সড়কে গণপরিবহন বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২০ | ২৫ আষাঢ় ১৪২৭

সড়কে গণপরিবহন বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা

রবিউল ইসলাম ৭:২৪ পূর্বাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০

print
সড়কে গণপরিবহন বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে দুই মাসেরও বেশি সময় বন্ধ ছিল গণপরিবহন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসব গণপরিবহন আজ থেকে সীমিত পরিসরে চলবে। বিষয়টি নিয়ে থাকছে চরম ঝুঁকি ও আতঙ্ক। চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনাও। কারণ ছুটির সময়েই নাগরিকরা নিয়ম ভেঙে চলাচল করেছেন। আর এখন ছুটি নেই। গণপরিবহনও চলছে। ফলে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে আবার যাত্রী সাধারণকে গুনতে হবে বাড়তি ভাড়া। গতকাল বাস ভাড়া ৮০ শতাংশ বৃদ্ধির কথা বলেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিববহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের অঘোষিত লকডাউনে নাগরিকদের ঘরে রাখা যায়নি, নানা অজুহাতে বহু মানুষ বের হয়েছে। বাইরে ঘোরাফেরা করেছে। ফলে অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। এখন আবার করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেড়েই চলছে। সেখানে গণপরিবহন চলাচল কতটুকু যুক্তিযুক্ত? আবার ৮০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। এতে সমস্যা আরও বাড়বে। এমনিতেই সাধারণ মানুষের আয়-রোজগার কমে গেছে। সেখানে বাড়তি ভাড়া যোগ হলে সমস্যা আরও বেড়ে যাবে।

সাধারণ যাত্রীরা মনে করছেন, সিটিংয়ের নামে এমনিতেই চিটিং করে এসব পরিবহন। সিটিং হিসেবে উঠলে দেখা যায় পুরোপুরি লোকাল। নানা জায়গা থেকে মানুষ ওঠায়-নামায়। কিন্তু ভাড়া নেয় দু-তিনগুণ। কোনো সুষ্ঠু নীতিমালা না থাকায় সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এখন আবার করোনার অজুহাতে ভাড়া বাড়ালে তা হবে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। কারণ কম যাত্রী ওঠানোর কথা বললেও কেউ তা মানবে না। গাড়ির লোক ঠিকই আগের মতো যাত্রী তুলবে। উল্টো আমাদের বেশি ভাড়া গুনতে হবে।

বিশ্লেষকরা আরও বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ত্রুটিপূর্ণ ও নিম্নমানের যানবাহন এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহন নগরীতে বিষফোঁড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে। সরকারি নিয়মে রাজধানীতে চলাচলকারী সব বাসই লোকাল বাস। কিন্তু সিটিং সার্ভিস নাম দিয়ে চলে। আসলে সিটিং সার্ভিস বলে কিছু নেই। তারা সরকার নির্ধারিত ভাড়া মানে না। যাত্রী যেখানেই নামুক, সর্বশেষ গন্তব্যের ভাড়া আদায় করে, যা ন্যায্য ভাড়ার দুই থেকে তিনগুণ। সেখানে করোনার নামে এখন আবার ভাড়া বাড়ছে। এতে যাত্রীদের সরাসরি পকেট কাটা হবে। তাদের আরও বেশি হয়রানি হতে হবে। বাসের লোক ঠিকই বেশি যাত্রী তুলবে। উল্টো ভাড়াও নেবে বেশি।

এ বিষয়ে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সংগঠনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করে সরকার। যা ভালো মনে করে সেটাই করে। বিরোধী দল যারা থাকে, তারা রাষ্ট্রের পরিচালকদের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে তো কোনো বিরোধী দল নেই। প্রতিবাদ করার কোনো দল নেই। কাজেই সরকার এককভাবে যা ভালো মনে করছে, তাই করছে। সেটি করোনাভাই বা বাসভাড়া বৃদ্ধি- যাই হোক না কেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কয়েকবার ছুটি দিয়ে যেখানে জনগণকে ঘরে রাখা যায়নি। এখন ছুটি উঠিয়ে দেওয়া হলো। সব কিছু খুলে দেওয়া হলো, গণপরিবহন ছেড়ে দেওয়া হলো। তাহলে আগে কেন দীর্ঘ ছুটি দেওয়া হলো? এতে আর্থিকভাবে দেশ কি পিছিয়ে গেল না?

তিনি বলেন, শুরু থেকেই সরকারের পদ্ধতিগতভাবে কিছুই করতে পারেনি। যারা বাইরের করোনা আক্রান্ত বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে ফিরেছেন, তাদের ব্যাপারে কিছু করা হলো না। বাইরের দেশ করোনাভাইরাসে ইন্ডিকেটর যখন উপরের দিকে যায় (আক্রান্তের হার), তখনই বেশি সাবধানতা অবলম্বন করে। কিন্তু আমাদের এখানে যখন ইন্ডিকেটর উপরের দিকে, তখনই ছুটি উঠিয়ে নেওয়া হলো, গণপরিবহন ছাড়া হলো। বিষয়টি আমি ঠিক বুঝতে পারি না।

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, দেশে বিভিন্ন অজুহাতে ভাড়া বাড়ানো হয়। কিন্তু পরে আর সেই ভাড়া কমে না। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা গত দুই বসে ছিল। এখন তারা ক্ষতি পুষিয়ে নেবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ আগেও ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। এবারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যারা বড়লোক, তারা আমাদের চুষে খাবে। এটি এ পৃথিবীর ধারা। বিশেষ করে এটি বাংলাদেশর ধারা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, করোনার অজুহাতে গণপরিবহনে এক লাফে ৮০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো গণবিরোধী। এখন করোনা মহামারি চলছে। এ সংকটকালে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের অজুহাতে নিদারুণ আর্থিক সংকটে পতিত দেশের অসহায় জনগণের ওপর জোর করে একচেটিয়াভাবে ভাড়া চাপিয়ে দেওয়া হলো। এটি অযৌক্তিক।

তিনি বলেন, সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়া হলো না। জ্বালানি তেলের মূল্য কমানো হলো না। পরিবহনের চালক-শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ সম্পর্কিত কোনো প্রকার প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো না। কিন্তু গণপরিবহন চালুর মধ্য দিয়ে জনগণকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে। সড়কে নারকীয় পরিবেশের কোনো উন্নতি না ঘটিয়ে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানো হলো। এর মাধ্যমে সরকার সড়কে নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি আরও বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে দিল।

তিনি বলেন, যে কোনো সংকটে বা অজুহাতে দেশে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ালে তা স্বাভাবিক সময়েও কমানোর কোনো নজির নেই। সরকার এক লাফে ৮০ শতাংশ ভাড়া বর্ধিত করলেও প্রকৃতপক্ষে বাস মালিকরা নানা ছলচাতুরী করে ১২০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়ে দেবে।

উল্লেখ্য, দেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে প্রথমবারের মতো সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয় ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় এরপর তা বাড়ানো হয় ১১ এপ্রিল পর্যন্ত। তৃতীয় দফায় বাড়ে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত। চতুর্থ দফায় ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত। এরপর ৫ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি বাড়ানো হয়েছিল পঞ্চম দফায়। এভাবে ষষ্ঠ দফায় বাড়ে ১৬ মে পর্যন্ত। আর সবশেষ বর্ধিত করা হয় ৩০ মে পর্যন্ত।