ঢাকা ওয়াসার অভ্যন্তরে সেবা প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির আখড়া

ঢাকা, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২০ | ১৯ আষাঢ় ১৪২৭

ঢাকা ওয়াসার অভ্যন্তরে সেবা প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির আখড়া

তোফাজ্জল হোসেন ১০:৩৬ অপরাহ্ণ, জুন ০৬, ২০২০

print
ঢাকা ওয়াসার অভ্যন্তরে সেবা প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির আখড়া

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে সংস্থার ১০ অঞ্চলে বিভিন্ন পদে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ৭৫৪ জন লোক নিয়োগ দেওয়ার খবরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি টক অব দ্য ঢাকা ওয়াসায় পরিণত হয়েছে। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে রাজস্ব বিভাগে এবং মটসজোন হেলপার, পাম্প অপারেটর, ক্লিনার এবং ডিএমএ ম্যানেজার ও সহকারী ম্যানেজার পদে। সূত্র জানায়, ঢাকা ওয়াসার সীমাহীন দুর্নীতির কারণে সুপেয় পানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া এ সংস্থার প্রতিটি প্রকল্পে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। আর প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের জবাবদিহি না থাকায় সেবাদানকারী এ প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সুপেয় পানিসহ মডস জোনগুলোয় মিলছে না নিরবচ্ছিন্ন পানি।

বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতি হওয়ার কারণে মিটার রিডিং, নলকূপ স্থাপন, ভৌতিক বিল, ঠিকাদার নিয়োগসহ ১১টি খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করেছে দুদক। একই সঙ্গে তা প্রতিরোধে ১২টি সুপারিশ করে গত বছর ১৮ জুলাই স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন দুদক কমিশনার ড. মো. মোজ্জাম্মেল হক। কিন্ত বাস্তবে দুর্নীতির শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। উল্টো দুর্নীতি অনিয়ম বাড়ছেই।

সংশ্লিষ্ট সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, এমডির স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ, চরম স্বেচ্ছাচারী কর্মকা- এবং নিয়মবহির্ভূত কার্যকলাপের কাছে শ্রমিক-কর্মচারীরা জিম্মি। প্রতিবাদ করলে তাদের বরখাস্ত করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

শ্রমিক-কর্মচারীদের অভিযোগ, ঢাকা ওয়াসায় পানি ও নানা খাত থেকে আদায় হয়েছে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। এই টাকা অর্জিত হয়েছে ও হচ্ছে এসব শ্রমিক-কর্মচারীর ঘামে। ওয়াসার এমডি শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রকৃত পাওনা পরিশোধ করেন না।

ঢাকা ওয়াসা শ্রমিক ইউনিয়ন সিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক আশকার ইবনে শাইখ খাজা বলেন, ক্ষমতা বলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমডি একের পর এক কর্মচারী বিরোধী কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা নগরীতে ১০০টি পাম্প স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে অনেক শ্রমিক কর্মকর্তা-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়বেন। এমডির এই সিদ্ধান্ত দ্রুত বাতিল করতে হবে। অন্যথায় শ্রমিকরা আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করবেন। আরেক শ্রমিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওয়াসার শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন এমডির সাজানো নাটক।

ওয়াসার একটি সূত্র জানায়, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতনের তালিকা সংস্থায় নেই। তবে ১০ অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলীরা সরাসরি রাজস্ব বিভাগে তালিকা পাঠায় এবং সেই আলোকে তাদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এমডি, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা, ১০ অঞ্চলের নির্বাহী কর্মকর্তা ছাড়া এ সম্পর্কিত সঠিক তথ্য কারও হতে নেই।  

জানা গেছে, সংস্থায় উন্নয়নের নামে গত ১১ বছরে শতশত কোটি টাকা লুটপাট করার অভিযোগ উঠলেও বাস্তবে তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার সাহস পায়নি। তার খুঁটির জোর কোথায় তা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে টিআইবি, দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিবেদন দাখিল করার পরও ক্ষমতার দাপটে নানা অপকর্ম অব্যাহত রেখেছেন। অবসরপ্রাপ্তরা প্রকৌশলীদের চাকরি মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও চুক্তিতে নিয়োগ দিচ্ছেন। এখানে যোগ্য প্রকৌশলীরা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা মেধার চর্চা থেকে পিছিয়ে পড়ছেন। একজন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাকসিম স্যার ঢাকা ওয়াসার চেইন অব কমান্ড ভেঙে ফেলেছেন। তিনি তার পছন্দের প্রকৌশলীদের চাকরি থেকে অবসরের পরও চুক্তিতে নিয়োগ দিয়েছেন।

ঢাকা ওয়াসার কয়েকজন শ্রমিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল শনিবার দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, তাকসিম খানের চুক্তির মেয়াদ আগামী ২০ অক্টোবর শেষ হচ্ছে। বর্তমান সরকারের সময় এমডি একাই ১১ বছর সংস্থায় থাকায় লুটপাট করেছে বহুগুণ। যা তদন্ত করলেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে নি:সন্দেহে। এবারও তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

আতাউল করিম হারুন নামে এক নেতা দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, ওয়াসার অর্গানোগ্রাম এমডির ইচ্ছে মতো তৈরি করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের স্বার্থ বাস্তবায়ন করে শ্রমিকদের পেটে লাথি মারা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।