ঐতিহ্যের পাটের নিঃসঙ্গ অন্তিমযাত্রা

ঢাকা, শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২০ | ২৩ শ্রাবণ ১৪২৭

ঐতিহ্যের পাটের নিঃসঙ্গ অন্তিমযাত্রা

জাফর আহমদ ১০:০৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ০২, ২০২০

print
ঐতিহ্যের পাটের নিঃসঙ্গ অন্তিমযাত্রা

ইতিহাস ঐতিহ্যের স্মারক পাটখাতের ইতি ঘটছে যাচ্ছে। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে কোনোমতে টিকে ছিল সরকারি পাটকল। সম্প্রতি পাটমন্ত্রীর ঘোষণার মধ্য দিয়ে পাট যুগের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পরপরই রাষ্ট্রায়ত্ত পাটশিল্পের যাত্রা। ১৯৭২ সালের পাটকলের সংখ্যা ৭৭টি থাকলেও ২০২০ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩২টিতে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া ও পরে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলযুগের সূচনার কারণে আওয়ামী লীগ সরকারকে আপনজন মনে করেন এ খাতের শ্রমিকরা। এ বিষয়ে প্রবীণ পাটকল শ্রমিক নেতা ও বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি শহিদুল্লাহ চৌধুরী খোলা কাগজকে বলেন,  অতীতে পাটকলের দুর্দিনে আওয়ামী লীগ সঙ্গে থেকেছে। ১৯৮৪ সালে জেনারেল এরশাদ পাটকল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। সে সময় শ্রমিকরা আন্দোলন করে তা প্রতিরোধ করেন।

সে আন্দোলনে ১৪ জন শ্রমিক জীবন দেন। ১৯৯৩ সালে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সাইফুর রহমানের এক চুক্তির আলোকে পাটকলকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার চেষ্টা করে খালেদা জিয়া সরকার। সে সময়ও শ্রমিকরা আন্দোলন করে ঠেকিয়ে দেন। সে আন্দোলনে ১৭ জন শ্রমিক জীবন দেন। এসব আন্দোলনে থেকেছে আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়  এসে নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়। ২০০৯ সালের ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ কিছু উদ্যোগ নেওয়ার ফলে পাটকল লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়। এ অবস্থা ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত চলতে থাকে। তারপর আর পাটের দিকে খেয়াল করেনি বর্তমান সরকার। এবার পিপিপিতে পাটকল চালুর নামে আগের সরকারগুলোর পথ অনুসরণ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার।

পাটের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ নামের প্রিয় মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম। পাটকল শ্রমিকরা স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ডাকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন পাটকল শ্রমিকরা। ১৯৬৯ সালের অসহযোগ আন্দোলন থেকে শুরু করে সব আন্দোলেন পাটকল শ্রমিকরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

তথ্যানুযায়ী, ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ রাষ্ট্রপতির আদেশে ‘পিও ২৭’ (বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজেস ন্যাশনালাইজেশন অর্ডার ১৯৭২) অনুযায়ী ব্যক্তি মালিকানাধীন ও পরিত্যক্ত পাটকলসহ সাবেক ‘ইপিআইডিসি’ -এর মোট ৬৭টি পাটকলের তদারকি, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন গঠিত হয়। ১৯৮১ সালে এর নিয়ন্ত্রণাধীন মিলের সংখ্যা ছিল ৮২। এসব পাটকল প্রতিষ্ঠাকালে ব্যক্তি মালিকানাধীন হিসেবে প্রতিষ্ঠা হলেও স্বাধীনতা পরবর্তী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভাবনা থেকে পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া এসব পাটকল রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়।

এসব পাটকলের অধিকাংশের অনেক সম্পত্তি ও শ্রমিকদের কল্যাণে স্কুল এবং শ্রমিক কলোনি থাকার কারণে সমাজতান্ত্রিক যে ভাবনা থেকে সরকার জাতীয়করণ করে, তা অনেকটাই সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু পরবর্তীতে দক্ষতার অভাব, সরকার বদল ও সরকার ব্যবস্থায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিপরীতে উদার মুক্তবাজার ব্যবস্থা প্রাধান্য পাওয়ায় সরকার। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি হালকা হতে থাকে। একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদের ওপর বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নজর পড়ার কারণে সরকারি এসব পাটকল বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়।

সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন খোলা কাগজকে বলেন, বিশ্বব্যাংক ও সাম্রাজ্যবাদী দাতাগোষ্ঠীর পরামর্শ ও চাপে ১৯৮২ সালের পর বিরাষ্ট্রীয়করণ ও পাটশিল্প থেকে পুঁজি প্রত্যাহার শুরু হলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হওয়া শুরু হয়। ২০০২ সালে ‘অজগর’ আখ্যা দিয়ে বন্ধ করা হয় আদমজী। পাটশিল্পকে ‘সানসেট ইন্ডাস্ট্রি’ আখ্যা দিয়ে একে বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে একের পর এক কারখানা বন্ধ হতে হতে বর্তমানে বিজিএমসির পাটকলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২টি।

