হয়রানির আরেক নাম করোনা হটলাইন

ঢাকা, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২০ | ২৩ আষাঢ় ১৪২৭

হয়রানির আরেক নাম করোনা হটলাইন

মাজহার মুনতাসসির ৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ, জুন ০৩, ২০২০

print
হয়রানির আরেক নাম করোনা হটলাইন

বিশ্বব্যাপী এক মহাআতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। বাংলাদেশেও পিছিয়ে নেই এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে। গত ৮ মার্চ প্রথম বাংলাদেশে করোনা রোগীর সন্ধান মেলে। দিন দিন এর সংক্রমণের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। করোনা রোধে গত ২৬ মার্চ থেকে ছয় দফা বাড়িয়ে সাধারণ ছুটি করা হয় ৩০ মে পর্যন্ত। ৩১ মে স্কুল-কলেজ ছাড়া অফিস-কারখানাসহ সব কিছু চালু করা হয়। অনেক দিন বন্ধ আর কর্মীরা বাড়ি বা বাসায় থাকায় এখন নিয়ম করা হয়েছে করোনা পরীক্ষা করে রিপোর্ট জমা দিয়ে অফিস করতে হবে।

রাজধানী তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়ায় স্ত্রীসহ থাকেন রিয়াজুল ইসলাম। একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন। ঈদের কয়েক দিন আগে তার স্ত্রীর জ¦র হয়। তবে ওষুধ খাওয়ার দুদিন পরই তার স্ত্রী সুস্থ হয়ে যান। কিন্তু স্ত্রীর জ্বরের কথা কোনোভাবে জেনে যায় তার অফিস কর্তৃপক্ষ। অফিস থেকে বলা হয়েছে, তার ও স্ত্রীর করোনা পরীক্ষা করাতে হবে।

রিয়াজুল প্রথমে স্বাস্থ্য বাতায়নের হটলাইন ১৬২৬৩ নাম্বারে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। সারা দিন চেষ্টার পর ওই নাম্বারে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সমর্থ হন। তারা তাকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনা পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। কিন্তু দিনমান বহু চেষ্টা করেও অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করতে ব্যর্থ হন তিনি।

একপর্যায়ে জানতে পারেন পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালে করোনা পরীক্ষা করা হয়। ২৯ মে রাত সাড়ে ৩টার দিকে স্ত্রীকে নিয়ে স্কয়ার হাসপাতালে গিয়ে দেখেন পরীক্ষার জন্য দীর্ঘলাইন। সময় যত বাড়তে থাকে করোনা পরীক্ষার লাইন আরও দীর্ঘ হতে থাকে। সকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, কিট স্বল্পতার কারণে ২০ জনের নমুনা সংগ্রহ করা যাবে।

তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। সেখানেই তিনি জানতে পারেন, ধানমন্ডিতে আনোয়ার খান হাসপাতালেও করোনার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ওখানে গেলে জানতে পারেন আগে হটলাইনে যোগাযোগ করতে হবে তারপর সিরিয়াল পেলে নমুনা সংগ্রহ করা হবে। এরপর তিনি বনানীর প্রভা হেলথ হাসপাতালে যান। সেখানে জানানো হয়, তারা বাড়ি গিয়ে করোনার নমুনা সংগ্রহ করেন। হাসপাতালে সরাসরি সংগ্রহ করা হয় না। তাই হটলাইনে যোগাযোগ করে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

এরপর রিয়াজুল প্রভা হেলথে হেল্প লাইনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হন। এরপর করোনা পরীক্ষার যত হটলাইন আছে সবগুলোতে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন তিনি। এই অবস্থায় জানতে পারেন ব্র্যাকের সহায়তায় অনেক জায়গায় বুথের মাধ্যমে করোনার নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি মগবাজারের মধুবাগে আসাদুজ্জামান খান কমপ্লেক্সে গিয়ে স্ত্রীর করোনার নমুনা দিয়ে যান। তবে এর জন্য তাকে ভোর ৪টার দিকে এখানে আসতে হয়েছে। কারণ, ব্র্যাকের বুথগুলোতে সীমিত সংখ্যক নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

একটি দৈনিক পত্রিকায় কাজ করেন সাংবাদিক রাসেল (ছদ্মনাম)। মে মাসের মাঝামাঝি তিনি হালকা জ¦র অনুভব করেন। সাথে হালকা কাশি দেখা দেয়। গত ১৯ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনার নমুনা দিয়ে আসেন। ওই রাতেই মোবাইল ফোনে মেসেজের মাধ্যমে জানানো হয় তার করোনা পজিটিভ। সাংবাদিক রাসেল বাসায় আইসোলেশনে থাকেন এবং ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলেন। ২৫ মের পর থেকে রাসেল সুস্থ অনুভব করতে থাকেন। ১৪ দিন শেষ হলে রাসেল শেখ মুজিব মেডিকেলে করোনার নমুনা পরীক্ষার জন্য অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে ব্যর্থ হন। তিনি আবার স্বাস্থ্য বাতায়নের হটলাইনে যোগাযোগ করেন। তখন তারা করোনা পরীক্ষা করার জন্য আগারগাঁওয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার এবং সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যোগাযোগ করার জন্য দুটো টেলিফোন নাম্বার দেন। কিন্তু সাংবাদিক রাসেল ওদের নাম্বারে যোগাযোগের বহু চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

করোনার নমুনা বাসায় গিয়ে সংগ্রহ করে- এমন কয়েকটা কর্তৃপক্ষের নাম্বার পান রাসেল। সেগুলো হলো- প্রভা হেলথ, ডিএমএফআর মলিকিউলার ল্যাব অ্যান্ড ডায়াগনোস্টিক সেন্টার, সিএসবিএফ হেলথ কেয়ার এবং ইউএইচডিপি। বহু চেষ্টা করেও এদের প্রত্যেকটির হটলাইনে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হন তিনি। কোনো নাম্বারে সার্ভিস ম্যানেজার ব্যস্ত আবার কোনো নাম্বার বন্ধ। এছাড়া স্কয়ার হাসপাতাল, আনোয়ার খান হাসপাতাল, ল্যাবএইড ও ইউনাইটেড হাসপাতালের হটলাইনেও যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হন রাসেল। পরে মগবাজারের মধুবাগে আসাদুজ্জামান খান কমপ্লেক্সে ব্র্যাকের বুথে নমুনা পরীক্ষার করানোর জন্য যান।

সেখানে এই প্রতিবেদকের কাছে নিজেদের দূরাবস্থার কথা জানান নমুনা দিতে আসা বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র রাকিবুল, মাসুম, সাইদুল, গৃহিণী গুলশান আরা, সফুরা বেগম, রেডক্রিসেন্টের সার্ভিস হোল্ডার তাহমিনা আহমেদ, প্রাইভেট কোম্পানির অফিস সহকারী জব্বর ও খালেদ, অবসরপ্রাপ্ত ষাটোর্ধ্ব নুরুল ইসলাম ও অন্যরা। তারা বলেন, সব হটলাইনে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়ে আজ এখানে এসেছি।

কোনো দায়বদ্ধতা না থাকায় হটলাইনের লোকজন এমন অবহেলা করতে পারছেন বলে তারা অভিযোগ করেন। আবার এখানেও কোটা পদ্ধতিতে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাহলে মানুষ যাবে কোথায়। প্রতিদিন যে বুলেটিনে বলা হচ্ছে ১০ হাজার বা তার বেশি নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে- সেটা কি আসলেই সত্য নাকি আইওয়াশ?