করোনার সময়ে মাঠপ্রশাসন ও জনপ্রনিধিদের দ্বন্দ্ব চরমে

ঢাকা, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২০ | ২৩ আষাঢ় ১৪২৭

করোনার সময়ে মাঠপ্রশাসন ও জনপ্রনিধিদের দ্বন্দ্ব চরমে

তোফাজ্জল হোসেন ৬:২৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ০৩, ২০২০

print
করোনার সময়ে মাঠপ্রশাসন ও জনপ্রনিধিদের দ্বন্দ্ব চরমে

করোনা মোকাবিলায় ত্রাণ বিতরণসহ অন্যান্য সেবায় দুর্নীতি ও অনিয়মে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। নানা অভিযোগে ইতোমধ্যে গত তিন মাসে মোট ৮৫ জন জনপ্রতিনিধিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে ২৮ জন ইউপি চেয়ারম্যান, ৫১ জন ইউপি সদস্য, ১ জন জেলা পরিষদ সদস্য, ৪ জন পৌর কাউন্সিলর এবং ১ জন উপজেলা ভাইস-চেয়ারম্যান। জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এমন অভিযোগ মাঠ প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে থাকলেও তার ছাড় পেয়ে যাচ্ছেন। এতে চরম দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়হীনতা বিরাজ করছে জনপ্রতিনিধি ও মাঠ প্রশাসনের মধ্যে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ দ্বন্দ্ব অনেক আগে থেকেই লেগে আছে। তবে করোনার সময় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপের সুযোগ নিচ্ছে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। জনপ্রতিনিধিদের জনসেবায় অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতিবাদ করায় উদ্যেশ্যেমূলকভাবে জনপ্রতিনিধিদের হয়রানি করা হচ্ছে। আগের অভিযোগ সামনে আনা, বেনামে অভিযোগ করে বরখাস্ত করাচ্ছেন জনপ্রতিনিধিদের। দেশের বিভিন্নস্থানে ইউএনওদের দাপটে অসহায় হয়ে পড়েছেন উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তারা এ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। এতে স্থানীয় পর্যায়ে চরম সমন্বয়হীনতা বিরাজ করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১২ সালের একটি মামলা সামনে এনে সম্প্রতি নঁওগার বদলগাছী উপজেলা চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এর আগে গত ১৪ মে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আবু তাহিরের (ইউএনও) বিরুদ্ধে টেন্ডার ছাড়াই ভবন ভাঙা, দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিল থেকে ত্রাণ বিতরণের নামে পাঁচ লাখ টাকা তুলে এককভাবে ব্যয় করা এবং কৃষকের উপস্থিতি ছাড়াই লটারি করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে বদলগাছী প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শামসুল আলম খান। এ ঘটনার মাত্র চার দিন পর গত ১৮ মে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়।

ওই আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ডিএম এনামুল হক গত ১৪ মে নওগাঁর জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেছেন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. শামসুল আলম খানের বিরুদ্ধে বদলগাছী থানায় ২০১১ মামলা রয়েছে যা নওগাঁ বিজ্ঞ দায়রা জজ, দ্বিতীয় আদালতে বিচারাধীন। সেই মামলাকে সামনে এনে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে প্যানেল চেয়ারম্যান-১ কে উপজেলা পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।

তবে ওই অভিযোগের বিষয়ে নিজে কিছুই জানেন না স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ডিএম এনামুল হক। তিনি বলেন, অভিযোগের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। কে বা কারা আমার নাম ব্যবহার করে অভিযোগটি দিয়েছে। বরখাস্ত হওয়ায় উপজেলা চেয়ারম্যান শামসুল আলম খান বলেন, যে অভিযোগে আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছে, তা ২০১১ সালের ঘটনা। ওই অভিযোগে যদি আমাকে বরখাস্ত করা হয়, তাহলে ২০১৯ সালে ভোট করতে দেওয়া হলো কীভাবে। আমার প্রার্থিতা বাতিল হলো না কেন? ইউএনও এর স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদ করায় এভাবে আমাকে হেনস্তা করা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। এ ব্যাপারে ইউএনও মু. আবু তাহির বলেন, উনি আমার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছিল। এরপরে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে সরকার সে বিষয়টি আমাকে অবহিত করেছে।

এদিকে নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিরুেেদ্ধ উপজেলার চেয়ারম্যানসহ ৯টি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান তার বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। অভিযোগে বলা হয়, সব বরাদ্দে তার ঘুষ গ্রহণের ঘটনা ওপেন সিক্রেট। এমনকি গরীব মানুষের জন্য সরকারের অতিদরিদ্র কর্মসূচিতেও তিনি ঘুষ নেন ১৫ শতাংশ। ঘুষ দিতে অস্বীকার করায় স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করের (১%) নয় মাস ধরে জয়নগর ইউনিয়ন পরিষদে বরাদ্দ বন্ধ রেখেছেন তিনি। ওই ইউএনওর প্রতি জেলা প্রশাসকের আশীর্বাদ থাকার ফলে তিনি এমন বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এমন অভিযোগ তাদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ২১ অক্টোবর নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে যোগদেন হুমায়ুন কবির। ৩০ ব্যাচের এই কর্মকর্তা এর আগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেভিনিও ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়াও রায়পুরা উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে কাজ করেছেন তিনি। ইউএনও হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর জেলা প্রশাসকের প্রশ্রয়ে ঘুষ গ্রহণ, অর্থ আত্মসাতসহ সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- ও পৌরসভার উন্নয়ন কর্মকা-ের নামে ব্যাপক সরকারী অর্থ লুটপাটের অভিযোগ আনে শিবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারন সম্পাদকসহ ৯টি ইউনিয়নের সকল চেয়ারেম্যানরা। একই সাথে সরকারের সুনাম রক্ষায় দুর্নীতিবাজ ইউএনওর বদলীর দাবি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করে।

