করোনা ঝুঁকি নিয়েই সচল কর্মস্থল

ঢাকা, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২০ | ১৯ আষাঢ় ১৪২৭

করোনা ঝুঁকি নিয়েই সচল কর্মস্থল

জাফর আহমদ ৭:৪৩ পূর্বাহ্ণ, জুন ০২, ২০২০

print
করোনা ঝুঁকি নিয়েই সচল কর্মস্থল

করোনাভাইরাসের মহামারিতে একদিকে মৃত্যুহার বাড়ছে, বাড়ছে আক্রান্ত। দেশজুড়ে সাধারণ বন্ধ থাকায় আয়-রোজগার, উৎপাদন, বিপণন ও ভোগ হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে শর্ত সাপেক্ষে ও সীমিত পরিসরে সব খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। সতর্ক না হলে, বিপর্যয় রোধে উদ্যোগ জোড়াল না হলে সার্বিক পরিস্থিতি আরও বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে মন্তব্য করছেন অর্থনীতিবিদরা।

দুই মাসের অধিক সময় বন্ধ থাকার কারণে মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির। বন্ধ হয়ে গেছে উৎপাদন, বিপণন আমদানি ও রপ্তানি। কর্ম হারিয়েছে শ্রমজীবী মানুষ। যোগযোাগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল এক জনপদ থেকে আরেক জনপদ। এতে মানুষের জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকার প্রণোদনা ঘোষণা করলেও যোগযোগ বিচ্ছিন্ন, অফিস-আদালত বন্ধ থাকা ও মানুষের আয়-রোজগার না থাকার কারণে কোনো উদ্যোগ কাজে আসছিল না।

দিন দিন করোনা সংক্রমণে আক্রান্ত ও মৃত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অনাহারি মানুষের সংখ্যাও বাড়ছিল। অনাহারে মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। আয় রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ ও পরিবহন নির্ভর শ্রমজীবী মানুষ কর্মস্থল খুলে দেওয়ার জন্য বিক্ষোভ শুরু করেন। দাবি ওঠে শিল্প-বণিক সমিতিগুলো থেকেও।

করোনা আক্রান্ত হয়ে দেশে প্রতিদিন ২০ জনের অধিক মৃত্যু হচ্ছে। প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে দুই হাজারের অধিক মানুষ। করোনাভাইরাস সংক্রমণের মারাত্মক ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই ৩১ মে রোববার খুলে দেওয়া হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা, গণপরিবহন, দূরপাল্লার যানবাহন। এ সময়ে ব্যবসা বাণিজ্যের বয়ঃজ্যেষ্ঠ নাগরিকের মৃত্যু ঘটে। এরই মধ্যেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনা সংক্রমণ রোধে ব্যক্তিগত রক্ষা সামগ্রী পরিধান করে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে সব কিছু খুলে দেওয়া হয়।

এই সব কিছু খুলে দেওয়ার কারণে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তবে সংক্রমণের ঝুঁকি কম-এমন কার্যক্রম সীমিত খোলার মত দেন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা। এ বিষয়ে সতর্ক মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, লকডাউনের কারণে সারা দেশ স্থবির হয়ে পড়েছে। স্পন্দন থেমে গেছে অর্থনীতির। অর্থনীতির প্রাণ ফেরাতে জীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ও কর্মসংস্থানমূলক কার্যক্রম সীমিত ও করোনা সংক্রমণ রোধে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ পূর্বক খুলে দেওয়া উচিত। যেখানে প্রতিটি মানুষ মাস্ক ব্যবহার করবে, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা থাকবে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সাক্ষাতের সময়ও সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকবে।

দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত তৈরি পোশাক শিল্প। এ খাতে যেমন বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়োজিত, তেমনি রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ ভাগ অবদান রাখে এই খাত। করোনাভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করার প্রেক্ষাপটে পুরো খাত জুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়। গত একমাস ধরে তৈরি পোশাক খাত সীমিত আকারে খোলার চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত দুই সপ্তাহ আগে গার্মেন্ট কারখানা খুলে দেওয়া হয়। এরই মধ্যে ৯০টি কারখানায় দুই শতাধিক শ্রমিক আক্রান্ত হয়েছেন। তারপরও কারখানা চালু রাখা হয়েছে। যদিও তৈরি পোশাকের কার্যাদেশ বাতিল হওয়ার কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যাংক বীমা আগে থেকেই সীমিত আকারে খোলা রাখা হলেও রোববার থেকে পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়। তবে ব্যাংকগুলো পুরোপুরি খুললেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কর্মী রিজার্ভ রাখছে।

অর্থনীতিকে সচল করতে অচলাবস্থার অবসান ছাড়া কোনো উপায় নেই, কলকারখানা বিপণিকেন্দ্র ও পরিবহন খুলে দেওয়া ছাড়া উপায়। কিন্তু সময় ও লকডাউন প্রত্যাহারের ব্যাপকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লকডাউন পুরোপুরি প্রত্যাহারের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে আবার বড় ধরনের লকডাউন দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। এ বিষয়ে বিশ^ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খোলা কাগজকে বলেন, প্রথমত লকডাউনকে সাধারণ ছুটি হিসাবে ঘোষণার মধ্য দিয়ে মানুষের মাঝে সংক্রমণের ভীতির বদলে আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে সংক্রমণ থামানো যায়নি।

তারপর যখন লকডাউন প্রত্যাহার করা হলো তখন আক্রান্ত, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও গ্রামে যেখানে আক্রান্ত নেই- সেই এলাকাগুলোকে এক করে ফেলা হলো। এখন যদি শ্রমিকরা কারখানা, দোকান বা পরিবহনে গিয়ে ঝুকিপূর্ণ এলাকার আক্রান্ত মানুষ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে এসে পরিবার ও প্রতিবেশিকে আক্রান্ত করে তখন আবার লকডাউন ঘোষণা করতে হবে। তার আগে এখনি আক্রান্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে, সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।