গাড়ির গ্লাস নামিয়ে এক্সিম ব্যাংকের এমডিকে গুলি ছোড়েন রন

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২০ | ২৩ আষাঢ় ১৪২৭

গাড়ির গ্লাস নামিয়ে এক্সিম ব্যাংকের এমডিকে গুলি ছোড়েন রন

নিজস্ব প্রতিবেদক ৬:৩৮ অপরাহ্ণ, মে ২৭, ২০২০

print
গাড়ির গ্লাস নামিয়ে এক্সিম ব্যাংকের এমডিকে গুলি ছোড়েন রন

নিজের গাড়ির গ্লাস নামিয়ে এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়াকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন সিকদার গ্রুপের মালিক জয়নাল সিকদারের ছেলে ও গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রন হক সিকদার। গুলিটি হায়দার আলীর বাম কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। এরপর রন হক আবার গুলি করতে গেলে এক্সিম ব্যাংকের এমডি গাড়ির পেছনে গিয়ে আশ্রয় নেন।

করোনা ভাইরাসের মহামারির মধ্যে একটি বাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে, নির্যাতন করে ঋণ দিতে চাপ দেয়ার এই ঘটনায় বিভিন্ন মহলে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া ও অতিরিক্ত এমডি মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেনকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে এমন অভিযোগে রাজধানীর গুলশান থানায় গত ১৯ মে একটি মামলা করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

মামলায় আসামি করা হয়, সিকদার গ্রুপের মালিক জয়নাল সিকদারের ছেলে এবং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রন হক সিকদার ও তার ভাই দিপু হক সিকদারকে। পুলিশ বলছে দুই ভাই বর্তমানে পলাতক রয়েছে।

কী ঘটেছিল সেদিন?

মামলা সূত্রে জানা গেছে, ওই ঘটনার সূত্রপাত গত ৭ মে বেলা ১১টায় এক্সিম ব্যাংকের গুলশানের প্রধান কার্যালয়ে। মাঝে রূপগঞ্জ ও পূর্বাচল হয়ে বনানীর ১১ নম্বর সড়কের সিকদার হাউসে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় এই ঘটনার সমাপ্তি ঘটে। সেখানে এক্সিম ব্যাংকের এমডি হায়দার আলী ও অতিরিক্ত এমডি মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেনের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। জোর করে সই নেওয়া হয় সাদা কাগজে। এসবই ঘটে সিকদার গ্রুপের এমডি রন হকের নেতৃত্বে।

৫০০ কোটি টাকা ঋণের জন্য এক্সিম ব্যাংকে আবেদন করেছিল সিকদার গ্রুপ। ঋণের অগ্রগতি জানতে গত ৭ মে বেলা ১১টায় এক্সিম ব্যাংকের গুলশানের প্রধান কার্যালয়ে যান রন হক সিকদার ও তাদের মালিকানাধীন ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডি চৌধুরী মোসতাক আহমেদ।

ঋণের বিপরীতে জামানত নিয়ে আলাপ উঠলে তারা এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও অতিরিক্ত এমডিকে রূপগঞ্জের আদি নওয়াব আসকারি জুট মিল পরিদর্শনে নিয়ে যান। কিন্তু জামানত হিসেবে এই সম্পত্তির বন্ধকি মূল্য নথিপত্রে দেখানো মূল্যের চেয়ে কম উল্লেখ করেন ব্যাংকটির এমডি ও অতিরিক্ত এমডি।

এ সময় রন হক সিকদার তাদের পূর্বাচলের ‘আইকন টাওয়ার’ পরিদর্শনে যেতে বলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে রন হক সিকদার ও চৌধুরী মোসতাক আহমেদকে না পেয়ে এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও অতিরিক্ত এমডি ৩০০ ফুট সড়ক ধরে ঢাকার দিকে রওনা দেন। পথে তাদের দেখা হয় রন হক সিকদার ও ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডির সঙ্গে।

গাড়ির গ্লাস নামিয়ে গুলি ছোড়েন রন!

