পাঁচ বছরে আমুল পরিবর্তন এনেছি

ঢাকা, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৪ আশ্বিন ১৪২৭

খোলা কাগজকে বিদায়ী মেয়র নাছির

পাঁচ বছরে আমুল পরিবর্তন এনেছি

আরিচ মাহমুদ ৯:৪৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৪, ২০২০

print
পাঁচ বছরে আমুল পরিবর্তন এনেছি

চট্টগ্রামকে বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করতে না পারার ব্যর্থতা নিয়ে আজ বুধবার পাঁচ বছরের মেয়র পদের ইতি টানছেন চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। চট্টগ্রামে সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী কার্যালয়ে ‘দৈনিক খোলা কাগজের’ সঙ্গে একান্ত আলাপকালে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন সফলতার পাশাপাশি গত পাঁচ বছরে ব্যর্থতা ও অতৃপ্তির কথা তুলে ধরেন। 

চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন সিটি করপোরেশনের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে ২০১৫ সালের ২৬ জুলাই এ পদে অধিষ্টিত হন। তিনি বিএনপি সমর্থিত মেয়র এম মনজুর আলমের সঙ্গে প্রতিদন্দ্বিতা করে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। যদিও নির্বাচনের দিন সকালে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলন করে দল ছাড়েন সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম।

মেয়র পদে থেকে তৃপ্তি কতটুকু এ প্রশ্নের জবাবে আ জ ম নাছির বলেন, চট্টগ্রাম শহরে তার জন্ম বেড়ে ওঠা, শহরের প্রতি আমার আলাদা টান, দুর্বলতা। স্বাভাবিক কারণে প্রত্যাশা আছে। এখন সব প্রত্যাশা যদি পূরণ হয় তাহলে এ নগরের একজন হিসেবে সবচেয়ে সুখী মানুষ তিনি নিজেকে মনে করতেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শহর নিরাপদ ও বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে ওঠেনি। গত পাঁচ বছরে চেষ্টা করেও চট্টগ্রামকে নিরাপদ বসবাসের যোগ্য করে তুলতে পারলে আলাদাভাবে তার মনে সেটিসপেকশন কাজ করত। সে ধরনের শহর তো তৈরি করে যেতে পারিনি।

মেয়র নাছির বলেন, গত পাঁচ বছরে মেয়র পদে থেকে উপলব্ধি করেছেন, করপোরেশনের সর্বোচ্চ ব্যক্তি হিসেবে তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিকল্পনা ও কাজ করার সুযোগ নেই। আর্থিক সক্ষমতা যদি এখানে না থাকে, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা যাবে না। ফলে জনগণের যে চাহিদা বা প্রয়োজন সেটাও মেটানো কোনোভাবে সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এখন প্রকল্পের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। প্রকল্পের কথা মুখে বলে হবে না। প্রকল্প গ্রহণ করে অনুমোদন করা দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। আবার বাস্তবায়ন করা আরো বড় সময়ের প্রয়োজন। নিজস্ব অর্থ না থাকায় দীর্ঘ সময়ের বিড়ম্বনা।

তিনি বলেন, করপোরেশনের নিজস্ব অর্থ থাকলে দ্রুত প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সম্ভব হতো। এখন তো সে ধরনের কোনো কাজ করতে পারিনি। কারণ একটায়, আর্থিক সক্ষমতা না থাকা।

আ জ ম নাছির বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে গত দুই মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ১ ফেব্রুয়ারি ২০১০ সাল পর্যন্ত ৬০ লাখ টাকা দেনা রেখে যান এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। ২০ জুলাই ২০১০ থেকে ২৭ মে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিএনপি সমর্থিত মেয়র এম মনজুর আলম প্রায় ১৫০ কোটির বেশি টাকা দেনা রেখে মেয়র পদ ছেড়েছেন। আমি দুই মেয়রের দেনা বাবদ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছি। হতাশার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, সিটি করপোরেশনে ঠিকাদাররা কাজ করতে চায় না। কারণ এখানে কাজ করে মূলধন নিয়ে চিন্তিত থাকেন তারা। তাদের টাকা ২০০৫ সাল থেকে আটকা পড়েছে করপোরেশনে।

আবার নতুন করে কাজ করলে কত বছর পরে বিল পাবেন আদৌ তাদের জীবদ্দশায় এ বিল পাবেন কিনা সে সন্দেহ ঠিকাদারদের মনে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ঠিকাদারদের প্রাপ্য পাওনা যথাসময়ে দিতে না পারার কারনে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ বুঝে নিতে পারেনা করপোরেশন। আবার কাজ না করলেও চাপ সৃষ্টি করতে পারেনা। কারণ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো কাজের ৩০ শতাংশ শেষ হওয়ার পর তাদের বিল দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় সিটি করপোরেশন। যার কারণে অনেক সময় তারা কাজ না করে গড়িমসি করে। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না বলে হতাশা প্রকাশ করেন মেয়র নাছির।

