করোনার নমুনা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা 

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২০ | ২৫ আষাঢ় ১৪২৭

করোনার নমুনা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা 

মাজহার মুনতাসসির  ৯:৫৪ অপরাহ্ণ, জুন ০৫, ২০২০

print
করোনার নমুনা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা 

বাংলাদেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় করোনাভাইরাস পরীক্ষায় শুরু থেকেই কাজ করে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকায় শাহবাগে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগ। মাত্র ৩০ টাকার বিনিময়ে টিকিট কেটে যে কেউ করোনা পরীক্ষা করাতে পারেন। শুরুর দিকে করোনা পরীক্ষা করানোর জন্য সেই ভোর রাতে এসে লাইন ধরতে হতো। সেই লাইন দুদিক থেকে শাহবাগ মোড় আর সাবেক হোটেল রূপসী বাংলা পর্যন্ত চলে যেত। আগতদের দুর্গতির কথা চিন্তা করে ভাইরোলজি বিভাগ গত ১৮ মে থেকে অনলাইনে আবেদনের মাধ্যমে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করে। অনলাইনে আবেদনের মাধ্যমে এক ঘণ্টা পর পর ৫ ভাগে আগতরা তাদের নমুনা দিয়ে যেতে পারেন।

শুরুর দিকে আগতদের সুরক্ষায় দুটি জীবাণুনাশক টানেল স্থাপন করা হয়। কিন্তু কদিন না যেতেই সেই টানেল দুটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। জানানো হয় বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে এই জীবাণুনাশক টানেলে উপকারের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি।

এদিকে টানেল বন্ধ করলেও আগতের সুরক্ষায় কোনো হ্যান্ডওয়াশ বা হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা করেনি কর্তৃপক্ষ। গত কয়েক দিন পুরাতন বেতার ভবনে গিয়ে এই দৃশ্য দেখা গেছে। সেখানে দায়িত্বে থাকা ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী ও আনসার সদস্যরা করোনা প্রতিরোধক পোশাক বা পিপিই ব্যবহার করলেও করোনা পরীক্ষা করাতে আসা ব্যক্তিদের জন্য কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এমনকি করোনার নমুনা জমার দেওয়ার ফরম পূরণে জন্য যেখানে কলম রাখা হয়েছে সেখানে ন্যূনতম সামাজিক দূরত্ব মানা হয় না। সেই কলমগুলোতেও জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয় না।

এখানে করোনা টেস্ট করাতে আসা অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, আগতদের কে করোনা পজিটিভ বা নেগেটিভ তা রিপোর্ট না পাওয়ার আগ পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না। কিন্তু এখানে আগতদের জন্য যে সুরক্ষার ঘাটতি রয়েছে তাতে করে যারা সুস্থ রয়েছেন তারা আক্রান্ত হচ্ছেন না তো? সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

মাহমুদুল হাসান একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন। পরিবারসহ থাকেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মানিকদি এলাকায়। রোজার শেষ দিকে হঠাৎ করে তার হালকা জ¦র ও সর্দি-কাশি দেখা দেয়। এ জন্য তিনি ওষুধও সেবন করেন। কিন্তু কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় গত ২২ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যায়ের অধীনে পুরাতন বেতার ভবনে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়ে আসেন। পরে রাতে মোবাইল ফোনে মেসেজের মাধ্যমে জানতে পারেন তার করোনা পজিটিভ। সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে পারিবারিকভাবে আইসোলেটেড করে ফেলেন। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ম মেনে চলে এক পর্যায়ে সুস্থবোধ করেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন দ্বিতীয় দফায় নমুনা দেওয়ার জন্য। এসেই তিনি হতাশ হয়ে পড়েন।

তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, প্রথমবার নমুনা দেওয়ার সময় এখানে আগতদের সুরক্ষায় যে তৎপরতা দেখা গিয়েছিল তা আর নেই। জীবাণুনাশক টানেল বন্ধ, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা নেই, স্যানিটাইজার নেই, ফরম লেখার জায়গা ও কলমে জীবাণুনাশক ছিটানোর ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে একমত পোষণ করেন রাজধানীর উত্তরায় একটি বায়িং হাউজে কাজ করা সজীব। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, গত বুধবার আমি নমুনা দিয়ে গেছি এখানে। রাতে মেসেজের মাধ্যমে জানানো হয় আমার করোনা নেগেটিভ। চাকরির সুবাদে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। কিন্তু এখানে যে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত তাতে যার নেগেটিভ এসেছে তিনি যে এখান থেকে করোনায় আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছেন না, এটা কি কেউ নিশ্চিত হয়ে বলতে পারবেন?

কাঁটাবন থেকে আসা বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সীমা ইসলাম ও পান্থপথ থেকে আসা গৃহিণী নাজমা বেগম বলেন, কয়েকজনের কাছে শুনেছি এখানে করোনা পরীক্ষা করা হলেও আগতদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত। তাই নিজের সুরক্ষার জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজার সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। যাতে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারি।

শেখ মুজিব মেডিকেলে নমুনা দিতে যাওয়ার বিরূপ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক শাহেদ শফিক বলেন, মে মাসের শুরুর দিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অফিসে যাই সংবাদের প্রয়োজনে। পরের দিন জানতে পারি ওই অফিসে এক কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত। পরে অফিস থেকে করোনার নমুনা পরীক্ষা জন্য বললে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ে যাই। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি দীর্ঘ সারি। সামাজিক দূরত্ব নেই। স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও উপেক্ষিত। পরে বাসায় চলে আসি। কয়েক দিন একা থাকি আর নিয়ম মেনে চলি। কিন্তু আমার মাঝে করোনার কোনো লক্ষণ দেখা দেয়নি। আমি পুরোপুরি সুস্থ। বর্তমানে করোনার পরীক্ষা করতে যাওয়া মানে সুস্থ লোক করোনায় আক্রান্ত হওয়া- একথা বলাই যায়।

গত কয়েক দিন পুরাতন বেতার ভবনে করোনা পরীক্ষা করতে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ করা দেখা গেছে, বেশির ভাগের হাতে গ্লাভস আর হ্যান্ড স্যানিটাইজার নেই।

করোনা পরীক্ষা করতে আসা মানুষদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ডা. নাজমুল করিমের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তার অফিস থেকে পরিচালক (হাসপাতাল) অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়। পরিচালক (হাসপাতাল) অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রোকনকে স্বাস্থ্য সুরকার বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশ অনুযায়ী জীবাণুনাশক টানেলে ক্ষতি হয় বিধায় তা বন্ধ রাখা হয়েছে। আর করোনা যেহেতু হাতের মাধ্যমে বেশি ছড়ায় তাই পরীক্ষা করাতে আসাদের জন্য ফরম পূরণের কলম আর বসার জায়গায় ঘণ্টাখানেক পর পর জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয়। তাই এখানে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নেই।

আগতদের হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা যায় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন ব্যস্ত আছি। পরে কথা বলব। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত কলম বা বসার জায়গা একজন ব্যবহারের পর আরেকজন ব্যবহার করার আগে জীবাণুনাশক ছিটালে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে না।