এর মধ্যে চালু রয়েছে ২৫টি, মামলা এবং বিচারাধীন পাঁচটি, একটি নিয়ে বিক্রয়োত্তর মামলা, একটিতে ভিসকস উৎপাদন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকার করোনাকালে এসে এ ২৫টি পাটকল গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে (পিপিপি) পাটকল আধুনিকায়ন করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ি ফেরত পাঠানোর উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আধুনিকায়নে সরকারের এ কথায় আস্থা রাখতে পারছে না পাটসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে,  আধুনিকায়নের নামে পাটকলের সম্পত্তি লুটপাট হবে।

এ বিষয়ে প্রবীণ পাটকল বিশেষজ্ঞ শহিদুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আমলাদের কথা শুনলে মনে হয় বিষয়টি ভালোর দিকেই যাচ্ছে। এর আগেও আমাদের অনেক কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ১৪টি পাট-বস্ত্রকল ১৯৯৭ সালে তৎকালীন সরকারের আমলে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে শ্রমিকদের বিদায় করা হয়েছিল। তখনও বলা হয়েছিল পরবর্তী সময়ে এ কারখানাগুলো আধুনিকায়ন করে চালু করা হবে। আরও বলা হয়েছিল ব্যক্তিমালিকানায় আরও সফলভাবে এ কারখানাগুলো চালানো যাবে। কিন্তু সেগুলো আর আলোর মুখ দেখেনি।

পাটকলের সঙ্গে ৭০ হাজার শ্রমিকের পেছনে চাষি মিলে প্রায় কোটি মানুষের ভাগ্য জড়িয়ে আছে। পাটশিল্প বন্ধ হলে পাটের বাজার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করবে বেসরকারি পাটকল মালিকরা। ফলে সরকার ইচ্ছা করলেও কৃষককে পাটের দাম পাইয়ে দিতে ভূমিকা রাখতে পারবে না।

রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, এসব পাটকল বন্ধ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে একদিকে শ্রমিকের আহাজারি অন্যদিকে কারও কারও লোভে চকচক করা চোখ দুটিই দেখছি আমরা। সরকারি কারখানার বিশাল জায়গা, ২৫টি কারখানায় কমপক্ষে ২৬০০ একর জায়গা যার বাজারমূল্য একেবারে কম করে হলেও ১৩ হাজার কোটি টাকা। রাস্তা, গোডাউন, নদীর ঘাট, যন্ত্রপাতি মিলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ কে বা কারা পাবে? পিপিপির নামে রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার এ আয়োজন অনেক দিন দুঃখের সঙ্গে মনে রাখবে দেশের মানুষ। স্বাধীনতার পর পাটের গুদামে আগুন দিয়ে একদল যেমন সুবিধা নিয়েছিল, আজ পাট শ্রমিকদের কপালে আগুন দিয়ে আর একদল লাভের হিসাব কষছে।

জিনম আবিষ্কারের ফলে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছিল পাটে। সরকারের পক্ষ থেকেই বলা হয়েছিল পাটকলগুলোকে সংস্কারের মাধ্যমে আবার নতুন জীবন দেওয়া হবে। বিকল্প উৎপাদনের জন্যও নানা উদ্যোগের কথা বলে হয়েছিল। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর পাটকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্যোগ নেয়। পাট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা হয় পাটে অভিজ্ঞ মানুষদের। ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত লাভের মুখ দেখে।

পাট খাতের অভিজ্ঞ জনবল অবসরে চলে গেলে আবার পাট লোকশানের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে থাকে। পাটের বদলে পাটের অফিস চাকচিক্য করা হয়। সরকারের আগের উদ্যোগও হারিয়ে যায়। এরপর গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের পুরনো পথে যাত্রার ঘোষণা আসে সরকারের তরফে।  

পাটকে পুরোপুরি বন্ধ করার বাজারের প্রয়োজনভিত্তিক কয়েকটি পাটকলকে আধুনিক করে শ্রমিক-সরকার যৌথ ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব করে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্যপরিষদ-স্কপ। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে অভিজ্ঞ মানুষ যুক্ত ছিলেন।  এজন্য প্রস্তাব করা হয় এক হাজার কোটি টাকা। যা বিভিন্ন পর্যায়ে আধুনিক পাটকলে পরিণত করতে খরচ হবে। অন্যদিকে বিজেএমসির পক্ষ থেকে বিএমআরই করার জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়। শেষ অবধি কোনো পথেই না গিয়ে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করে পাটকল বন্ধের প্রস্তাব করা হয়।