লিখিত অভিযোগে শিবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খান বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ন কবির ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ থেকে ১০% হারে, এলজিইডি শাখা থেকে ৫% হারে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কাছ থেকে ১৮% হারে, প্রতি নামজারিতে ২ হাজার টাকা, পৌরসভার উন্নয়নকাজে ২০% হারে, বালি উত্তলোনে প্রতি ট্রাক ৫০০ টাকা সরাসরি ঘুষ গ্রহণ করে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য দুইবার জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ডিসির আশীর্বাদ থাকায় কোনোবারই তদন্ত কর্মকর্তা তার দুর্নীতির কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। এমন অভিযোগ ভূক্তভোগীদের।

এরপর গত ২ ফেব্রুয়ারি আরেকটি অভিযোগ জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দেয় মন্ত্রী পরিষদের উপ সচিব সাইফুল ইসলাম। কিন্ত জেলা প্রশাসকের আস্থাভাজন কর্মকর্তা হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমানিত হবেনা এমন আশংকা ভূক্তভোগীদের।

এ বিষয়ে শিবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খান বলেন, হুমায়ুন কবির একজন আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ। প্রতিটি দপ্তরে তিনি নিজ ইচ্ছা মাফিক কাজ করেন। ঘুষ না দিলে কোনো কাজ হয় না। এমনকি সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের কাজ থেকেও তাকে ঘুষ দিতে হয়।

অন্যথায় তিনি ফাইল আটকে রাখেন। আমার জীবনে অনেক ইউএনও আমি দেখেছি। কিন্ত এমন দুর্নীতিবাজ অফিসার কখনো দেখিনি বলে হতাশা প্রকাশ করেন এই জনপ্রতিনিধি।

এ ব্যাপারে শিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে তা সঠিক নয়। নিয়ম মেনেই সব কাজ করা হয়েছে। কাজ করতে গেলে কিছু মানুষের বিরাগভাজন হতে হয়। এজন্য তারা বিভিন্ন অভিযোগ আনে।

এদিকে কক্সবাজারের পেকুয়ায় ত্রাণের ১৫ টন চাল আত্মসাতের ঘটনায় ইতিমধ্যেই তদন্ত শেষ করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। গত ৪ মে দিনভর পেকুয়ার সকল চেয়ারম্যান, ইউপি সচিব, পিআইও ও উপজেলার কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য নিয়েছেন তদন্ত কমিটি। এরপর গত ১০ মে ২য় পর্যায়ে এ বিষয়ে অধিকতর শুনানীর জন্য পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ ৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে তলব করে। এরই মধ্যে পেকুয়া উপজেলার বহিস্কৃত চেয়ারম্যান বাদে বাকি ৬ ইউপি চেয়ারম্যান ইউএনও সাঈকা শাহাদাতের কর্মকান্ড তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তাকে। একই অভিযোগ দিয়েছেন উপজেলা আওয়ামীলীগের আহবায়ক ও সদস্য সচিবও।

সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটি বেশ কয়েকজন বেসরকারি ভুক্তভোগীর বক্তব্যও নিয়েছেন। তারাও বিভিন্ন সময় পেকুয়ার আলোচিত উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে ঘুষ দেয়ার মত স্পর্শকাতর অভিযোগ দিয়েছেন লিখিতভাবেই। এছাড়াও পেকুয়া উপজেলার বহিস্কৃত চেয়ারম্যান বাদে বাকী ৬ ইউপি চেয়ারম্যান পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাঈকা শাহাদাতের কর্মকান্ড তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সম্মিলিত একটি আবেদন করেছেন। তদন্তকারীদের কাছে স্বাক্ষ্য দেয়া বেশ কয়েকজনের সাথে আলাপ করে বুঝা যায় তদন্ত কমিটির কাছে যত অভিযোগের তীর ইউএনওকে ঘিরেই।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ৬০ হাজার জনপ্রতিনিধির মধ্যে ৮৫ জন বরখাস্ত এটি খুব বড় বিষয় না। জনপ্রতিনিধিরা জনগণের পাশে যেভাবে দাঁড়ানো দরকার সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। আমাদের দেশে একটা তোষামদের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। ফলে জনপ্রতিনিধিরা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে জনগণের সমস্যা তুলে না ধরে তোষামুদি করে যাচ্ছে। ফলে এ সকল সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আমাদের এখন উচিত হবে স্বাস্থ্য সেবার অনিয়ম দুনীর্তির দিকে নজর দেওয়া।