পোশাক শিল্পাঙ্গন উত্তপ্ত ক্ষোভে ফুঁসছেন শ্রমিক

ঢাকা, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২০ | ১৯ আষাঢ় ১৪২৭

পোশাক শিল্পাঙ্গন উত্তপ্ত ক্ষোভে ফুঁসছেন শ্রমিক

জাফর আহমদ ১০:৪১ অপরাহ্ণ, জুন ০৬, ২০২০

print
পোশাক শিল্পাঙ্গন উত্তপ্ত ক্ষোভে ফুঁসছেন শ্রমিক

জুন মাসেই শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হবেÑ বিজিএমইএ সভাপতির এমন বক্তব্যে পোশাক শিল্পের পরিবেশ উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। যে কোনো সময়ে শ্রমিক অসন্তোষে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হতে পারে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর তৃণমূল পর্যায়ে যোগযোগ শুরু হয়েছে। কোনো বিশেষ এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটলে তা শিল্পজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। শ্রমিক নেতৃবৃন্দের বক্তব্যে এমন আভাস মিলছে।

পোশাক শিল্পের দুই প্রধান সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা বলছেন, করোনা মহামারীর কারণে যে পরিমাণ কার্যাদেশ তারা হারিয়েছেন তাতে পুরো শ্রমিক কোনোভাবেই রাখা সম্ভব নয়। ঈদের আগে মানবিক দিক বিবেচনা করে শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়নি। কিন্তু বেশি দিন রাখা যাবে না। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কার্যাদেশ আসবে, শ্রমিক রাখা যাবে- এমন সম্ভাবনাও নেই। আবার এখন যে কাজ আছে তাতে কারখানা ভেদে ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ শ্রমিক রাখা সম্ভব হবে। গড়ে এর হার আরও কম হবে। এ অবস্থায় শ্রমিক ছাঁটাই করা ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই। আর এতে শ্রমিক ছাঁটাই হতে পারে ৮ থেকে ৯ লাখ। 

বিজিএমইএ সভাপতির এ ধরনের বক্তব্যের ফলে শ্রমিক সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিবাদের পাশাপাশি এই বক্তব্যের ভিন্ন কারণ অনুসন্ধান করছে। সংগঠনগুলো বলছে, সামনে বাজেটে বিজিএমইএ একগুচ্ছ প্রস্তাব দিয়েছে এগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা খুবই কম। এর মধ্যে ভ্যাট-ট্যাক্স কমানোর পাশাপাশি নগদ সহায়তা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের সহায়তার জন্য ইতোমধ্যে সরকার বেশ কিছু প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। ফলে বাজেটে নতুন করে আরও বেশি সুযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

এ জন্য শ্রমিক ছাঁটাই করে সরকারকে চাপে ফেলে সুবিধা আদায় করতে চায়। এর পাশাপাশি কর্মহারা শ্রমিকদের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকার সহায়তার দিকেও বিজিএমইএ-বিকেএমইএ’র দৃষ্টি রয়েছে। শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে তৈরি পোশাক শিল্পকে অস্থির করে তুলে এ সহায়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি তহবিল মালিক পক্ষের অনূকূলে নিয়ে আসতে পারবে।

একোর্ডকে বিদায় করে আরএসসি গঠনের মাধ্যমে বিদেশি সংস্থাটিকে নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতার আলোকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকার তহবিলও তারা নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। এ কারণে করোনা মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ ও সহায়তা ঘোষণার পর প্রকাশ্যে শ্রমিক ছাঁটাই করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং তা বাজেটকে সামনে রেখে। শ্রমিক নেতাদের মাঝে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। 

এ ব্যাপারে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি অ্যাডভোকেট মন্টু ঘোষ বলেন, করোনাকালে শ্রমিক ছাঁটাইয়ে বিজিএমইএ সভাপতির বক্তব্য কোনোভাবেই বাস্তবায়ন হতে দেওয়া হবে না। শ্রমিক ছাঁটাই করা হলে বিজিএমইএ সভাপতিকে ছাঁটাই হতে হবে। তৈরি পোশাক শিল্পে সংগঠনটির প্রভাব রয়েছে। এ শিল্পে যে কয়েকটি কর্মতৎপরতা নির্ভর সংগঠন রয়েছে তার মধ্যে এটি একটি। সংগঠনটি যে বক্তব্য দিয়েছে একেবার আক্ষরিক অর্থেই সত্য। রোমানা হকের বক্তব্যের ফলে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মাঝে চাকরি চলে যাওয়ার ভীতি তৈরি হয়েছে। সেখান থেকে কোনো অসন্তোষ তৈরি হলে সংগঠনটি তা ‘পিক’ করে সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।

