পুরনো রূপে গণপরিবহন

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

পুরনো রূপে গণপরিবহন

মাজহার মুনতাসসির ৮:৪১ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৯, ২০২০

print
পুরনো রূপে গণপরিবহন

করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে গত ২৬ মার্চ থেকে ৭ দফা সাধারণ ছুটি শেষে গত ১ জুন থেকে রাজধানীসহ সারাদেশে গণপরিবহন চালু হয়। এর আগে ৩১ মে করোনা সময়ের জন্য বিদ্যমান ভাড়ার ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। প্রজ্ঞাপনে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে তা হচ্ছে- একজন যাত্রীকে বাস/মিনিবাসের পাশাপাশি দুটি আসনের একটি আসনে বসিয়ে অপর আসনটি অবশ্যই ফাঁকা রাখতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসারে শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। শুরুর দিকে উপরোল্লেখিত বিষয়গুলো মানা হলেও কিছুদিন যাওয়ার পরে সেই পুরনো রূপেই ফিরে আসে গণপরিবহনের চিত্র। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে করোনার সংক্রমণ বাড়বে বৈ কমবে না।

মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে যাত্রী ও বাস শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য দুটি জীবাণুনাশক টানেল থাকলেও তা বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। জীবাণুনাশক টানেলগুলো সেন্সর থাকায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্প্রে করার কথা থাকলেও বন্ধ থাকায় সেটি কাজ করছে না। তবে প্রশাসনের লোকজন ও সাংবাদিকদের দেখলেই টানেলগুলো সক্রিয় করা হয়। টানেল বন্ধ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে দায়িত্বে থাকা লোকজন তা অস্বীকার করে বলেন, জীবাণুনাশক না থাকায় স্বল্প সময়ের জন্য বন্ধ ছিল। জীবাণুনাশক দিয়ে তা আবার সচল করা হয়েছে। দেখা গেছে, শ্রমিকদের মধ্যে অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মানার ক্ষেত্রে একেবারেই অমনোযোগী। আবার দেখা যায় বাসে যাত্রী ওঠাতে গিয়ে সামাজিক দূরত্ব না মেনে যাত্রীদের গা ঘেঁষে কথা বলতে। এতে করে অনেক যাত্রীই বিরক্তিভাব প্রকাশ করেছেন।

জামালপুলগামী ফাতেমা, সাজু, রফিক বিরক্তি নিয়ে জানান, বাড়ি যাওয়ার জন্য টার্মিনালে এলাম। বাসের লোকজন করোনার এই সময়ে দূর থেকে কথা বলবে তা না, পারলে গায়ের ওপর উঠে বসে। করোনার সময় এরা একটু দূরত্ব বজায় রেখে কথা বললে কি হয়। যাত্রীরা কি সব পালিয়ে যাচ্ছে? প্রশ্ন রাখেন তারা। মহাখালী বাস টার্মিনালে জীবাণুনাশক টানেল থাকলেও সায়েদাবাদ ও গাবতলী বাস টার্মিনালে জীবাণুনাশক টানেল চোখে পড়েনি। তবে দেখা গেছে, বাসে যাত্রী উঠানোর সময় কিছু বাস স্টাফ জীবাণুনাশক স্প্রে করছেন।

ঢাকা আন্তঃমহানগর রুটে যে সকল বাস চলে সেগুলোতে শুরুর দিকে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মানার প্রবণতা থাকলেও বর্তমানে তা একেবারে নেই বললেই চলে। যাত্রী ওঠানোর ক্ষেত্রে গা ঘেঁষে যাত্রী উঠানো হচ্ছে। বাসের কর্মীদের অনেকের মাস্ক নেই, আর কারো কারো থাকলেও তা মুখের নিচে নামানো থাকে। তার ওপর বর্ধিত ৬০ শতাংশ ভাড়া আদায় করার কথা থাকলেও নেওয়া হচ্ছে দ্বিগুণ ভাড়া। ফার্মগেট থেকে গুলিস্তানগামী কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে ফার্মগেট থেকে গুলিস্তানের ভাড়া ছিল ১০ টাকা। ৬০% বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাড়া হওয়ার কিছু ছিল ১৬ টাকা। কিন্তু জন প্রতি নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা। শুধু তাই নয় যাত্রীদের উঠানোর সময় যে জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয় তার মাঝে পানি ছাড়া আর কিছু নেই বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

যাত্রীরা জানান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, স্যাভলন, ব্লিচিং পাউডারের তো একটা গন্ধ থাকে। বাসের স্টাফরা যেটা স্প্রে করেন সেখানে কোনো গন্ধ পাওয়া যায় না।

এ বিষয়ে বিহঙ্গ, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, ৮ নং বাসের কয়েকজন স্টাফ ভাড়া দ্বিগুণ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, করোনার এই সময়ে যাত্রী একেবারেই কম। তার ওপর আবার এক আসন ফাঁকা রাখতে হচ্ছে। যে ভাড়া উঠে তাতে দৈনিক জমা ও স্টাফদের মজুরি দেওয়াই হয়ে উঠে না। জীবাণুনাশকের বদলে শুধু পানি ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জানান এমন অভিযোগ সত্য নয়। তারা জীবাণুনাশকই ব্যবহার করছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে কি না সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। এক্ষেত্রে একজনকে যদি সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করতে পারি তাহলে অনেকেই নিরাপদ থাকবে। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতির সহ-সভাপতি আবুল কালাম জানান, গণপরিবহনে সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মানার বিষয়ে পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বিভিন্ন রুটে কমিটি করে দেওয়া আছে। তারাই এগুলো দেখাশোনা করছেন। যে অভিযোগগুলো করা হয়েছে সে বিষয়ে আমরা খতিয়ে দেখছি।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও দেখা গেছে একই চিত্র। সেখানেও গণপবিহনগুলোতে নেই স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্বের বালাই। আর সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে নেওয়া হচ্ছে দ্বিগুণ ভাড়া। নগরীর ওয়াসা মোড়, জিইসি, ২নং গেট, মুরাদপুর, অলঙ্কারসহ বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা গেছে এমন অবস্থা। এখানকার বাস স্টাফরাও জানান, যাত্রী কম থাকায় দৈনিক জমা ও স্টাফদের বেতন ঠিকমত দেওয়া যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মানার বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জানান, আমরা এ সকল বিষয়ে মানার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মালিক পরিবহন সমিতির মহাসচিব বেলায়েত হোসেন বেলাল বলেন, আমরা এমন অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হচ্ছে। সরকার নির্দেশনা অনুযায়ী সবাইকে গাড়ি চালাতে বলা হয়েছে। গাফিলতির কারণে যদি এ বিষয়ে প্রশাসন গাড়ির স্টাফদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় তাহলে আমাদের কোনো দায়-দায়িত্ব থাকবে না।