স্বাস্থ্য অধিদফতরে যত সিন্ডিকেট

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২০ | ২২ শ্রাবণ ১৪২৭

স্বাস্থ্য অধিদফতরে যত সিন্ডিকেট

তোফাজ্জল হোসেন ১০:১২ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০

print
স্বাস্থ্য অধিদফতরে যত সিন্ডিকেট

দুর্নীতি অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে দেশের সবচেয়ে বড় সেবা খাত চিকিৎসা ব্যবস্থা। এই খাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে নানা অনিয়মের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদফতরে যত সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ক্রয় নিয়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ১৪ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ‘কালো তালিকা’ ভুক্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। বিষয়টি ‘টক অব দ্য’ স্বাস্থ্য অধিদফতরে পরিণত হয়েছে। ১৪ প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে দুদক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণসহ ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনা এবং দুর্নীতি, প্রতারণাও চক্রান্তমূলক কার্যকলাপে জড়িত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

এসব প্রতিষ্ঠান ও তাদের মালিকদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদক মামলা করে সে তালিকা পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরে। দুদকের তদন্তে এদের নাম উঠে আসায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত নির্দেশনা দেশের সব হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

জানা গেছে, স্বাস্থ্যখাতের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্থার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আতায়াত করে নিম্নমানের মালামাল কিনে আলোচনায় এসেছেন। শক্তিশালী সিন্ডিকেট থাকার কারণে কর্মকর্তাদের জিম্মি করে অনৈতিক কাজ করানো হয়েছে। গত বুধবার সরেজমিন স্বাস্থ্য অধিদফতর ঘুরে নানা চিত্র দেখা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মূল ভবন মহাখালী টিভি গেটে। এখানে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবসায়ীর আনাগোনাও কম। একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, করোনাকালীন সময় বিধায় অধিদফতরের মানুষের আনাগোনা কম। এই সুযোগে স্বাস্থ্যখাতের বিশাল সিন্ডিকেট অব্যবস্থাপনা আর অনিয়মকেই নিয়মে পরিণত করতে চায়।

জানা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, সিএমএসডি, স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো, পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ, ওষুধ প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, নার্সিং অধিদফতর, প্রতিটি মেডিকেল কলেজ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকাদারি সিন্ডিকেট শক্তিশালী হওয়ায় এবং সরকারদলীয় প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে কাজ হাছিল করানো হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, ভাই সমাজে এখনো অনেক ভালো মানুষ আছে। এ কারণে স্বাস্থ্যখাতে শত অনিয়মের মধ্যে কিছু কাজ হচ্ছে। অনেক জায়গায় সমুদয় বিল উত্তোলন করার ঘটনাও রয়েছে। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, জিরো থেকে হিরো হয়েছে। এমন ধরনের ঠিকাদার স্বাস্থ্য বিভাগে কাজ করেন। অনেকেই দেশের বাহিরে থেকে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন। বিদেশে থাকলেও তার ইঙ্গিতেই চলে স্বাস্থ্য খাত। বিদেশেও রয়েছে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা।

দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ন্ত্রণে তিনি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ওপর প্রভাব খাটান। কখনো তা অর্থের মাধ্যমে, আবার কখনো হুমকি-ধামকির মাধ্যমে। সিন্ডিকেটের মর্জিমতো কাজ না করে উপায় নেই বলছিলেন গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি হাসপাতালের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। কারণ, এই সিন্ডিকেটের লুটপাটসহ নানা রকমের অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অনেক উচ্চ পর্যায়ের যোগসাজশ রয়েছে।

সূত্র জানায়, ডাক্তার, প্রশাসনের কর্মকর্তা, কর্মচারী ছাড়াও বাইরের কিছু দালাল রয়েছে সিন্ডিকেটে। এরা সরকারি যে হাসপাতাল বা যে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে সেই হাসপাতালের প্রধান ব্যক্তির সঙ্গে আগেই বোঝাপড়া করে নেয়। টেন্ডার যেভাবেই আহ্বান করা হোক না কেন, যে বা যারাই টেন্ডারে অংশ নিক না কেন কাজ পাবে সিন্ডিকেট। এভাবে হযবরল অবস্থায় চলছে স্বাস্থ্য খাত।

জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে  উল্লেখিত ১৪ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ  প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বিষয়ে  প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গত ৯ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চিঠি দেয় অধিদফতরকে।

যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল এবং রূপা ফ্যাশনের মালিক রুবিনা খানম।

রুবিনা খানম স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাব রক্ষক মো. আবজাল হোসেনের স্ত্রী। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত প্রায় ২৮৫ কোটি টাকা পাচার এবং ৩৪ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত বছর এই দম্পতির বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছিল দুদক। এছাড়া মেসার্স অনিক ট্রেডার্সের মালিক আব্দুল্লাহ আল মামুন, মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজের মুন্সী ফররুখ হোসাইন, মেসার্স ম্যানিলা মেডিসিন অ্যান্ড মেসার্স এস কে ট্রেডার্সের মনজুর আহমেদ, এমএইচ ফার্মার মোসাদ্দেক হোসেন, মেসার্স অভি ড্রাগসের মো. জয়নাল আবেদীন, মেসার্স আলবিরা ফার্মেসির মো. আলমগীর হোসেন, এস এম ট্রেডার্সের মো. মিন্টু, মেসার্স মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মো. আব্দুস সাত্তার সরকার ও মো. আহসান হাবিব, বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানির মো. জাহের উদ্দিন সরকার, ইউনির্ভাসেল ট্রেড করপোরেশনের মো. আসাদুর রহমান, এ এস এলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আফতাব আহমেদ এবং বেয়ার এভিয়েশনের মো. মোকছেদুল ইসলামকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে নানা কেনাকাটায় দুর্নীতির বেশ কিছু ঘটনা গত বছরই আলোচিত হয়েছিল। এই বছর করোনাভাইরাস মহামারির শুরু হওয়ার পর নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। ঘটনার তদন্ত করলে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে নিঃসন্দেহে।