নয় ঘণ্টার পথে

ঢাকা, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২০ | ২৩ আষাঢ় ১৪২৭

নয় ঘণ্টার পথে

ফারিহা আনজুম ৭:২৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ০২, ২০২০

print
নয় ঘণ্টার পথে

এক মোটরবাইকে তিনজন। দুইজন পুরুষ ও একজন নারী। বাম পাশে ঝোলানো একটি বড় ব্যাগ; তাতে জামা কাপড় হবে হয়তো। একজন বাইক চালাচ্ছেন, মাঝের জন পুরুষ। একবারে পেছনে দু’পাশে পা দিয়ে বসা নারী। এমনভাবে বসা যেন তাকে সিটের শেষভাগে ঝুলিয়ে বা টেনে রাখা হয়েছে। পড়ে যাবেন এমন অবস্থা। মাঝে বসা পুরুষটি তার দুই কাঁধের ওপর দিয়ে সামনে বাড়িয়ে দেওয়া নারীটির দুই হাত টেনে ধরে রেখেছেন, যাতে সেই নারী পড়ে না যান। বাইক ছুটছে তো ছুটছেই। 

সে কি গতি! এ তো বাইক ছুটছে না; জীবন ছুটে চলেছে জীবিকার টানে, ঢাকার পানে।

দৃশ্যটি চোখে পড়ে ঢাকা ফেরার পথে মাওয়া পেরোনোর পর। বাগেরহাট থেকে ঢাকায় ফেরা, ব্যক্তিগত গাড়িতে এদিন লেগেছে নয় ঘণ্টা। পথে মর্মান্তিক কী সব দৃশ্য! আহা রে জীবন! কত কষ্ট! দু’বেলা দু’মুঠো খাওয়া বা পরিবার পরিজনকে ভালো রাখার জন্য মানুষের কাছে মৃত্যুঝুঁকি কত না তুচ্ছ, খুব কাছ থেকেই দেখা।

গোপালগঞ্জ পেরোনোর পর চোখে পড়ল এক মোটরবাইকে চারজনের চলার দৃশ্য, সঙ্গে ব্যাগ তো রয়েছেই। বাস চলে না। তাই ওই দিন ২৯ মে কেউ ভাড়ার মাইক্রোবাসে, কেউ প্রাইভেট কারে, কেউ ভেঙে ভেঙে ভ্যান, ইজিবাইক বা অন্য বাহনে, যে যেভাবে পেরেছেন রওনা দিয়েছেন কর্মস্থলে। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা অন্য কোনো শহরে। পথে বিড়ম্বনার আর দুর্ভোগের শেষ নেই ...।

কাঁঠালবাড়ি ফেরি ঘাটে এসে জানা গেল ফেরি আছে ৩ নম্বর ঘাটে। ভ্যানচালকরা ডাকছেন। হেঁটে ২ মিনিটের পথ। ১০ টাকা করে ভাড়া। বেশির ভাগই তাড়াহুড়ো করে যে যার মতো ভ্যানে করে ৩ নম্বর ঘাটে এলেন। সকাল তখন সাড়ে ১১টা। ঘাটে ফেরি দুটো। একটি কেবল ঘাটে ভিড়েছে। আরেকটি ভেড়ানোর অপেক্ষায় আছে।

প্রথম ফেরিটি ঘাটে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড়িয়ে লোকজন উঠে পড়েছে। খালি মানুষ আর মানুষ। ফেরি থেকে যানবাহন নামানো সম্ভব হয়নি। তার আগেই উঠে পড়ছে মানুষ। এখন আর ওই ফেরির দিকে কাউকে যেতে দিচ্ছে না পুলিশ। তারপরও ফেরিতে আগে ওঠার আশায় সামনে এগোনোর চেষ্টা করছেন সবাই। আর পুলিশের ধাওয়া ও প্রহারের শিকার হচ্ছেন।

একসময় ওই ফেরিটি ঘাট ছেড়ে চলে গেল এবং অপেক্ষমাণ ফেরিটি ভিড়ল। তাতে ওঠার জন্য লোক এগোতে থাকে আর পুলিশও ধাওয়া দিতে থাকে। ধাওয়া খেয়ে একটু পেছনে সরে দাঁড়িয়ে যায় মানুষ। এভাবেই চলতে লাগল বেশ কিছুক্ষণ। যানবাহন নেমে যাওয়ার পর ওই ফেরিতে প্রথমে মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও প্রাইভেট কার উঠল। এরপর মোটরবাইক ও এরপর মানুষ। তখন দেখা গেল আরেক দৃশ্য। যে যেখান থেকে পেরেছেন দৌড়ে, বেয়ে, টপকিয়ে, লাফিয়ে ফেরিতে উঠেছেন। তিল ধারণের ঠাই নেই। বহু লোক উঠতে পারলেন না। ঠাসা ভর্তি ফেরি ছেড়ে দিচ্ছে। পন্টুন থেকে একটু একটু করে সরছে ফেরি। তখনও শিশু কোলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনো কোনো নারী ফেরিতে আসছিলেন। ফেরিতে থাকা লোকজনও তাদের টেনে টেনে আনছিলেন, যাতে পড়ে না যায়। ফেরি ছেড়ে দিল।

করোনায় তিন ফুট শারীরিক দূরত্বে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও ফেরির কোথাও যেন তিন ইঞ্চি দূরত্বও নেই। প্রচ- রোদ। কারো কোলে ছয় মাসের, কারো এক, দেড় বা দুই কিংবা তিন-চার বছরের শিশু। প্রচ- গরমে শিশুদের কান্নায় ভারী হয়ে গেল নদীতে ভাসা ফেরির পরিবেশ। কোনো কোনো বাবা নিজের জামা, কোনো কোনো মা গায়ের ওড়না দিয়ে রোদ ঠেকিয়ে শিশুকে ছায়া দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কেউ কেউ একটু বাতাস দিয়েও শিশুর কান্না থামানোর চেষ্টা করলেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ফেরি মাওয়া ঘাটে চলে এলো। এবারও সেই একই অবস্থা। আগের ফেরিটি ঘাটে ভিড়ে আছে, এটির ভেড়ার অপেক্ষা। সেটি ছেড়ে যাওয়ার পর এটি ভিড়ল। সবাই তাড়াহুড়ো করে নামলেন।

এবার মাওয়া ঘাট থেকে সড়ক পথে গন্তব্যে রওনা দিতে ভরসা বাইক, ইজিবাইক, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার। যে যেভাবে যে রকম যানবাহন পেয়েছেন, চড়া ভাড়ায় তাড়াহুড়ো করে বাহনে উঠে পড়েছেন। একেবারে গাদাগাদি, কোথাও স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। করোনার ভয় উপেক্ষা করে কর্মের জন্য কত কষ্ট করেই না রাজধানীতে ফিরলেন, ফিরছেন কর্মজীবী মানুষ। পথে অনেকেই বলছিলেনÑ আক্রান্ত হলে মৃত্যু হতে পারে তা তারা জেনে বুঝেই রাজধানীতে যাচ্ছেন। অফিসে চাপ আছে। না গেলে যে চাকরি থাকবে না। আর চাকরি না বাঁচলে স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, মা, বাবা- পরিবার কি খেয়েই বা বাঁচবে।

করোনা যে কত কিছুই দেখাল! দেখাল খেটে খাওয়া মানুষের জীবন আসলে জীবন নয়। করোনা বুঝাল- জীবনের চেয়ে যেন জীবিকাই বড়।