এ সময় ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডি এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও অতিরিক্ত এমডিকে বলেন, ‘রন হক সাহেবের বলে দেওয়া নির্ধারিত স্থানে আপনারা উপস্থিত হতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে উনি অত্যন্ত মনঃক্ষুণ্ন ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন।’

তাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে রন হক সিকদারের কাছে নিয়ে মাফ চাওয়ানো হয়। এরপর তারা নিজেদের গাড়ির দিকে যাওয়ার সময় রন হক সিকদার তার গাড়ির গ্লাস নামিয়ে এক্সিম ব্যাংকের এমডির উদ্দেশে গুলি ছোড়েন। গুলি তার বাম কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। রন হক আবার গুলি করতে গেলে এক্সিম ব্যাংকের এমডি গাড়ির পেছনে আশ্রয় নেন।

এরপর এক্সিম ব্যাংকের এমডির গাড়িতে অতিরিক্ত এমডিকে তোলা হয়। সঙ্গে রন হক সিকদারের একজন নিরাপত্তাকর্মীও ওঠেন। তিনি এমডি ও অতিরিক্ত এমডির মোবাইল ফোন কেড়ে নেন এবং অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাদের বনানীর সিকদার হাউসে নিয়ে যান।

`গুলি করে জন্মের মতো খোঁড়া করে দেব’

গুলি ও জিম্মি করার ঘটনায় রাজধানীর গুলশান থানায় এক্সিম ব্যাংকের পক্ষে যে মামলা হয়েছে, তাতে বলা হয়, এমডি ও অতিরিক্ত এমডিকে অস্ত্রর মুখে সিকদার হাউসের তৃতীয় তলায় নেওয়া হয়। এমডির উদ্দেশে রন সিকদার বলেন, ‘তোর কত বড় সাহস, আমার কথা অমান্য করিস। গুলি করে জন্মের মতো খোঁড়া করে দেব।‘ এরপর সেখানে তাকে জিম্মি করে রাখা হয়।

আর অতিরিক্ত এমডিকে নিয়ে যাওয়া হয় ষষ্ঠ তলায়। অতিরিক্ত এমডির উদ্দেশে রন হক সিকদার বলেন, ‘প্রতি কাঠা জমির দাম আড়াই কোটি টাকা, আর তুই বললি প্রতি বিঘার দাম আড়াই কোটি টাকা। এখনই তোকে শেষ করে ফেলব।’এ সময় রন হকের ভাই দিপু হক সিকদার অতিরিক্ত এমডিকে মারধরের চেষ্টা করেন।

বিদেশি নিরাপত্তাকর্মী দিয়ে টর্চার সেলে নির্যাতনের হুমকি

এরপর অতিরিক্ত এমডিকে তৃতীয় তলায় নেওয়া হয়। তাকে ও এমডিকে বিদেশি নিরাপত্তারক্ষীর পাহারায় রাখা হয়। পরে রন হক সিকদার ও দিপু হক সিকদার এমডিকে একটি সাদা কাগজে তাদের স্বাক্ষর দিতে বলেন। স্বাক্ষর না করলে বিদেশি নিরাপত্তাকর্মী দিয়ে টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন চালানো হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। পরে জোর করে সাদা কাগজে এমডির স্বাক্ষর আদায় করেন রন হক এবং সাক্ষী করা হয় অতিরিক্ত এমডিকে।

এরপর বিকাল সাড়ে ৫টায় সিকদার গ্রুপের চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদারের কাছে নিয়ে তার সঙ্গে এমডি ও অতিরিক্ত এমডির ছবি তোলা হয়। রাত সাড়ে ৭টায় তাদের ছেড়ে দেওয়ার পর রন হক সিকদার নিচে নেমে সবার মোবাইল ফোন ফেরত দেন।

এখনও গ্রেফতার হয়নি রন তার ভাই

গুলশান থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কামরুজ্জামান খোলা কাগজকে বলেন, যে মামলাটি হয়েছে, তাতে এক্সিম ব্যাংকের পরিচালক মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া এবং অতিরিক্ত এমডি মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেনকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ করা হয়েছে। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ঋণের জন্য ব্যাংকে সিকিউরিটি সম্পত্তির মূল্য বেশি দেখানোর জন্য অস্ত্রের মুখে তাদের হুমকি দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, আমরা মামলাটি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছি। মামলায় এখনও কেউ গ্রেফতার হয়নি। আসামিরা পলাতক রয়েছেন। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যহত রয়েছে।

উল্লেখ্য, দেশে ও দেশের বাইরে নানা খাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ রয়েছে সিকদার গ্রুপের। জয়নুল হক সিকদারের ছেলেরা ব্যবসা দেখাশোনা করেন। মেয়ে পারভিন হক সিকদার জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের সাংসদ।