধ্যে কামাল ভাই প্যাড পরে রেডি হচ্ছে নেক্সট ব্যাটসম্যান হিসেবে। তো আমি একবার খেলা দেখছি একবার তার দিকে তাকাচ্ছি। যেহেতু বঙ্গবন্ধু ছেলে শেখ কামাল, একটা বিশাল ব্যাপার আমার কাছে তখন মনে হতো।

এভাবে বারবার তার দিকে তাকাচ্ছিলাম। সেও খেলা দেখছে। কোন ফাঁকে সে আমাকে কিংবা কেউ আমার কথা তার কাছে গিয়ে বলেছে। তখন সে আমাকে ডেকে পাঠাল। ওই যে গেলাম, যাওয়ার পরে সে আমাকে প্রথম দেখাতে বলল তোর নাম চুন্নু? সালাম দিলাম, বললাম জি। বলল তুই কি আবাহনীতে খেলবি? এই যে কথাটা আজও আমার কানে বাজে। যে কিনা আমাকে চেনে না জানে না জীবনে কোনো দিন দেখাও হয়নি। যে প্রথম দেখাতেই আমাকে আকর্ষিত করে তুলেছিল, যেন আমি তার কতদিনের চেনা এবং ছোট ভাই। কাছে ডেকে বলল তুই খেলবি। এই যে মন থেকে এভাবে বলা যেন সে আমাকে আগে থেকেই চেনে। আমার এত ভালো লেগেছে তা বলে বোঝাতে পারব না। হয়ত খেলা সম্পর্কে জানে বা জেনেছেন। আমি কিন্তু তার ডাকে সেই যে সাড়া দিয়েছিলাম শেষ পর্যন্ত আবাহনীতেই ছিলাম। এখনো আবাহনীর একজন পরিচালক হিসেবে আছি।

শেখ কামাল স্পোর্টসকে যে কতটা ভালোবাসত সেটা আমি একটা বছর খেলেই টের পেয়েছিলাম। সে শুধু আবাহনী ক্লাবটিই সৃষ্টি করে নাই। পাশাপাশি ক্লাবটাকে ভালো জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য, অপ্রতিদ্বন্দ্বী একটি দল করার জন্য, প্রথম থেকেই মনোনিবেশ করেছিলেন। বিশেষ করে স্বাধীনতার আগের বছর লিগে এবং বিভিন্ন জায়গায় বাঙালি খেলোয়াড়রা যেসব ভালো খেলেছিলেন, তাদের তিনি স্বাধীনতার পরের বছর আবাহনী ক্লাবে নিয়ে এসেছেন। তার চিন্তা-চেতনায় ভাবনা ছিল দেশের একটি অন্যতম খেলোয়াড় হিসেবে রূপান্তরিত করা।

শুধু ফুটবল নয়, ক্রিকেট হকিতেও। ৭৩ সালে লিগটা হয়নি। ৭৪ সালে টার্গেট করল যে ভালো করতে হলে খেলোয়াড়ের পাশাপাশি একজন ভালো কোচের দরকার। সে ইংল্যান্ড থেকে উড়িয়ে আনলেন উইলিয়াম বিল হার্ট নামে ইংলিশ কোচকে। এরপর তিনি আবাহনীকে নতুন রূপে উপস্থাপন করেন। খেলার ধারা বদলে দেন। আমরা তখন খেলা দেখতাম ব্রাজিলের ছোট ছোট পাস, ক্ষিপ্রতা, ড্রিবলিং গুড ফিনিশ তখন এ বিষয়গুলো আবাহনী লক্ষ্য করলাম।

খেলার এই পরিবর্তনে তখন একটা তকমা লেগে যায় যে আধুনিক ফুটবলের প্রবর্তক আবাহনী। এটা তখন মানুষের মুখে লেগে যায়। ওই বছর আবাহনী চ্যাম্পিয়ন হয়, পরের বছরও একই দল ধরে রেখে চ্যাম্পিয়ন হয়।

তার ভেতরে যে গুণটা ছিল- সে কিন্তু একজন খেলোয়াড় ছিল, বাস্কেট বল খেলোয়াড় ছিল, ক্রিকেট ভালো খেলতো। ঠিক তার বাবার মতো সাংগঠনিক দক্ষতা ও ক্ষমতা ছিল দলকে অর্গানাইজ করা। বঙ্গবন্ধু যেমন দেশকে অর্গানাইজ করেছে, কামাল ভাই আবাহনীকে অর্গানাইজ করেছে এবং সে ছাত্রলীগের অন্যতম একজন নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তো বঙ্গবন্ধু গুণাবলীর সবকিছু পেয়েছেন তিনি।

তার একটা বিষয় এখনো আমাকে দাগ কাটে-আমরা যখন আবাহনী ক্লাব মাঠে শীতের ভোরে প্রচণ্ড কুয়াশায় অনুশীলন করতাম। খুব কাছ থেকে পরস্পর পরস্পরকে দেখতে পেতাম। তো কামাল ভাই কি করতেন তিনি প্রায় গাড়ি নিয়ে চলে আসতেন মাঠে। লুঙ্গি স্যান্ডেল পরে গায়ে চাদর মুড়িয়ে বসে থাকতেন।

আমাদের প্রাকটিস দেখতেন। তো একদিন আমাদের কৌতূহল জাগল কে এই লোক, প্রতিদিন ভোরে এভাবে বসে থাকেন। তো আমরা দৌড়ে যেতেই উনি নিজেই চাদর তুলে লাফ দিয়ে উঠলেন। হায় আমরা আশ্চর্য হয়ে গেছি। এই দেশের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা, দলের প্রতি ভালোবাসা, এই যে তার চিন্তা-চেতনা আমার কাছে এখনো মনে হয় যে আমরা এমন একজনকে হারিয়ে ফেললাম যে কিনা ফুটবলের নিবেদিত প্রাণ। যদি সে বেঁচে থাকত তাহলে ফুটবলের আজ যে অবস্থায় নিয়ে গিয়েছে যে সমস্ত ব্যক্তি, আজকে আমাদের এ অবস্থা দেখতে হতো না।”