সিপিবির বাইরে অন্যান্য বাম সংগঠনের মোশরেফা মিশু ও ইসমাইল হোসেন মাহবুবের নেতৃত্বে গার্মেন্ট শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের বুদ্ধি বৃত্তিক আন্দোলনের ঐতিহ্য রয়েছে। ইতোমধ্যে সংগঠনটি তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে। সংগঠনটি আগামী ১০ জুন সারা দেশে গার্মেন্ট শিল্পাঞ্চলে প্রতিবাদ সভা করবে। এর মধ্যে বিজিএমইএ’র সভাপতি তার বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে ১২ জুন শুক্রবার সারা দেশে অনলাইনের মাধ্যমে প্রতিবাদ বিক্ষোভ কর্মসূচি শেষে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এর মাধ্যমে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার অভীষ্ট নির্ধারণ করেছে সংগঠনটির। ২০১৩, ২০১৮ সালে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার আগে যে শ্রমিক আন্দোলন হয়েছিল তখনো এ সংগঠনগুলো এ ধরনের ভূমিকা রেখেছিল।

রুমানার হকের বক্তব্যকে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের শ্রমিক সংগঠন-গার্মেন্ট শ্রমিক ফ্রন্টও ভালোভাবে নেয়নি। নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ে পোশাক শ্রমিকদের মাঝে তাদের শক্ত ভিত্তি রয়েছে। এছাড়া শ্রমিকদেরে মধ্যে এক সুতোয় গাঁথার মতো চেইন রয়েছে কল্পনা আক্তার-বাবুল আক্তার ও নাজমা আক্তার নিয়ন্ত্রিত দুটি শ্রমিক বলয়ে। সংগঠন দুটির বেসিক ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মসূচি পালন না করলেও শিল্পাঞ্চলগুলোতে শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে।

বিজিএমইএ সভাপতির ঘোষণা মতো শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হলে তাদের সদস্যরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারাও বিজিএমইএ সভাপতির বক্তব্য ভালোভাবে নেয়নি। ইতোমধ্যে তারা বিবৃতিও দিয়েছে। বিজিএমইএ সভাপতির কথা মতো শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হলে সংগঠন দুটির সদস্যরা চাকরি হারানোর ভয় থেকেই মাঠে নামবে।

এ সব সংগঠনের প্রভাব পড়ে তৈরি পোশাক শিল্পের আঞ্চলিক সংগঠন, মালিক নিয়ন্ত্রিত বলে পরিচিত সংগঠন, ঝুট ব্যবসায়ীনির্ভর সংগঠন এবং আরও বেশ কিছু স্বতন্ত্র সংগঠন। কোনো এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হলে এবং এর পিছনে পরিচিত সংগঠনগুলো আছে বুঝতে পারলে এসব সংগঠনের বড় অংশ সরাসরি আন্দোলনে থাকবে।

শ্রমিক আন্দোলনের ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৬ সালের শ্রমিক আন্দোলন, ২০১০ ও ২০১১ সালের মজুরির আন্দোলন এবং ২০১৬ ও ২০১৭ সালের শ্রমিক আন্দোলনের আগে শ্রমিক সংগঠনগুলো যে ধরনের ক্ষুব্ধ ছিল এবারও সে রকম ক্ষুব্ধ। ওই শ্রমিক আন্দোলনের আগে শ্রমিক সংগঠনগুলো যেভাবে জনসংযোগ ও বক্তৃতা বিবৃতি দিতো এবারও সংগঠনগুলোর সে রকম প্রস্তুতি বিদ্যমান। পাশাপাশি নতুন উপসর্গ যুক্ত হয়েছে রুমানা হকের বক্তব্যের পর সব শ্রমিকের মাঝের চাকরির হারানোর আতঙ্ক আর এ থেকে ক্ষোভ। তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের ভাষ্য, এবার চাকরি হারাতে পারে ৮ থেকে ১০ লাখ শ্রমিক। শ্রমিক নেতারা মনে করছেন, ৪ জুন রোমানা হকের শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বক্তব্যের পর শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বক্তব্য প্রত্যাহার বা মালিকপক্ষের শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া না হলে তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ অবশ্যম্ভাবী।