আগামীতে যিনি মেয়র পদে আসীন হবেন সিটি করপোরেশনের বড় একটি দেনার ভার তাকে নিতে হবে। আ জ ম নাছির জানান, আগামী দিনে মেয়রের এসব বড় দায় দেনা না থাকলে কাজ করা সহজ হতো। সিটি করপোরেশনের সাফিশিয়েন্ট ফান্ড থাকলে তিনি তার ফান্ডের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা করতে পারতেন।

বিগত প৭াচ বছরে কতটুকু সফল এ প্রশ্নের জবাবে মেয়র নাছির বলেন, সফলতা বিচারের ভার সাধারণ জনগণের ওপর। যারা নিঃস্বার্থভাবে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করেন। তারা বিচার বিশ্লেষণ করবেন। তারপরও সৎ সাহস, ভালো মানসিকতা যাদের আছে তারা নিজেরাই স্বীকার করবেন চট্টগ্রামে দৃশ্যমান একটি পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি মেয়র হিসেবে সফল।

তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের প্রধান দায়িত্ব নগরীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, রাস্তাঘাট নালা নর্দমা নির্মাণ, সংস্কার করা। এর বাইরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন আরো দুইটি কাজ করছে সফলভাবে। এর একটি শিক্ষা ও অন্যটি স্বাস্থ্য বিভাগ। গত ৫ বছরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে তিনি অনেক পরিবর্তন করতে পেরেছেন বলে জানান। নগরীর বিভিন্ন কাচা সড়ক কমিয়ে ব্রিক সলিং, পাকা রাস্তার সংখ্যা বৃদ্ধি করেছেন। একারণে সড়কগুলো অনেক টেকসই করা হয়েছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দরের ভারি যানচলাচল ও সিডিএ, ওয়াসা সহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য রাস্তা কর্তনে দুর্ভোগ বাড়ে। এতে বছরের অধিকাংশ সময়ে সড়ক টেকসই রাখতে কষ্ট হয়।

মেয়র নাছির বলেন গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম নগরীতে তিনি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আমুল পরিবর্তন এনেছে। নগরীর ৯ লাখ নগরবাসীকে বিনামুল্যে বিন দিয়েছেন। বর্জ্য অপসারণে মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। দুই হাজার সেবক নিয়োগ দিয়ে মানুষের ঘর থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে। আগে দিনের বেলায় বর্জ্য সংগ্রহ করা হলেও বর্তমানে রাতে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয় বলে জানান।

চট্টগ্রাম শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিকল্পিত ছিল না উল্লেখ করে মেয়র নাছির বলেন, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিকল্পিতভাবে ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য বেশ কয়েকটি প্রকল্প গ্রহন করেছেন। চট্টগ্রামের এক্সেস রোড ও পোর্ট কানেকটিং রোডের আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে জলাবদ্ধতা হয় না বলে দাবি করেন মেয়র নাছির। নগরীর জলাবদ্ধতা দূর করতে ২০১৪ সালের জুনে নতুন খাল খননের প্রকল্প অনুমোদন হয়েছিল। গত পাঁচ বছরে তা বাস্তবায়ন হয়নি। এ ব্যাপারে সিটি মেয়র নাছির জানান, খাল খনন বাবদ ৮শ’ কোটি টাকা ছাড় করিয়েছি। ভূমি অধিগ্রহণের জন্য টাকা জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘ ২৭ বছর পর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রবিধান মালা অনুমোদন করে এক হাজার ৪৬ জনের নতুন পদ সৃষ্টি করেছেন বলে জানান। এ প্রবিধানের কারণে দীর্ঘদিন যোগ্য লোকের অভাব, জট, শূন্যপদের বিপরীতে লোক নিয়োগের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পেরেছেন।

তবে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে গত ৫ বছরে মন্ত্রীর পদমর্যাদা না দেওয়া, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প সিডিএ (চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) এর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা, উন্নয়ন কাজে সচিবদের উপঠৌকন চাওয়া নিয়ে মেয়র নাছিরের মন্তব্যকে ঘিরে দেশ জুড়ে আলোচনা, দ্বিতীয় বার মেয়র পদে মনোনয়ন না দেওয়া, বিভিন্ন কাজে দলের একটি অংশের নেতা কর্মীদের নানা বাধা দেওয়ার ঘটনা, কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলাসহ বছর জুড়ে আলোচিত ঘটনা নিয়ে শেষ সময়ে মুখ খুলতে রাজি নন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন। তবে মেয়র নাছির বলেন, বিরোধিতার কারণে বিরোধিতা হয়ে থাকে। উদ্দেশ্যপ্রণেদিতভাবে প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে কাজ করে অনেকে। বিভক্তি বিভাজন, আমাদের মধ্যে তৈরি হলে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো ও কোনো সুযোগ কাজে লাগবে না।