পেছাল ঢাকা সিটির ভোট

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৮ ফাল্গুন ১৪২৬

পেছাল ঢাকা সিটির ভোট

এসএসসি পরীক্ষা ৩ ফেব্রুয়ারি

শফিক হাসান ১০:৪৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৮, ২০২০

print
পেছাল ঢাকা সিটির ভোট

অনেক নাটকীয়তা, ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পেছানো হলো ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন। সেই সঙ্গে পিছিয়েছে এসএসসি পরীক্ষার সময়সূচিও। নতুন ঘোষিত তারিখ অনুযায়ী ১ ফেব্রুয়ারি হবে দুই সিটির ভোটগ্রহণ আর এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে ৩ ফেব্রুয়ারি। চলতি মাসের ৩০ তারিখে ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর ও দক্ষিণের ভোট গ্রহণের তারিখ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

অন্যদিকে ৩০ জানুয়ারিতে রয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সরস্বতী পূজা। এরপরই ১ ফেব্রুয়ারি থেকে নির্ধারিত ছিল এসএসসি পরীক্ষা।

নির্বাচনের কারণে পরীক্ষার কেন্দ্র সময়মতো ঠিকঠাক করা যাবে কি-না, সেখানে কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটবে কি-না এমন আশঙ্কা ছিল সংশ্লিষ্টদের মনে। অন্যদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় এ উৎসবের বিষয়টি মাথায় রেখে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ দাবি জানায় নির্বাচন পেছানোর। নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টির সুরাহা না হওয়ায় শেষপর্যন্ত বিষয়টি আদালতে গড়ায়।

নির্বাচন পেছানোর দাবিতে রাজু ভাস্কর্যের সামনে প্রতিবাদী অনশন শুরু করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরাসহ দলটির শীর্ষ নেতৃত্বও পূজার দিন নির্বাচন করার বিরুদ্ধে ইসির সমালোচনা করে, সরকারি দলের পক্ষ থেকেও জানানো হয় নির্বাচন পেছালে তাদের আপত্তি নেই।

শেষপর্যন্ত ‘একগুঁয়ে’ সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটে ইসি। সিটি নির্বাচন ও এসএসসি পরীক্ষা পেছানোর মধ্য দিয়ে বিদ্যমান সংকটের সুরাহা হতে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা। শনিবার বিকাল ৪টা থেকে ৮টা পর্যন্ত টানা প্রায় ৪ ঘণ্টা জরুরি সভায় বসে ইসি। বৈঠক শেষে প্রধান নির্বাচন (সিইসি) কমিশনার কে এম নূরুল হুদা আজ জানান, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হবে আগামী ১ ফেব্রুয়ারিতে। সিইসির নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনের জরুরি সভায় নতুন তারিখ ঠিক হয়। সিটি নির্বাচনের ভোট পেছানোয় এসএসসি পরীক্ষাও পিছিয়েছে। আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি শুরু হবে এ পাবলিক পরীক্ষা।

নির্বাচন পেছানোর বিষয়ে সিইসি বলেন, একটা জটিল পরিস্থিতি ছিল। সেটা প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সময় লেগেছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে নির্বাচনের কারণে পরীক্ষা পেছানো সম্ভব কি-না তা নিয়ে কথা বলেছি।

কে এম নূরুল হুদা আরও বলেন, আমাদের ক্যালেন্ডারে ২৯ জানুয়ারি পূজার কথা উল্লেখ আছে। সেই প্রেক্ষাপটে ৩০ জানুয়ারি ভোটের দিন নির্ধারণ করেছিলাম। পরবর্তী পরিবেশ পরিস্থিতিতে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা ব্যাঘাত না আসে সেটা বিবেচনা করে আমরা শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনিও তার দফতরে বসে দাফতরিক প্রস্তুতি নিয়ে আমাকে জানিয়েছেন ১ ফেব্রুয়ারির পরীক্ষা পিছিয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করেছেন। সেই কারণে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে সর্বসম্মতিতে ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

সিইসি বলেন, নির্বাচনে আর কোনো অসুবিধা নেই। কাগজপত্র পরিবর্তন করতে হবে। তারিখ পরিবর্তনের পর আর কোনো ইস্যু নেই। এখন তো ভোটের তারিখ পরিবর্তন করা হলো।

বিষয়টি নিশ্চিত করে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা পূর্বনির্ধারিত ১ ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে। পরীক্ষার নতুন সময়সূচি আজ রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রকাশ করবে বলেও জানান শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

নির্বাচন পেছানো নিয়ে দীর্ঘ এ প্রতিবাদের সূচনা হয় গত ২২ ডিসেম্বর ইসি ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে। তারিখ নির্ধারণ করা হয় ৩০ জানুয়ারি। ওই দিন সরস্বতী পূজা বলে তফসিল ঘোষণার পরপরই বিরোধিতা করেছিল পূজা উদযাপন পরিষদ ও হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদও ভোটের দিন পরিবর্তনের দাবি জানায়। কারও আপত্তিই আমলে নেয়নি ইসি। এরপর ভোটের তারিখ পরিবর্তনে হাইকোর্টে রিট আবেদন হলে তা খারিজ হয়ে যায়। পরে আপিল করেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী।

ইসি ৩০ জানুয়ারি ভোট করার বিষয়ে আরও শক্ত অবস্থান নেয়। যুক্তি দেখানো হয়, ৩০ জানুয়ারিই ভোট গ্রহণের জন্য উপযুক্ত দিন। তার পরের দিন ৩১ জানুয়ারি শুক্রবার বলে সেদিন ভোট গ্রহণের নজির নেই। এর পরদিন ১ ফেব্রুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে বলে প্রায় এক মাস আর ভোট করা যাবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী অনশন শুরু করলে এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কর্মসূচি ঘোষণা করলে ভোটের দিন বদলের দাবি জোরাল হয়। শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে অযৌক্তিক বললেও তাদের পক্ষে জনমত জোরাল হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে আজ জরুরি বৈঠকে বসে ইসি। বৈঠকে অংশ নিতে নির্বাচন কমিশনারদের টেলিফোনে ডেকে নেওয়া হয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের দুই রিটার্নিং কর্মকর্তাকে বৈঠকে উপস্থিত হতে প্রথমে বলা হলেও পরে তাদের না ডেকে মতামত নেওয়া হয়।

অভিজ্ঞজনেরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের আর কোনো নির্বাচনে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। এটা একই সঙ্গে সরকার ও ইসির জন্য ছিল বিব্রতকর। সরকারের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা ভোটের তারিখ পরিবর্তনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছিলেন। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ভোটের তারিখে পরিবর্তনে দল বা সরকারের আপত্তি নেই বলে মন্তব্য করেন। চার নির্বাচন কমিশনারের পরিবর্তনের পক্ষে সায় থাকলেও রাজি ছিলেন না সিইসি।

নির্বাচনের তারিখ বদলানোর আবেদন হাইকোর্টে খারিজ হয়ে যাওয়ার পর আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। রিটকারী আইনজীবী অশোক কুমার ঘোষ গত বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে এ আবেদন করেন। সেখানে ৩০ জানুয়ারির নির্বাচন স্থগিত চাওয়া হয়েছে। আজ আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে ওই আবেদনের ওপর শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, সামনে ‘বাধা’ সরে যাওয়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা এখন থেকে আরও বেশি উদ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যেতে পারবেন। সেই ক্ষেত্রই সৃষ্টি হয়েছে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে!